kalerkantho


আমরা চলেছি উজ্জ্বল সূর্যের অনুভবে

মাসুদুজ্জামান

৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



আমরা চলেছি উজ্জ্বল সূর্যের অনুভবে

কাজুও ইশিগুরো

আমার আকাশ কালো হতে চায় সময়ের নির্মম আঘাতে;/জানি, তবু ভোরে রাত্রে, এই মহাসময়েরই কাছে/নদী খেত বনানীর ঝাউয়ে ঝরা সোনার মতন/সূর্যতারাবীথির সমস্ত অগ্নির শক্তি আছে। জীবনানন্দ দাশ এ রকমই কিছু পঙিক্ত লিখেছিলেন একটা সময়কে ধরবার জন্য। সময়ের অভিঘাত  সত্যি নির্মম, তবু, সূর্যতারাবীথির মধ্যে সঞ্চিত থাকে অগ্নি। অগ্নি, প্রমিথিউসের সেই প্রাণনা, যার ভেতর দিয়ে সভ্যতাকে ছুঁতে পেরেছে মানুষ। সময়সেতুলোকে বিলীন হয়ে যায়নি; বরং একটা সময় থেকে আরেকটা সময়কে অতিক্রম করে তরুপল্লবের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছে পাখির গুঞ্জন। গড়ে তুলেছে জনপদ। মানুষই পেরেছে জীবনকে অর্থবহ করে তুলতে।

এ হলো প্রবেশক, এই লেখাটার। কী নিয়ে লিখব শিলালিপির বছরের প্রথম সংখ্যায়? যখন কালের কণ্ঠে লেখার জন্য অনুরুদ্ধ হলাম, ভীষণ দ্বিধান্বিত ছিলাম আমি। পরে মনে হলো সাহিত্যের যাপনটা কেমন ছিল, তাই নিয়েই হতে পারে ছোট্ট একটা লেখা। শুরু করি নোবেল পুরস্কার দিয়ে। কেননা এই পুরস্কারটাই সাহিত্যের সবচেয়ে বড় পুরস্কার। সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের কথা বলা মানেই বিতর্ককে টেনে আনা। এবারও সেই গুঞ্জন উঠেছিল। কিন্তু সে শুধু বাংলাদেশে, ক্ষুদ্র একটা পরিমণ্ডলে। ইংরেজ-ভাষিক পরিমণ্ডল, কেউ এ নিয়ে তেমন প্রশ্ন তোলেননি। তবে কে পেতে পারেন তা নিয়ে জল্পনাকল্পনা ছিল। আর এটা নোবেল নিয়ে থাকবে না তো কোন পুরস্কার নিয়ে থাকবে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা যে নোবেলকে নিয়ে বিশ্বজুড়েই হয়। বেশ কয়েকজন ফেভারিটকে টপকে প্রায় অনুচ্চারিত একটা নাম যখন ঘোষণা করে ফেলল নোবেল কর্তৃপক্ষ, তখনই সবাই নড়েচড়ে বসল। খোঁজ খোঁজ আর খোঁজ পড়ে গেল কাজুও ইশিগুরোকে নিয়ে। ইশিগুরোর জায়গায় যদি অন্য কেউ পেতেন, তাঁর বেলাতেও এ রকমটাই ঘটত। নোবেল বিজয়ীর খোঁজে সাংবাদিকরা ল্যাপটপ, নোটবুক আর ক্যামেরা নিয়ে ছুটবেন না, তো কার পেছনে ছুটবেন! এ হলো গল্পের প্রথম কাহন, মানে প্রথম গপ্প। এবার পটপরিবর্তন হলে স্পষ্ট হতে থাকে—এমন একজন কথাসাহিত্যিকের কথা, যিনি সত্যিই ভালো লিখেছেন। তাঁর উপন্যাসের কথাই বলব।

অনেকটা পিছিয়ে যেতে হবে, সেই ১৯৮২ সালে। ২৮ বছরের এক তরুণ লেখকের প্রথম বই ‘আ পেল ভিউ অব হিল্স্’ প্রকাশিত হলো। নজর কাড়লেন বোদ্ধাদের; কিন্তু খুব বেশি উচ্চবাচ্য নেই। এরপর ছয় বছরের ব্যবধানে বেরোল তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস ‘অ্যান আর্টিস্ট অব দ্য ফ্লোটিং ওয়ার্ল্ড’। বুকার পুরস্কারের শর্ট লিস্টে নাম উঠল, পেয়ে গেলেন ‘হুইটব্রেড বুক অব দ্য ইয়ার’।  সেই থেকে খ্যাতি। কতই বা বয়স তখন ইশিগুরোর—মাত্র ৩২ বছর। বত্রিশেই সেলিব্রিটি লেখক তিনি। সেলিব্রিটি হলে যা হয়, প্রচারের আলোয় লেখালেখিটা হারিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু লেখা যাঁর ধমনিতে আছে, তাঁকে কি আর রোখা যায়? ইশিগুরোও জীবনযাপনে রাশ টেনে ধরে সকাল ৯টা থেকে রাত সাড়ে ১০টা অবধি টানা লিখে যাওয়ার ব্রত গ্রহণ করলেন। মাঝে বিরতি দিলেন মাত্র দুই ঘণ্টার। বাইরের জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে একাগ্র হলেন শুধু লেখালেখিতে।

ইশিগুরোর প্রথম দুটি উপন্যাসের কাহিনির কেন্দ্র হচ্ছে জাপান বা জাপানি অনুষঙ্গ। জন্ম নাগাসাকিতে, পাঁচ বছর বয়সে ইংল্যান্ডে চলে আসার পর ব্রিটেনেরই বাসিন্দা তিনি। ঘরে জাপানি সাংস্কৃতিক আবহ, বাইরে বনেদি ব্রিটিশপনা। স্কুলে বিজ্ঞান ও গণিতে তাঁর মতি নেই, ভালো লাগে কল্পগল্প বা সাহিত্য, গান। ওই বয়সেই পরিচিত হন লিওনার্ড কোহেন, বব ডিলান, জন মিচেলের মতো সংগীত ব্যক্তিত্বের। ডিলান তাঁর আদর্শায়িত সংগীত-পুরুষ। স্কুল ছেড়ে বছরখানেক আমেরিকায় কাটান হিচ-হাইকিং করে। ফিরে এসে ইংরেজি সাহিত্য ও দর্শন নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই সময়টাই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। শুরু করেন গানের চর্চা, বইপড়া আর টুকটাক লেখা। বাসনা যদিও সংগীতকার হওয়ার। নাটক লিখে পাঠিয়ে দিলেন বিবিসিতে। কিন্তু নির্বাচিত হলো না। গানের চর্চাতেও ভাটা পড়েছে। হতোদ্যম ইশিগুরো ভর্তি হয়ে গেলেন ইস্ট অ্যাংলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিয়েটিভ রাইটিং প্রগ্রামে। এখানে থাকতেই তিনি লিখে ফেলেন তিনটি ছোটগল্প। প্রকাশের জন্য দ্বারস্থ হন বিখ্যাত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ফেবার অ্যান্ড ফেবারের অফিসে। ফেবারের তখন ফিকশন সম্পাদক রবার্ট ম্যাক্রাম। কিভাবে পৌঁছেছিলেন ইশিগুরো, তার একটা বর্ণনা দিয়েছেন ম্যাক্রাম এভাবে : ইশ সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন একটা গিটার আর নীল কেসের মধ্যে থাকা অলিম্পিয়া টাইপরাইটার। পরনে টুটাফাটা জিনস আর মাথাভর্তি লম্বা চুল। বব ডিলানের অনুকরণে গান লেখেন তিনি, উচ্চাকাঙ্ক্ষা হচ্ছে পারফরম করা। কিন্তু ইংলিশ ফিকশনের জগতে তিনি অ্যামেচার লেখক হলেও কিছুটা চিহ্ন তো রাখতেই পেরেছেন। ফেবার তাকে আনুকূল্য দেখায়, প্রকাশ করে ছোটগল্পের বই। এরপর ‘আ পেল ভিউ অব হিলস’ উপন্যাসটি চেয়ে নিয়ে অগ্রিম এক হাজার পাউন্ড পাঠিয়ে দেয়। সেই শুরু। তার পরের ইতিহাস তো ইতিহাসই। ‘দ্য রিমেইনস অব দ্য ডে’ উপন্যাসের সূত্রে বুকার জয় থেকে শুরু, শেষ হলো নোবেল পুরস্কার জেতে। বোঝাই যায়, ইশিগুরোর লেখক হয়ে ওঠার একটা ইতিবৃত্ত আছে, যা ধীরে ধীরে ঘটেছে, ধীরে ধীরে তিনি আত্মপ্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। কিন্তু অবাক কাণ্ড হলো, এখানে এই বাংলাদেশে কখনো তাঁর নাম শোনেননি—এমন কথাও শোনা গেল। এ রকম অবশ্য হতেই পারে। লাতিন আমেরিকা আর আফ্রিকার সাহিত্যের প্রতি আমাদের দৃষ্টি এতটাই নিবদ্ধ ছিল যে ইংরেজভাষী লেখকদের প্রতি আমাদের চোখ পড়েনি। এটা অবশ্য চোখের দোষ নয়, চোখ মেলে না দেখার দোষ, আবিষ্কার করতে না পারার দোষ। কিন্তু একজন প্রায় অভিবাসী, একটা কালচারকে বহন করে নিয়ে গিয়ে আরেকটা সংস্কৃতির মধ্যে বেড়ে উঠে আখ্যান রচনা করছেন, এর মধ্যেই তো অভিনবত্ব আছে। সেই সঙ্গে গল্প বলার নিজস্ব উদ্ভাবনার কারণে ইশিগুরো আজ নমস্য একটি নাম। নিরীক্ষাও কম করেননি। বিশ্বসাহিত্যের দিগন্তকে এভাবেই তিনি প্রসারিত করে দিয়েছেন।

ডেভিড গ্রসম্যান

নোবেলের কথা বলতে বলতে বুকারের কথা মনে পড়ে গেল। বুকারের তো এখন দুটো ধরন : একটা অনূদিত বা মূল ইংরেজিতে লেখা উপন্যাসের আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কার, আরেকটা ইংরেজিতে লেখা উপন্যাসের জন্য বুকার পুরস্কার। প্রথম পুরস্কারটা পেয়েছেন ডেভিড গ্রসম্যান তাঁর ‘আ হর্স ওয়াকস ইনটু আ বার’। গ্রসম্যান জাতিতে ইহুদি। একজন কমেডিয়ানকে নিয়ে এই উপন্যাস। কাহিনি-বিন্যাসে অসাধারণ দক্ষতার কারণেই গ্রসম্যান পুরস্কারটি পান।

জর্জ সন্ডার্স

বছরের শেষদিকে ঘোষণা করা হয় ইংরেজিতে লেখা উপন্যাসের জন্য নির্ধারিত বুকার পুরস্কার। এ পুরস্কারটি এবার জিতে নেন মার্কিন ছোটগল্পকার জর্জ সন্ডার্স। তবে ছোটগল্প নয়, তিনি পুরস্কারটি পান তাঁর লেখা উপন্যাস ‘লিঙ্কন ইন দ্য বার্দো’র জন্য। উপন্যাসটির কাহিনি বেশ চমকপ্রদ। পুত্রশোকে কাতর পিতা আব্রাহাম লিঙ্কন গোরস্তানের দিকে ছুটে যান। দেখা মেলে অতিপ্রাকৃত কিছু চরিত্রের সঙ্গে। টান টান কাহিনি, অতিপ্রাকৃত কল্পজগৎ নির্মাণ—এসব কারণে উপন্যাসটি উল্লেখযোগ্য। তবে একটুখানি দুঃখ মেশানো আছে এবারের পুরস্কারে। অরুন্ধতী রায় অনেক দিন পর যে দ্বিতীয় উপন্যাসটি লিখলেন, তার জন্য দ্বিতীয়বার বুকার পাবেন—এ রকম একটা প্রত্যাশা ছিল ভারতীয় বা উপমহাদেশের মানুষের। কিন্তু এবার আর শিকে ছেঁড়েনি। তিনি তাঁর ‘দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস’-এর জন্য কোনো পুরস্কার পাননি।

কথায় কথা বাড়ে। প্রতীচ্য থেকে প্রাচ্যের দিকে দৃষ্টি ফেরালে আমাদের প্রধান পুরস্কার ‘বাংলা একাডেমি’ যাঁরা পেয়েছেন, তাঁদের ঘিরে ছিল প্রবল বিতর্ক। এ ছাড়া একক কোনো ভালো উপন্যাস বেরিয়েছে কি না, তার হদিস করাটা বেশ মুশকিল। তবে পুরস্কারের ছড়াছড়ি ছিল। এবার মনে হয় বিগত কয়েক বছরের তুলনায় ব্যাপারটা অনেকের কাছেই দৃষ্টিকটু লেগেছে। বাংলাদেশে কোনো উল্লেখযোগ্য উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে কি না, তার হদিস করলেও হতাশ হতে হয়। কাব্যগ্রন্থ যে আহামরি কিছু বেরিয়েছে বলা যাবে না। সবচেয়ে বেশি দীনতা ছিল প্রবন্ধ-গ্রন্থ নিয়ে। আসলে জাতি হিসেবে আমরা যতটা আবেগপ্রবণ, সে তুলনায় চিন্তাশীল নই। ফলে কবিতার বই প্রকাশের সংখ্যা বেশি হলেও প্রবন্ধ-গ্রন্থের সংখ্যা হাতে গোনা; উল্লেখ করার মতো একটিও নেই। আমাদের তারুণ্য প্রবন্ধ রচনায় ব্রতী হচ্ছেন না—সেটাও ভালো লক্ষণ নয়। ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দিতেও আমরা কুণ্ঠাবোধ করেছি। ফলে আহসান হাবীবের মতো কবির জন্মশতবর্ষ থাকলেও জাতীয়ভাবে, এমনকি স্বল্প পরিসরেও উদ্যাপিত হয়নি। কোনো সংগঠন পালন করতে এগিয়ে আসেনি।

একটি ঘটনা অবশ্য আমাদের কিছুটা হলেও উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল। আমাদের সর্বজনশ্রদ্ধেয় লেখক আনিসুজ্জামান অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।  সম্প্রতি তাঁকে জনসমক্ষে মঞ্চে দেখা যাচ্ছে, এটাই স্বস্তির।

একটি খবর অবশ্য আমাদের প্রকাশনা জগেক আরো প্রসারিত করবে বলে মনে হয়। বাংলাদেশ এবারই ইন্টারন্যাশনাল পাবলিশার্স অ্যাসোসিয়েশনের স্থায়ী সদস্য হতে পেরেছে। কিন্তু একটা সমস্যা থেকেই যাচ্ছে। বিশ্ববাজারে বিপণনের মতো পর্যাপ্ত অনূদিত বই আমাদের নেই। কারণটা হলো, অনুবাদকের অভাব—বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদের। অনূদিত বই নেই, তাই বিশ্ববাজারে বিপণনও নেই—আক্ষেপটা ঠিক এখানেই। আমাদের অনুবাদের অবস্থা এতটাই দুর্বল যে বিশ্ববাজারে কোনো দিন আমাদের লেখকদের ঠাঁই হবে কি না, বলা সহজ নয়। এ জন্য আসলে দরকার ব্যাপক অনুবাদ। প্রকাশকরা উদ্যোগী হলে এই বন্ধ্যত্ব কিছুটা হলেও ঘুচবে বলা যায়। প্রকাশকদের লক্ষ্য হোক সেটাই—ইংরেজিতে অনূদিত বই নিয়ে বিশ্ববাজারে প্রবেশাধিকার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। আশা করছি ভবিষ্যতে এই প্রবেশাধিকার কিছুটা হলেও ঘটবে, আর সৃষ্টিশীল জাতি হিসেবে উজ্জ্বল হবে বাংলাদেশের মুখ। শুরু করেছিলাম জীবনানন্দের একটা কবিতার কিছু অংশ উদ্ধৃত করে। শেষ করি তাঁরই কবিতার দ্যুতিময় একটা লাইন দিয়ে, শত সংকটের মধ্যেও ‘আমরা চলেছি সেই উজ্জ্বল সূর্যের অনুভবে।’



মন্তব্য