kalerkantho


বই আলোচনা

বাংলাদেশের ইতিহাস ও পুরাকীর্তিবিষয়ক আকরগ্রন্থ

মো. আতাউর রহমান

২৯ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



বাংলাদেশের ইতিহাস ও পুরাকীর্তিবিষয়ক আকরগ্রন্থ

খন্দকার মাহমুদুল হাসানের ‘বাংলাদেশের পুরাকীর্তি কোষ : প্রাচীন যুগ’, মূল্য : ৮০০ টাকা, ‘বাংলাদেশের পুরাকীর্তি কোষ : মধ্যযুগ’, মূল্য : ৭০০ টাকা। প্রকাশক : পার্ল পাবলিকেশনস

খন্দকার মাহমুদুল হাসানের ‘বাংলাদেশের পুরাকীর্তি কোষ : প্রাচীন যুগ’ ও ‘বাংলাদেশের পুরাকীর্তি কোষ : মধ্যযুগ’ নামের বিপুলায়তনের দুটি গ্রন্থে, অন্য কথায় একই গ্রন্থের দুটি খণ্ডে সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে বাংলাদেশের ইতিহাস ও পুরাকীর্তির বিশদ বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এই গ্রন্থেই প্রথম বাংলার প্রত্নতত্ত্ব চর্চার মৌল আকরগ্রন্থগুলো যেমন—অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়র ‘গৌড় লেখমালা’, ননীগোপাল মজুমদারের Inscriptions of Bengal Vol-3, মৌলভী শামসুদ্দীন আহমেদের Inscriptions of Bengal Vol-4, আহমদ হাসান দানীর Muslim Architecture in Bengal, আবদুল করিমের Corpus of the Arabic and Persian Inscriptions of Bengal প্রভৃতির নিবিড় পঠনের মাধ্যমে সেগুলোর নির্যাস সংগ্রহ ও সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রত্নস্থলে ভ্রমণ করে বিশদ তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে তাম্রশাসন-শিলালেখগুলোর বর্ণনাসহ উপস্থাপন করা হয়েছে। ‘প্রাচীন যুগ’ খণ্ডের পৃষ্ঠাসংখ্যা ১০৯৯ এবং ‘মধ্যযুগ’ খণ্ডের পৃষ্ঠাসংখ্যা ৮৬৪। দুটি খণ্ডেই রয়েছে বিপুলসংখ্যক রঙিন আলোকচিত্র। ভাবাই যায় না যে কী বিপুল শ্রমেই না এত বিপুল তথ্যের সমাহার ঘটিয়েছেন লেখক। যদিও পাঠকসমাজের কাছে ইতিহাস-প্রত্নতত্ত্বের গবেষক-লেখক হিসেবে তাঁর একটি ভালো পরিচিতি আছে, কিন্তু এ কথা বলতে দ্বিধা নেই যে এই বিশাল কর্মটির অনেক অভিনবত্ব ও নতুন দিক আছে এবং নিঃসন্দেহে তাঁর শ্রেষ্ঠ কর্মগুলোর মধ্যে এটি একটি।

‘প্রাচীন যুগ’সংক্রান্ত খণ্ডটিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বাংলা ভূখণ্ডের সৃষ্টির পর আদিমানবদের আগমন থেকে শুরু করে সেন যুগের অবসানকাল পর্যন্ত সময়ের ঘটনাবলি এবং পুরাকীর্তিগুলো। এতে রাজবংশগুলোর ইতিবৃত্ত ছাড়াও প্রস্তরযুগের হাতিয়ার, টেরাকোটা সামগ্রী, মুদ্রা, তাম্রশাসনসহ প্রত্নবস্তুগুলোর বিশদ বিবরণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বর্ণানুক্রম অনুযায়ী বিভিন্ন জেলার প্রত্ন নিদর্শনগুলোর বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। পুরো গ্রন্থে আছে লেখকের ব্যক্তিগত ভ্রমণ-অভিজ্ঞতার ছাপ। নিঃসন্দেহে গবেষণাকর্ম হিসেবে তথ্যসূত্র ও মূল্যবান টীকায় সমৃদ্ধ গ্রন্থটি খুবই মূল্যবান। তবে লেখক যে শুধু ঘরে বসেই এর তথ্য-উপাত্তের জোগান দেননি, বরং দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রায় প্রতিটি প্রত্নস্থলে নিজে সশরীরে গিয়েছেন, তার প্রমাণ ছড়িয়ে আছে গোটা বইয়ে। লেখকের নিজের তৈরি করা দেশের বিভিন্ন প্রত্নস্থলের অবস্থান নকশাও সন্নিবেশিত হয়েছে গ্রন্থটিতে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সম্পূর্ণ অনালোচিত বহু প্রত্নস্থলের খবরও পাঠক জানতে পারবেন এ গ্রন্থের সুবাদে। ‘প্রাচীন যুগ’ শীর্ষক খণ্ডের সূচনা হয়েছে প্রত্নতত্ত্ববিষয়ক কিছু সাধারণ ধারণা, বাংলা ভূখণ্ডের সৃষ্টিকাহিনি, জনগোষ্ঠী, ভাষা, লিপি ও রাজশক্তিগুলোর উদ্ভব-বিকাশ পর্ব নিয়ে সমৃদ্ধ আলোচনা দিয়ে। প্রাগৈতিহাসিককাল থেকে সেন যুগ পর্যন্ত পুরাকীর্তিগুলোর জেলাওয়ারী বিবরণ শুরুর আগের অধ্যায়গুলোতে প্রাচীন মৃত্পাত্র-টেরাকোটা, প্রস্তরযুগীয় হাতিয়ার, স্তম্ভ, স্তূপ, বিহারসহ প্রাচীন স্থাপনার বৈশিষ্ট্য, বিবরণ, তাম্রশাসন-শিলালেখগুলোর শ্রেণিবিভাজন ও কালানুক্রমিক বিবরণ, প্রাচীন ভাস্কর্যগুলোর উত্স, বৈশিষ্ট্য, বিবর্তনচিত্র, শ্রেণিবিভাজন ও প্রাচীন মুদ্রার বর্ণনাসমৃদ্ধ অধ্যায়গুলো রয়েছে। এ প্রসঙ্গে প্রাচীন তাম্রশাসন-শিলালেখ ও প্রাচীন ভাস্কর্যসংক্রান্ত অধ্যায়গুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাম্রশাসনগুলোর ধারাবাহিক বর্ণনারীতির উল্লেখ ছাড়াও বাংলা ভূখণ্ডে এবং বিশেষত বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আবিষ্কৃত তাম্রশাসনগুলোর অনুবাদসহ বিশদ বিবরণ রয়েছে। একসঙ্গে তাম্রশাসনগুলোর এত বিস্তারিত বিবরণপ্রাপ্তিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রাচীন ভাস্কর্যসংক্রান্ত অধ্যায়টিতে জৈন, বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য ধর্মসংশ্লিষ্ট ভাস্কর্যগুলোর বিবরণ শুধু নয়, শনাক্তকরণের কালানুক্রমিক বৈশিষ্ট্যের বিশদ বর্ণনাও রয়েছে। এটি এ গ্রন্থের একটি উল্লেখযোগ্য দিক।

‘মধ্যযুগ’ খণ্ডে সেন যুগের অবসান থেকে শুরু করে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির ক্ষমতারোহণ পর্যন্ত সময়কালের প্রত্নকীর্তির বিবরণ আছে। ঐতিহাসিক পটভূমিসহ মধ্যযুগীয় রাজবংশগুলোর ইতিবৃত্ত, মসজিদ-মন্দিরসহ স্থাপত্যকর্মের কালানুক্রমিক বৈশিষ্ট্যসহ শ্রেণিবিভাজন ও বিশদ বর্ণনা, মুদ্রা, শিলালেখ ও টেরাকোটার বৈশিষ্ট্য-বিবরণের পর শুরু হয়েছে জেলাওয়ারী প্রত্নকীর্তির বিবরণ। সারা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আগের অনালোচিত ও আলোচিত প্রত্নকীর্তির সরেজমিন পরিদর্শনভিত্তিক বর্ণনা দিয়েছেন লেখক। এককথায় নিজের শিকড় সম্পর্কে উত্সাহী বাঙালি মাত্রেরই অবশ্যপাঠ্য একটি অসামান্য কোষগ্রন্থ এটি।


মন্তব্য