kalerkantho


লে খা র ই শ কু ল

কঠোর জীবন থেকে প্রেরণা পান ইভিন্দ জনসন

২৯ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



কঠোর জীবন থেকে প্রেরণা পান ইভিন্দ জনসন

সুইডেনের ঔপন্যাসিক ও ছোটগল্পকার ইভিন্দ জনসন ১৯৭৪ সালে হারি মার্টিনসনের সঙ্গে যৌথভাবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। তাঁর জন্ম ১৯০০ সালে এবং মৃত্যু ১৯৭৬ সালে। আধুনিক সুইডিশ সাহিত্যের নতুন দিকনির্দেশনাদানকারী প্রধান লেখকদের অন্যতম মনে করা হয় তাঁকে। নোবেল পুরস্কার দেওয়ার সময় উল্লেখ করা হয়, ‘তাঁর সাহিত্য স্বাধীনতার সেবায় বিশেষ অবদান রেখেছে, তাঁর বয়ানকৌশলে পাওয়া যায় বিরাট পরিসরের স্থান-কালের মধ্যে সুদূরপ্রসারী দৃষ্টি।’

বিশাল রচনাভাণ্ডারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘দ্য ফোর স্ট্রেঞ্জারস’ (১৯২৪), ‘টাউন ইন ডার্কনেস’ (১৯২৭), ‘ফেয়ারওয়েল টু হ্যামলেট’ (১৯৩০), ‘রেইন অ্যাট ডন’ (১৯৩৩), ‘দ্য সোলজার্স রিটার্ন’ (১৯৪০), ‘এ ফিউ স্টেপস টুওয়ার্ডস সাইলেন্স’ (১৯৭৩) ইত্যাদি। 

কঠোর জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা লাভ করেন তিনি। জীবনে অনেক রকমের কাজকর্ম করেছেন জীবিকার জন্য। মাত্র ১৩ বছর বয়সে স্কুল ছাড়েন কাজের সন্ধানে। প্রথমে শুরু করেন কাঠ বাছাইয়ের কাজ। তারপর করাতকলের শ্রমিকের কাজ; সিনেমার টিকিট বিক্রি করেন কিছুদিন, প্রজেশনিস্ট হিসেবেও কাজ করেন। ১৯২০ সালে শ্রমিক ধর্মঘট শুরু হলে শুধু লেখা থেকে পাওয়া সামান্য উপার্জনের ওপর নির্ভর করতে হয় তাঁকে। ওই সময়ই আরো কয়েকজন উঠতি লেখকের সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ভার নুতিদ’ (‘আমাদের বর্তমান সময়’) নামের সাহিত্য পত্রিকা। সেটি ছয় সংখ্যা ছাপা হয়েছিল। তারপর তিনি ‘দে গ্রোনা’ (‘আমরা সবুজ’) নামের ভবিষ্যতের লেখকদের সোসাইটির সদস্য হন। তিনি সক্রিয়ভাবেই রাজনীতি ও ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তবে ১৯২৪ সালে তিনি সমাজতন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করেন। লেখক হিসেবে সে সময়টায়ই তিনি বেশি সিরিয়াস হয়ে ওঠেন এবং বেকার অবস্থায় সুইডেন ত্যাগ করেন। জার্মানির বার্লিন ও ফ্রান্সের প্যারিসে হোটেলে কাজকর্ম করলেও লেখক হিসেবে নিজেকে প্রস্তুত করেন ওই সময়ই। জীবনের অভিজ্ঞতা, বিশেষ প্রিয় লেখকদের লেখা তাঁর লেখকজীবন তৈরির পেছনে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। তাঁর ওপরে বিশেষ প্রভাব ছিল ন্যুট হ্যামসুন ও অগাস্ট স্ট্রিনবার্গের।

ইভিন্দ জনসনের প্রথম দিকের লেখায় দেখা যায় তাঁর কষ্টকর বেড়ে ওঠার কালের চিত্র এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যার চিত্রও। তাঁর পরের অনেক উপন্যাসে গল্পবলিয়ের নানা রকম ভূমিকা নিয়ে নিরীক্ষা করেন। ঐতিহাসিক ঘটনাবলি ও সেগুলোর ব্যাখ্যার মধ্যের মিথস্ক্রিয়া নিয়েও কথা বলেন তিনি। তাঁর প্রধান চরিত্র অনেক সময়ই পোড়খাওয়া, তবে মানবতাবাদী মনের অধিকারী। হ্যামসুন থেকে ফকনার পর্যন্ত উপন্যাসের আদর্শগত ও কৌশলগত বিকাশের চিত্র তুলে ধরে তাঁর উপন্যাস। সে জন্যই তাঁর উপন্যাসজুড়ে থাকে তাঁর সময়ের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিতর্ক। জীবনের আলোকিত ও অন্ধকার দিক তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁর প্রতিটি উপন্যাসই তিনি আলাদা আলাদা নিরীক্ষা হিসেবে দেখেছেন। 

১৯৩৮ সালে তাঁর প্রথম স্ত্রী মারা গেলে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন সিলা ফ্রাংকেনহসারকে। ফ্রাংকেনহসারের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি অনুবাদকর্মে আত্মনিয়োগ করেন। আলবেয়ার কামু, অনাতোল ফ্রাঁ, জ্যঁ পল সার্ত্রে, ইউজিন আয়োনেসকো প্রমুখের রচনা অনুবাদ করেন। শুধু সাহিত্য পাঠ ছাড়াও সচেতন লেখক হিসেবে তাঁর আন্তর্জাতিক সংশ্লিষ্টতা ছিল উল্লেখ করার মতোই। ১৯৪৭ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের অক্টোবর বিপ্লব উদ্যাপনের সময় তিনি সমাজতন্ত্রের সমালোচনা করে বলেন, সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র আর জাতীয়তাবাদী কিংবা ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের মধ্যে যতটা অমিল আছে, তার চেয়ে বেশি আছে মিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তিনি দুই বছর সুইজারল্যান্ডে ছিলেন। সেখানকার সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক অবস্থান তাঁর লেখার পটভূমি তৈরি করেছে। তাঁর বেশ কিছু উপন্যাসে সেখানকার ছোঁয়া পাওয়া যায়। তাঁর চরিত্ররা সুইডিশ হলেও ইউরোপের সাংস্কৃতিক ঐক্য সম্পর্কে জনসনের পছন্দের আদর্শের মিশেল থাকে তাদের মধ্যে।

১৯৭৪ সালে ইভিন্দ জনসন ও হ্যারি মার্টিনসনকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার পর বিতর্ক ওঠে। তাঁরা দুজনই তখন খোদ নোবেল কমিটিতেই ছিলেন। বিতর্কের আরো কারণ হলো, সে বছর পাঠকদের কাছে প্রিয়তর ছিলেন গ্রাহাম গ্রিন, সল বেলো, নবোকভ ও বোর্হেস।

দুলাল আল মনসুর



মন্তব্য