kalerkantho


ধারাবাহিক উপন্যাস

বিষন্ন শহরের গল্প

সেলিনা হোসেন

২৯ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



বিষন্ন শহরের গল্প

অঙ্কন : বিপ্লব

পাঁচ

সুজন নিজের ক্রোধ সামলাতে পারে না। যুদ্ধের পরাজিত সৈনিকের মতো চেঁচাতে ইচ্ছা করছে। নিজের ভেতরে যত গরল আছে, তা উগরে ফেলার বাসনায় অস্থির তাড়না অনুভব করে। এই মুহূর্তে ও বুঝে গেছে ক্রোধ ছাড়া আর কোনো অনুভব ওর শরীরে নেই। ও এখন ক্রোধের রাজ্যের সম্রাট। ঘরের মেঝেতে দুপদাপ পা আছড়ায় ও। একটু আগে যেসব জিনিস ছুড়ে মেরেছে, সেগুলো পায়ের নিচে পিষ্ট করে। অলিভ অয়েলের শিশিটাকে ফুটবল বানিয়ে খেলতে শুরু করে। এক লাথিতে একবার এপাশে ফেলে, আর এক লাথিতে দেয়ালের অন্য পাশে। বেশ লাগছে লাথি দিতে। সামনে কোনো মানুষ থাকলে তাকেও ফুটবল বানিয়ে খেলত। শরীর রাগে ফুঁসতে থাকে। এভাবে মেজাজ খারাপ হয়ে যাওয়া বেঁচে থাকার নতুন লক্ষণ কি?

ও দুহাতে নিজের চুল ঝাঁকায়। আকাশ  দেখতে খুব ইচ্ছা করে। কিন্তু দেখা হয় না। আবার শরীর ফুঁসে ওঠে। ভাবে, মা থাকলে ওর ছোটবেলার মতো বলত, সোনা রে এমন করে না।

—আমি এমনই করব। আমার খুশি।

—নিজের খুশিমতো সব কিছু করা যায় না বাবা।

—কেন? কেন করা যাবে না?

—অন্যের খুশিও তোকে দেখতে হবে।

—আমি অন্যের খুশির ধার ধারি না।

—বাবা, এভাবে বলতে হয় না।

—তুমি আমাকে সব সময় বকাবকি করো মা।

—এটা বকা নয় বাবা। এটা তোমাকে শেখানো।

—আমি খেলতে গেলাম। আমি এসব শিখতে চাই না।

ও ছুটে বাড়ির বাইরে চলে যায়। বাড়ির দিকে আঙুল তুলে চেঁচিয়ে বলে, তুমি যদি আমাকে বেশি বকো তাহলে আমি বাড়ি ছেড়ে চলে যাব। যেদিকে খুশি সেদিকে।

—আমাকে ছেড়ে যেতে পারবি রে সোনা?

—পারব। একশবার পারব। মা হয়ে শুধু শাসন করবে, এটা হবে না।

সেই দিনগুলো ওর সামনে এখন এক বিশাল ছুরি। সেই ছুরি সারাক্ষণ কেটে দিচ্ছে সময়ের পাটাতন।

ও ঘড়ির দিকে তাকায়। দেখতে পায় ঘড়িতে কোনো সময় নেই। আবার গোঁ গোঁ শব্দ বের হতে থাকে শরীরের ভেতর থেকে। ঘড়ি থেকে সব কিছু মুছে গেছে। ওটা একটি ভাঙা দেয়াল। দেয়ালের গায়ে সময়ের শ্যাওলা নেই, ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা সময়ের ঘাস নেই। মুছে গেছে অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত্। ও ঘড়িটা মেঝেতে ফেলে লাথি মারে।

দরজায় টুকটুক শব্দ হয়। দরজা খুলে যায়। রুহুল আমিন দাঁড়িয়ে আছে সামনে। সুজনের দাঁত-মুখ খিঁচানো ক্রুদ্ধ চেহারা দেখে চমকে ওঠে।

—কী হয়েছে আপনার?

—আমার কী হয়েছে তা জানার দরকার কী আপনার?

—এমন রেগে আছেন কেন?

—আমার ইচ্ছা।

—মরণের আগে মানুষের এমন রাগ থাকে না।

—তাহলে কী থাকে?

—দুঃখ।

—দুঃখ! দুঃখ একটা কচু।

—দুঃখ মনে রাখলে খুন করা যায় না। বুক কাঁপে। যার বুক কাঁপে না খুন হলো তার কাছে এক রকম বেলেল্লাপনা।

—বেলেল্লাপনা? মুখ সামলে কথা বলেন।

—ঠিকই বলি। আপনি আসলে মানুষ না।

—মানুষ আবার কী? হাত, পা, চোখ, কান থাকলেই মানুষ হয় না। ফাজলামি করবেন না আমার সঙ্গে। কেন আসছেন?

—কিছু খাবেন কি না জিজ্ঞেস করতে এসেছি।

—এত দরদ দেখাতে হবে না। যান, চলে যান।

—আপনার মায়ের দেওয়া বিদেশি সাবানটা কোথায় রেখেছেন?

—আপনার তাতে কী দরকার? আপনি আমার সঙ্গে ফালতু কথা বলছেন। আপনি চলে যান।

—আপনাকে একটু পরে গোসল করতে হবে।

—আমি জানি সেটা আমার শেষ গোসল। আপনাকে তা বলতে হবে না।

—আজকের দিনে আপনার সময় ঘড়ি ধরে মাপা—

—খামোশ!

সুজন মেঝেতে পা দাপায়। ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে রুহুল আমিনের দিকে তাকায়। আমিন দুপা পিছিয়ে দাঁড়ায়।

—আপনি বের হন।

রুহুল যেতে যেতে বলে, বদমাশ একটা।

সুজন পেছন থেকে খামচে ধরে ওর জামার কলার। চিত্কার করে বলে, মুখ সামলে কথা বলবি শুয়োরের বাচ্চা।

আমিন হকচকিয়ে যায়। এই লোকটি এভাবে মৃত্যুর দিনে উল্লাস করছে।

—ঘুষি দুচারটা মারতে পারতাম। মারলাম না। ছেড়ে দিলাম।

এই মারমুখী লোকটির সামনে দাঁড়িয়ে নিরাপদ বোধ করে না আমিন। দরজার বাইরে চলে আসে। পেছন থেকে সুজন বলে, কিছু বললে না যে?

—ফাঁসির মঞ্চ রেডি। আর একবার  চেকআপ হবে।

—জানি। আমাকে ভয় দেখিও না। আমি ভয়ের পাত্র না।

—ফুঃ, কে কারে ভয় দেখায়!

আমিন দরজা বন্ধ করে চলে যায়। শরীরে কাঁপুনি জাগে। মানুষ কী করে এমন হতে পারে তা ভাবতে পারে না। জেলখানার খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে আমিন দেখতে পায় সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। গাছের মাথায় কাকগুলো তীব্র স্বরে ডাকছে। দুহাতে নিজের কান চেপে ধরে আমিন। কাকের ডাকাডাকি শুনতে ভালো লাগছে না। দূর থেকে কেউ ওকে ডাকে। আমিন ঘুরে তাকায় না। বাদল এসে কাছে দাঁড়ায়।

—স্যার, আপনাকে ডাকছে?

—কেন?

—ফাঁসির আসামির পোশাক ঠিক করা হবে সে জন্য।

—ও হ্যাঁ, তার সময় তো হয়েছে। কয়টা বাজে দেখ তো?

—ছয়টা বাজতে দশ মিনিট বাকি।

—ও আচ্ছা। আমি যাচ্ছি।

—লোকটা খুব শক্ত স্যার। এখন তো খালি চিল্লাচিল্লি করে। মেজাজ তুঙ্গে তুলে রেখেছে।

—তুই তোর কাজে যা।

বাদল আর কথা বলে না। সুজনের আচরণ ওকে ক্ষুব্ধ করে রেখেছে। ওই লোকের চেহারা ও আর দেখতে চায় না। ওকে যমটুপি পরানো হলেই ওর শান্তি হবে।

বাদল নিজের মনে শিস বাজায়। বাজাতে বাজাতে অন্যদিকে যায়। শিসের শব্দ শুনে নুরুল আমিনের মনে হয় আজ একটি লোকের ফাঁসি হবে, এই খুশি অন্যজনকে ভরিয়ে তুলেছে। কারণ ফাঁসির আসামি ওর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছে। নুরুল আমিন পেছন ফিরে তাকায়। বাদলকে আর দেখা যায় না। এক মুহূর্ত দাঁড়ায় রুহুল। দূর থেকে শিসের শব্দ শুনতে পায়। অবাক হয়ে ভাবে, মৃত্যুও মানুষকে আনন্দ দেয়।  জেলখানার চাকরিজীবনে এটা এভাবে জানা হয়নি। ও জানে একসময় শব্দ মিলিয়ে যাবে, কিন্তু ওর স্মৃতি থেকে হারাবে না। এটুকু ভেবে রুহুল আমিন সামনে এগোয়।

উল্টো দিক থেকে এগিয়ে আসে আরেকজন।

—স্যার।

—কিছু বলবে?

—ফাঁসি কখন হবে স্যার?

—তুমি কি একজন মানুষের ফাঁসির অপেক্ষায় আছো?

—জি স্যার। যে লোক বউ খুন করে, তার তো ফাঁসি হওয়া উচিত স্যার। ঘরে বনিবনা না হলে তালাক হবে। খুন করবে কেন?

—ঠিক। খুন করা অধিকার হতে পারে না। আমিও তোমার সঙ্গে একমত।

—কখন শয়তানটা ফাঁসির দড়িতে ঝুলবে?

—তুমি তোমার কাজে যাও।

—যাই স্যার।

লোকটি বিব্রত হয়ে পাশে সরে দাঁড়ায়। রুহুল আমিন এগিয়ে যায়। এবার আর শিসের শব্দ ভেসে আসে না। কারণ এই লোকটির আনন্দ  পাওয়া বাদলের মতো নয়। ওর ব্যক্তিগত আক্রোশ নেই লোকটির ওপর। ও ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রত্যাশায় আছে। খুনের আসামি দণ্ড পাচ্ছে এই আনন্দ ওর। রুহুল আমিন ভাবে, এটাই যৌক্তিক। ন্যায়বিচার না থাকলে সমাজ গড়ে ওঠে না। মানুষের জীবনে স্বস্তি থাকে না। হাঃ, আমাদের সমাজ ন্যায়বিচারের সমাজ হোক। অপরাধীর শাস্তি হোক। রুহুল আমিন দুহাত কপালে ঠেকায়। দ্রুত পায়ে ঢুকে যায় সুপারের ঘরে। মিটিংয়ের অন্যরা এসে বসেছে।

রুহুল আমিন চেয়ার টেনে বসলে একজন জিজ্ঞেস করে, আসামির খবর কী?

—মেজাজ করছে। মেজাজ একদম তুঙ্গে।

—আজ ওর কী হয়েছে, কে জানে—

—বিকেলে মা-বাবাকে বলেছে এমন খুন করে অনেকে পার পেয়ে যায়।

—হাঃ, ওর আর সে সুযোগ নেই।

—কী কাপড় পরিয়ে ওকে ফাঁসির মঞ্চে উঠাব তা আমরা বাছতে বসেছি।

জেলের কর্মকর্তারা টেবিলের ওপরে রাখা পোশাকের দিকে তাকায়। এখান থেকে ফাঁসির পোশাক নির্বাচন করা হবে। তিন রঙের পোশাক রাখা আছে—সাদা, কালো ও চেক। তিন ধরনের পোশাকের মধ্যে সাদা পোশাক নির্বাচন করে সবাই। রং নিয়ে কেউ কোনো কথা বলে না। সবাই জানে যে এই পোশাক আসামির জন্য কোনো ব্যাপার নয়। মৃত্যুর সরল সত্য অনুভবই প্রধান দিক। রুহুল ভাবে, যদি আসামিকে পোশাক নির্বাচন করতে বলা হতো তাহলে তার একটি গুরুত্ব থাকত। আসামি মৃত্যুর সত্যকে রঙের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করত কি না কে জানে।

সুজন আজ বিকেল থেকে যে মেজাজ দেখাচ্ছে, এমন মেজাজে ও কোনো পোশাকই বাছাই করবে না। হয়তো বলবে, আমি তো পোশাক পরেই আছি, এটা পরেই ঝুলতে চাই। পোশাক নিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলতে আসবেন না।

জেলার রুহুল আমিনের দিকে তাকায়।

—আপনি কী মনে করেন আসামির যে মেজাজ আপনি দেখেছেন সেই মেজাজে লোকটি এই পোশাক পরতে চাইবে না?

—হ্যাঁ, এমন ঔদ্ধত্য ও দেখাতে পারে। ওকে এমন মেজাজে আমি দেখিনি। আজ ও নিজেকে বদলে ফেলেছে। যেন আমাদের দেখা আমিরুল খান না।

এক অন্য মানুষ।

সঙ্গে সঙ্গে আরেকজন বলে, খুনিদের আবার মেজাজ আর শান্ত্ত থাকা! এদের শুধু ইবলিশ বলা যায়। শুয়োরের সঙ্গেও তুলনা চলে না। পশু ওদের চেয়েও ভালো। নিজের বউকে কুপিয়ে মেরেছে, পাষণ্ড একটা।

—থাক এসব আলোচনা।

—এমন অন্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের মনোভাব ধরে রাখতে পারি না।

ক্রোধের বাতাস সবার শরীর স্পর্শ করে। বেশ কিছুক্ষণ নীরব থাকে ঘর। আরেকজন বলে, ওর মা-বাবাও ওর সঙ্গে কথা বলেনি, বুকে জড়িয়ে ধরেনি। নীরবে কেঁদেছে।

—কষ্ট সামলাতে না পারার কান্না।

—আমরাও বুঝি সব।

—বিচারের রায় কার্যকর হবেই, সেটা মেনে নেওয়ার কান্না।

—চোখের পানি ফেলা ছাড়া তাদের আর কি-ই বা আছে। তার পরও মা একটি বিলেতি সাবান দিয়ে গেছে।

—মা চেয়েছে ছেলেটি সুগন্ধি সাবান গায়ে মেখে ফাঁসির মঞ্চে উঠুক।

জেলার মৃদু রাগের সঙ্গে বলেন, আমরা নিজেরা ওদের কথা এভাবে বলছি কেন?

অকস্মাত্ ঘর নীরব হয়ে যায়।

জেলার পিয়নকে ডেকে পোশাকগুলো সরাতে বলেন। ঘড়ি দেখেন। সাড়ে ছয়টা বাজে। তারপর সবার দিকে তাকিয়ে বলেন, আজ এমন একটা দিন, যে দিনের প্রেসার হাজার দিনের চেয়েও বেশি। সহ্য করা কঠিন। মানসিক-শারীরিক চাপ পড়ছে।

—ঠিক স্যার। আমি একদিকে খুশি যে অপরাধী শাস্তি পাচ্ছে। অন্যদিকে মেনে নিতে বুক ভেঙে যাচ্ছে। কিভাবে মানুষ এত বর্বর হয় সেটাও নিজেকে বোঝাতে পারছি না।

—আপনারা চা খাবেন?

—হ্যাঁ, চা খাব। বিস্কুটও দিতে বলেন। নিজেকে শান্ত করা দরকার। আমরা অস্থির হয়ে আছি।

—আমাদের সামনে আরো অনেক কাজ আছে। জেলার সালামকে ডেকে চা-বিস্কুট দিতে বলেন। সবাই মিলে চা-বিস্কুট খেলে বুঝতে পারে তারা খানিকটা রিলাক্স মুডে ঢুকেছে। নিজেদের আড়মোড়া ভেঙেছে। দেয়ালঘড়ির দিকে তাকালে সবাই দেখতে পায় ছয়টা ৪৫ বাজে। সামনে আরো কঠিন সময় দাঁড়িয়ে আছে। আজকের দিনে সময় এক প্রধান দিক। প্রত্যেকেই যে যেখানে থাকুক নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে। এ যেন সময়ের সঙ্গে বোঝাপড়া, জানাশোনা ইত্যাদি হাজার রকম শব্দের নখরাসি চলছে। ফাঁসির আসামি এটা যেমন করছে জেলখানার কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও তেমন করছে। তাদের দায়ও অনেক। একটি নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করতে হবে এই তাড়নায় প্রত্যেকে অস্থির। সুস্থিরভাবে সময়ের সঙ্গে যোগ স্থাপন করতে পারছে না।

চা খেয়ে বের হয়ে যে যার কাজে চলে যায়। ফাঁসির জন্য নির্বাচিত পোশাক সুজনকে পৌঁছাতে হবে রুহুল আমিনকে। বাইরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ও ভাবে সময় হলে আবার এখানে এসে পোশাকটা নিতে হবে। হাফহাতার সাদা রঙের ঢোলা শার্ট আর একটি সাদা পায়জামা। রুহুল আমিন মাথা ঝাঁকিয়ে নিজেকে সামলায়।

সুজন এখন কনডেম সেলে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আছে। দেখতে পায় ঘড়ি চলছে। সব কিছু ঠিকঠাক আছে, ঘড়ির কাঁটায় সময় এগোচ্ছে। বাইরে সন্ধ্যা নেমেছে।

চলবে


মন্তব্য