kalerkantho


সুখ-দুঃখ আনন্দ-বেদনার রসায়নে ২০১৭

তুহিন ওয়াদুদ   

২৯ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



সুখ-দুঃখ আনন্দ-বেদনার রসায়নে ২০১৭

আজ থেকে প্রায় কুড়ি বছর আগের কথা। তখনো আমাদের গ্রামের বাড়িতে টেলিভিশনে শুধুই বিটিভি দেখা যেত। এক দুপুরে প্রথাবিরোধী লেখক হুমায়ুন আজাদের সাক্ষাত্কার দেখছিলাম। তিনি যা বলছিলেন তার সারমর্ম হচ্ছে, আমরা বাঙালিরা আগে কোনো দিন এত ভালো ছিলাম না, যতটা ভালো এখন আছি। হুমায়ুন আজাদের চেতনার অনুগামী ছিল না সমাজ। তাঁর মননশীলতার বিপরীতে বহমান সব কিছু। অনেকটা ভুল সময়ে জন্ম নিয়েছেন তিনি। নিজেই লিখেছেন, ‘আমি জন্মেছিলাম আমি বেড়ে উঠেছিলাম।/ আমি বেঁচে ছিলাম অন্যদের সময়ে।’ সেই হুমায়ুন আজাদও আগের দিনের চেয়ে পরের দিনগুলোকেই ভালো বলেছেন।

চিরায়ত প্রবাদ ‘যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ।’ এই প্রবাদ হয়তো বর্তমানকে সুন্দর করার জন্যই বলা। তা না হলে আমাদের যতই দিন যায় আমরা সামষ্টিক বিবেচনায় তত ভালো থাকছি কিভাবে। এই যে একটি বছর আমরা অতিক্রম করলাম। এ বছরটি তো আগের যেকোনো সময়ের চেয়েই ভালো। অন্তত বাঙালিদের জীবনে। ভালো-মন্দ মিলেই গড়ে উঠেছে আমাদের এ বছর।

চলতি বছরে রোহিঙ্গাদের আগমন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অনেক বড় ঘটনা। মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব খর্ব করেছে। বাধ্য করেছে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে। মৃত্যুভয়ে জন্মভূমির সব কিছু ত্যাগ করে তারা সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। রাখাইন থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৯ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের সহূদয়তা দেখিয়েছেন। বাংলাদেশে তাদের আশ্রয় দিয়েছেন। শেখ হাসিনা মানুষকে যেভাবে মানুষের মর্যাদায় বিবেচনা করলেন সেটি বিশ্ব পরিমণ্ডলে প্রশংসিত হয়েছে। মিয়ানমারে মানবতার চরম লঙ্ঘন সাধিত হয়েছে; অথচ গৌতম বুদ্ধের আদর্শে বেড়ে ওঠা মিয়ানমারের নাগরিকদের দার্শনিক ভিত্তি হওয়ার কথা ছিল মানবতাবোধ। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’ এটি হওয়ার কথা ছিল তাদের জীবনের পাথেয়। ‘সকল প্রাণীই সুখী হোক’—বুদ্ধের এই বাণী মিয়ানমারে আজ শুধুই কাগুজে বাণী মাত্র। পাল রাজত্বে বাংলায়ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল শান্তি। আর আজ স্বদেশিদের ওপর তারা চালাচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন। মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সু চির কাছে বিশ্ববাসী আশা করেছিল—তিনি শান্তির পক্ষেই থাকবেন; কিন্তু তিনি মুখে অনেকটা কুলুপ এঁটে নীরবতা পালন করছেন। যেটুকু মুখ খুলেছেন, কথা বলেছেন তা মানবতার পরিপন্থী। ফলে সংকট আরো ঘনীভূত হয়। এখনো বাংলাদেশে প্রবেশ করছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালে যে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন তার সাহিত্যিক-অর্থনৈতিক-রাষ্ট্রিক-সামাজিক, এমনকি ধর্মীয় মূল্যও রয়েছে। ইউনেসকো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে গ্রহণ করেছে। ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে’ এ ভাষণটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এখন এ ভাষণটি ‘ওয়ার্ল্ড ডকুমেন্টারি হেরিটেজ’ হিসেবে স্বীকৃত। ইউনেসকোর এই স্বীকৃতিতে নতুন করে খুব উচ্ছ্বসিত হওয়ার কিছু নেই। এর কারণ হচ্ছে, ঐতিহাসিক ৭ মার্চের বক্তৃতা করার প্রায় অর্ধশত বছর পর এ স্বীকৃতি বাঙালিদের কাছে তেমন কোনো গুরুত্ব বহন করে না; বরং এ স্বীকৃতি ছাড়াই বাংলার জনগণের কাছে এ ভাষণটি বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবেই পরিগণিত। ইউনেসকোর এই স্বীকৃতি দিতে এত বছরের প্রয়োজন ছিল না। বঙ্গবন্ধুর এ বক্তব্যের ন্যায় অন্য কোনো বক্তব্য বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের সব সংকট, সম্ভাবনা, করণীয় নিয়ে এমন নাতিদীর্ঘ বক্তব্য দিয়েছিলেন যে দেশের ত্রিশ লাখ মানুষ নিজেদের জীবন উত্সর্গ করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছেন। তবে এই স্বীকৃতি সমালোচনাকারীদের জন্য একটি বড় জবাব। বিশ্বপরিমণ্ডলের ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষিত থাকবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এই কালজয়ী ভাষণ আজও শুনলে শরীরের লোম শিহরিত হয়।

বহুমুখী পদ্মা সেতু বাংলাদেশের জন্য বহুমাত্রিক বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাংকের দয়া ও অনুগ্রহে আমাদের একসময় চলতে হতো। আবুল হাসান দুঃখ করে লিখেছিলেন—‘মৃত্যু আমাকে নেবে, জাতিসংঘ আমাকে নেবে না।’ পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংক অকারণ কর্তৃত্ব দেখিয়ে অনধিকার চর্চা করতে শুরু করেছিল। ঘুষ কেলেঙ্কারির অভিযোগ এনেছিল। তাদের দেওয়া অর্থ ফিরিয়ে নিয়েছিল। যদিও পরবর্তী সময়ে সে অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘কারো টাকা ছাড়াই আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে আমরা তৈরি করব পদ্মা সেতু।’ বিশ্বব্যাংকের প্রতি এই সাহসী উচ্চারণে আর সে কথার বাস্তবায়নে জাতি হিসেবে আমরা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সম্মানিত হয়েছি। সেই পদ্মা সেতু এ বছর দৃশ্যমান হয়েছে। আর এ সেতু দৃশ্যমান হওয়ার মধ্য দিয়ে নিজেদের আর্থিকভাবে এবং আত্মবিশ্বাসের মানদণ্ডে ওঠার ক্ষেত্রে আমরা উত্তীর্ণ হয়েছি।

মানুষ প্রকৃতির ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। নিজেদের ভালো থাকার কাজে প্রকৃতিকে ব্যবহার করছে। কখনো কখনো প্রকৃতি মানুষের ওপর যে আচরণ করে তা মানুষসহ সব প্রাণীর জন্যই ভয়াবহ। যেমন ২০১৭ সালের বর্ষায় যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ নেমে এসেছিল, তা রংপুর-দিনাজপুরসহ দেশের অনেক স্থানে ফসল, গবাদি পশুসহ অনেক মানুষের জীবনহানির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। লাখ লাখ হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। যে কারণে এখন বাজারে চালের মূল্য অনেক। এরও আগে হাওর অঞ্চলে বন্যায় ফসলের প্রচুর ক্ষতি হয়েছে। যার প্রভাব পড়েছিল চালের বাজারে। স্মরণকালের সর্বোচ্চ মূল্য উঠেছিল চালের।

২০১৬ সালের পর পৃথিবীর বয়স বাড়ল আরো একটি বছর। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নক্ষত্রেরও মৃত্যু হয়। জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন—‘নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়,/ হয় নাকি?’ সাধারণ মানুষের তো হয়ই। এটাই প্রাকৃতিক। ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ কিংবা জয় বাংলা, বাংলার জয়’—গানগুলো এখনো মানুষের মুখে মুখে। এ গানগুলো ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে গেয়ে যিনি মুক্তিযুদ্ধে বাঙালিদের সংগঠিত করার কাজ করেছিলেন, তিনি প্রখ্যাত শিল্পী আব্দুল জব্বার (১৯৩৮-২০১৭)। আমৃত্যু তিনি বাংলা গানের জগতে সুষ্ঠু ধারার সংগীত চর্চার প্রতিনিধিত্ব করেছেন। একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত এ কালজয়ী শিল্পী। একসময় যখন গণমাধ্যম আজকের মতো বিকাশ লাভ করেনি, তখন বেতারে অনুরোধের আসর হতো। সেই অনুষ্ঠানে আব্দুল জব্বারের গান শোনার জন্য অনেকেই অনুরোধ করে চিঠি লিখতেন। এ বছর ৩০ আগস্ট তিনি দেহান্তরিত হন।

নিসর্গবিদ দ্বিজেন শর্মার (১৯২৯-২০১৭) মৃত্যু আমাদের গভীরভাবে আহত করেছে। বাংলার প্রকৃতিকে নিখুঁত ও বিশ্লেষণী মূল্যায়নে তিনি অবলোকন করেছেন। গাছের সঙ্গে তাঁর যে নিবিড় সম্পর্ক তা ঐতিহাসিকভাবেই অনন্য। তিনি আমাদের গাছকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশের বৃক্ষপ্রেমীদের মধ্যে অগ্রগামী ছিলেন। উদ্ভিদবিজ্ঞানে তিনি লেখাপড়া করেছেন, শিক্ষকতা করেছেন। আবার তার ওপর বইও লিখেছেন। তাঁর প্রয়াণ আমাদের মধ্যে একটি শূন্যতা সৃষ্টি করেছে। প্রকৃতিবিজ্ঞান বিষয়ে তাঁর অনেক গ্রন্থও আছে। তিনি একুশে পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারসহ অনেক পুরস্কার লাভ করেন, যা তাঁর কাজেরই স্বীকৃতি।

আনিসুল হক (১৯৫২-২০১৭)। ঢাকা উত্তরের মেয়র ছিলেন। গত ৩০ নভেম্বর ২০১৭ তিনিও আমাদের ছেড়ে গেছেন। তিনি উপস্থাপক হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। একটি সময়ে তাঁকে দর্শক শুধু উপস্থাপক হিসেবেই চিনতেন। মেয়র হিসেবেও তিনি যে ভালোবাসা পেয়েছেন, তা আমাদের রাজনীতিতে বিরল। তাঁর মৃত্যু শুধু ঢাকা উত্তরের মানুষের মনে গভীর দুঃখের ছায়া ফেলেনি, সেই দুঃখ ছুঁয়েছে দেশ-বিদেশের বাঙালিদের। তিনি একজন সফল ব্যবসায়ীও ছিলেন।

দীর্ঘদিন বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন রাজ্জাক (১৯৪২-২০১৭)। নায়করাজ রাজ্জাক নামেও পরিচিত ছিলেন। বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালি দিনগুলোতে তিনি ছিলেন প্রাণ। তিনি একাধারে নির্দেশক, প্রযোজক, পরিচালক ও অভিনেতা। এপার বাংলা-ওপার বাংলা উভয় অংশের চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয় করেছেন। বাংলা চলচ্চিত্রের এই প্রাণপুরুষকে আমরা এ বছর আগস্ট মাসে হারিয়েছি। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, স্বাধীনতা পুরস্কারসহ অনেক পুরস্কার ও সম্মাননায় সিক্ত হন তিনি।

বৈশাখ যাপন বাঙালির চিরায়ত বৈশিষ্ট্য। এই বৈশাখ যাপনের ধরন বদলেছে। হালখাতার সঙ্গে বৈশাখ যাপনের যে সম্পর্ক, তা অনেকটাই শীতল হয়ে আসছে। তার পরও সরকারিভাবে এ উত্সবে ভাতা দেওয়া হয়েছে। সেই ভাতা আনন্দের মাত্রাকে আরো সমৃদ্ধ করেছে। একুশের বইমেলায় অন্যান্য বছরের চেয়ে এ বছর নতুন বই ছিল বেশি। তবে প্রশ্ন আছে, বইয়ের সংখ্যার অনুপাতে ভালো বইয়ের সংখ্যা বাড়ছে কি না। সৈয়দ শামসুল হকের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা হয়। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিশালায়তনে ‘সৈয়দ শামসুল হক স্মরণগ্রন্থ’ প্রকাশ করা হয়েছে।

এ বছর কোনো ধর্মীয় উত্সবে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেনি। দেশব্যাপী জঙ্গিবাদ যেভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিল, তা-ও কমে এসেছে। তবে মুক্তবুদ্ধির চর্চা বিকাশে এখনো কোনো অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি। আশাহত হওয়ার কিছু নেই। একদিন হয়তো সেই দিনও আসবে।

আজকের বাংলাদেশের অতীত ছিল বরাবরই অন্ধকারাচ্ছন্ন। বাংলাদেশ পর্বেও অনেক সময় সেই অন্ধকার দখল করে নিয়েছিল সব কিছুকেই। বাংলার মানুষের অব্যাহত চেষ্টায়ই আবার আলো ফুটতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ পর্বের অতীতে আমরা ছিলাম পাকিস্তান পর্বে। সেখানেও শুধু অন্ধকার আর অন্ধকার। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক জীবন ছিল অনেকটাই অবরুদ্ধ। তারও আগে আমরা ছিলাম ব্রিটিশ শাসন পর্বে। এ পর্বে বাঙালির আন্তর্জাতিকতার বিকাশ সাধিত হলেও শোষণযন্ত্রের শিকার ছিলাম আমরা। ব্রিটিশদেরও আগে মোগল-সুলতানি-খলজি শাসন পর্বে মুসলমানরা যে শাসন করেছিল, সেটিও ছিল আমাদের পরাধীন জীবন। ইতিহাস থেকে যতটুকু জানা যায়, তারও আগে যে সেন কিংবা পালদের শাসনামল ছিল, সেটিও আমাদের পরাধীনতারই কাল। অতীতের সবটুকু সময় বিশ্লেষণ করলে আমাদের কাছে যে বছরটি আমরা শেষ করলাম, তা বাংলাদেশ ভূখণ্ডের জন্য অবশ্যই একটি ভালো বছর।

সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার রসায়নে নির্মিত হয় সময়। একক কোনো অনুভূতিলোকে সময়ের বিনির্মাণ কখনোই হয় না। সেই বিবেচনায় আমাদের কিছু অতৃপ্তি থাকলেও অন্য বছরের তুলনায় এ বছর ভালো কেটেছে। আমরা আরো ভালোর দিকে যেতে চাই। বাড়ুক পৃথিবীর বয়স, বাড়ুক আমাদের সমৃদ্ধি। জয় হোক মানবতার।


মন্তব্য