kalerkantho


‘বিনা মুক্তিপণে’র অপহরণে উত্কণ্ঠা জঙ্গিবিরোধী অভিযানে স্বস্তি

৩১ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



বিদায়ী বছরের শেষ পাঁচ মাসে এমন ২০টি রহস্যজনক নিখোঁজের ঘটনা দেশে ব্যাপক আলোড়িত হয়েছে। নিখোঁজ থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে ৯ জন পরে ফিরে এসে অপহূত হয়েছেন বলে দাবি করেন। তবে বিনা মুক্তিপণে ফিরিয়ে দেওয়ার সেই রহস্য অজানাই থাকছে। হদিস না মেলার অনেক দিন পর পাঁচজনকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এখনো খোঁজ নেই ছয়জনের। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গুম ও নিখোঁজের ঘটনা বেশ আলোচিত। এমন অবস্থায় বিনা মুক্তিপণে রহস্যজনক ফিরে আসার ঘটনাগুলো আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে নতুনভাবে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। জনমনে দেখা দিয়েছে নতুন উত্কণ্ঠা।

তবে আগের বছরের তুলনায় আলোচিত অপরাধ কমে এসেছে। বছরজুড়ে জঙ্গিবিরোধী অভিযানের সফলতা জনমনে কিছুটা স্বস্তিও দিয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব মতে, সব সূচকেই অপরাধ কমেছে ২০১৭ সালে। বিগত বছরগুলোতে গড়ে চার হাজার খুন হলেও বিদায়ী বছরের ১০ মাসে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে তিন হাজার ১৮টি। মানবাধিককারকর্মী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ এবং নাগরিক শান্তি নষ্ট করে এমন অপরাধের ঘটনা ঘটেছে ২০১৭ সালে।আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য মতে, চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত মোট ৫৪ জন রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়েছেন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তাদের তুলে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পরে তাদের ৯ জন ফিরে এসেছেন; ছয়জনকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং দুজনের মৃতদেহ পাওয়া গেছে। এখনো খোঁজ মেলেনি বাকি ৩৭ জনের।

বিনা মুক্তিপণে ফিরে এলেন আটজন : ৭ নভেম্বর আইডিবি ভবনের সামসে থেকে নিখোঁজ হওয়ার পর ২১ ডিসেম্বর রাতে রাজধানীর দক্ষিণ বনশ্রীর বাসায় ফিরে আসেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোবাশ্বার হাসান সিজার। ফিরে এসে তিনি জানান, একদল লোক তাঁকে একটি বদ্ধ ঘরে আটকে রাখে। টাকার জন্য অপহরণের কথা জানায়। তবে মুক্তিপণ দাবি না করেই একপর্যায়ে অপহরণকারীরা তাঁকে ছেড়ে দেয়। গত ১০ অক্টোবর নিখোঁজ হওয়ার পর ১৯ ডিসেম্বর ফিরে একইভাবে জানান পূর্ব-পশ্চিমবিডিডটকম নামের একটি অনলাইন পোর্টালের সিনিয়র রিপোর্টার উত্পল দাস। ব্যবসায়ী ও বেলারুশের অনারারি কনসাল অনিরুদ্ধ রায়কে গত ২৭ আগস্ট গুলশানের ইউনিয়ন ব্যাংকের সামনে থেকে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নেওয়া হয়। ৭৯ দিন পর বাড়ি ফেরেন তিনি। অনিরুদ্ধ ‘অপহরণের’ জন্য ব্যবসায়িক বিরোধের প্রতিপক্ষকে দায়ী করলেও পুলিশের কাছে আবেদন করে তদন্ত না করার অনুরোধ জানান।

গত ২৩ আগস্ট পল্টন থেকে নিখোঁজ হন আইএফআইসি ব্যাংকের করপোরেট কমিউনিকেশন ও ব্র্যান্ডিং বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট শামীম আহমেদ। ৩০ আগস্ট অক্ষত অবস্থায় বাড়ি ফিরলেও কোনো কথা বলেননি তিনি। ২৫ সেপ্টেম্বর ঢাকার উত্তরা থেকে নিখোঁজ জামালপুরের সরিষাবাড়ী পৌরসভার মেয়র রুকনুজ্জামান রোকনকে পরে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। তাঁর অপহরণের ব্যাপারেও কিছু জানা যায়নি। ৭ নভেম্বর খিলগাঁও থেকে নিখোঁজ ফার্মাসিস্ট জামাল হোসেন, ৫ নভেম্বর উত্তর শাজাহানপুর থেকে নিখোঁজ ফল ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন পরে ফিরলেও ৯ ঘটনা রহস্যাবৃত রয়ে গেছে।

জঙ্গি অভিযানে সাফল্য : ২০১৬ সালের ধারাবাহিকতায় বিদায়ী বছরেও জঙ্গিবিরোধী অভিযান ছিল আলোচিত। ১৬ মার্চ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে জেএমবির আস্তানা ‘ছায়ানীড়ে’ ‘অপারেশন অ্যাসল্ট ১৬’ অভিযানে এক নারীসহ চার জঙ্গি নিহত হয়। ১৭ মার্চ রাজধানীর আশকোনায় র্যাবের নির্মাণাধীন কার্যালয়ে আত্মঘাতী বিস্ফোরণে এক তরুণ নিহত হয়। পরদিন ১৮ মার্চ রাজধানীর খিলগাঁও নন্দিপাড়ায় র্যাবের চেকপোস্টে গুলিতে এক জঙ্গি নিহত হয়। ২৪ মার্চ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনে চেকপোস্টে আত্মঘাতী বিস্ফোরণে এক যুবক নিহত হয়। এই দিনই সিলেটের শিববাড়ীতে ‘আতিয়া মহলে’ জঙ্গি আস্তানা ঘিরে ফেলে পুলিশ। সেখানে  সেনাবাহিনীর ‘অপারেশন টোয়াইলাইট’ শেষে ২৮ মার্চ চারজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। ২৬ মার্চ ওই অভিযানের সময় বাইরে বোমার বিস্ফোরণে র্যাবের গোয়েন্দা শাখার প্রধান লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদসহ ছয়জন নিহত হন। গত ৩০ মার্চ মৌলভীবাজারের নাসিরপুরে ‘অপারেশন হিটব্যাক’-এ আত্মঘাতী বিস্ফোরণে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটের লোকমান আলী, তার স্ত্রী ও পাঁচ সন্তান নিহত হয়। গত ১ এপ্রিল মৌলভীবাজারের বড়হাটে ‘অপারেশন ম্যাক্সিমাসে’ আত্মঘাতী হয় দুই পুরুষ ও এক নারী। গত ২২ এপ্রিল ঝিনাইদহের পোড়াহাটী গ্রামে ধর্মান্তরিত জঙ্গি আবদুল্লাহর বাড়ি থেকে অস্ত্র-বিস্ফোরক উদ্ধারের পর ২৬ এপ্রিল চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের ‘অপারেশন ইগল হান্টে’ চারজন নিহত হয়। ৭ মে ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার বজরাপুর ইউনিয়নের হঠাত্পাড়ায় সিটিটিসি ইউনিটের অভিযানে আবদুল্লাহ ও তুহিন নামের দুই জঙ্গি নিহত হয়। ১০ মে রাতে রাজশাহীর গোদাগাড়ীর সীমান্তের কাছে পুলিশের ‘অপারেশন সান ডেভিল’ অভিযানে পাঁচ জঙ্গি এবং একজন ফায়ার সার্ভিস কর্মী নিহত হয়। ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসের দিনে রাজধানীর পান্থপথে হোলিও ইন্টারন্যাশনাল হোটেলে সিটিটিসি ইউনিটের অভিযানে সাইফুল নামে এক জঙ্গি নিহত হয়। গত ৪ সেপ্টেম্বর থেকে পাঁচ দিন দারুস সালামের বর্ধনবাড়ীর ২/৩-বি নম্বর কমলপ্রভা বাড়িতে অভিযানে জঙ্গি আবদুল্লাহ, তার দুই স্ত্রী নাসরিন ও ফাতেমা, দুই ছেলে ওসামা ও ওমর এবং দুই কর্মচারী নিহত হয়। সর্বশেষ ২৭ নভেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্তবর্তী আলাতলী এলাকায় র্যাবের অভিযানে নিহত হয় তিনজন। এ ছাড়া রাজশাহীর তানোরে ‘অপারেশন রি-বার্থ’, কুমিল্লায় ‘অপারেশন স্ট্রাইক আউট’, ঝিনাইদহে ‘অপারেশন শাটল স্পিল্গট’ ও ‘অপারেশন সাউথ প’ অন্যতম। এসব অভিযানে কেউ নিহত না হলেও বেশ কয়েকজন জঙ্গি ধরা পড়ে। ৫ জানুয়ারি মোহাম্মদপুরে বন্দুকযুদ্ধে নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতা মারজান সহযোগীসহ এবং ১৬ মার্চ কসবায় তাজুল ইসলাম আল মাহমুদ ওরফে মামা হুজুর নিহত হয়।
 



মন্তব্য