kalerkantho


প্রশ্নপত্র ফাঁস কেলেঙ্কারি ছিল পাঠ্য বই বিতর্কও

৩১ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



শিক্ষা খাতে পাঠ্য বই কেলেঙ্কারি দিয়েই ২০১৭ সালের সূচনা হয়। বছরের প্রথম দিনে শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেওয়া হলেও তাতে মারাত্মক সব ভুল আর সাম্প্রদায়িকীকরণের চরম অভিযোগ ওঠে। তবে সেই রেশ কাটতে না কাটতেই শিক্ষায় সর্বাধিক সমালোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায় প্রশ্নপত্র ফাঁস, যা বছরজুড়ে বিভিন্ন পরীক্ষায়ই বিদ্যমান ছিল। এ বিষয়ে গণমাধ্যম সমালোচনামুখর থাকলেও প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে সরকার কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। এমনকি গণমাধ্যম প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রমাণসহ প্রতিবেদন প্রকাশ করলেও সরকার তা আমলে নেয়নি। ফলে নিরুপায় বোধ করে শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা।

২০১৭ সালের পাঠ্য বইয়ে ভুলের পাশাপাশি সব শ্রেণির বইতে বড় ধরনের অদল-বদলও রয়েছে। কুসুমকুমারী দাসের বিখ্যাত ‘আদর্শ ছেলে’ কবিতাটির লাইনে লাইনে ভুল করা হয়েছে। আম খাওয়ার জন্য ছাগলকে গাছে উঠানো হয়েছে। এসব মারাত্মক ভুলের পাশাপাশি হেফাজতে ইসলামসহ বিভিন্ন ইসলামী দলের সাজেশন অনুসারেই বইতে বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এমনকি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, হুমায়ুন আজাদের মতো বিখ্যাত লেখকদের লেখা অদল-বদল করা হয়েছে। ফলে পাঠ্য বইয়ে সাম্প্রদায়িকতা বড় আকার ধারণ করেছে। হিন্দুত্ববাদী ও নাস্তিকতাবাদীর অভিযোগ তুলে ২৯টি গল্প-কবিতা পরিবর্তন করা হয়েছে। কিন্তু দেশের বিভিন্ন মহল থেকে এই সাম্প্রদায়িকতার ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হলেও নিশ্চুপ ছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড-এনসিটিবি। শুধু নামকাওয়াস্তে এনসিটিবির দু-একজন কর্মকর্তাকে বদলি করে দায় সারা হয়েছে।

পুরো জানুয়ারি মাস পাঠ্য বইয়ের কেলেঙ্কারি নিয়ে আলোচনার পর ফেব্রুয়ারি মাসে এসএসসি পরীক্ষা শুরু হলে শিক্ষা খাতে নতুন বিতর্কের জন্ম দেয় প্রশ্নপত্র ফাঁস। ২০১৭ সালের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায়ও প্রায় প্রতিটি বিষয়েই ছিল প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ। আর নভেম্বরে শেষ হওয়া জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট ও প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায়ও এই অভিযোগ ছিল ভয়াবহ। আর ডিসেম্বর মাসে বিভিন্ন জেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসে নতুন মাত্রা যোগ হয়। এমনকি এই প্রশ্ন ফাঁসের হাত থেকে প্রথম, দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীরাও রেহাই পায়নি। বরগুনা সদরের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির গণিতের প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ায় ২২৫টি স্কুলের পরীক্ষা বাতিল করা হয়। একই জেলার বেতাগী উপজেলায়ও প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে ১৪০টি স্কুলের পরীক্ষা বাতিল করা হয়। এরপর নাটোরের সদর উপজেলায় প্রথম ও চতুর্থ শ্রেণির প্রশ্ন ফাঁস হলে ১০৬টি স্কুলের পরীক্ষা বাতিল করা হয়। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রথম দিকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায় না নিলেও বছরের শেষে শিক্ষামন্ত্রীর সুর কিছুটা পাল্টে যায়। তিনি প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য সরাসরি শিক্ষকদের দায়ী করেন। ডিসেম্বর মাসে এক অনুষ্ঠান শেষে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সাংবাদিকদের বলে, ‘প্রশ্ন ফাঁস যুগ যুগ ধরে হচ্ছে। আগে এত বেশি প্রচারণা হতো না, এখন গণমাধ্যম বেড়ে যাওয়ায় তা সর্বস্তরে প্রচার হয়ে যাচ্ছে। তবে এই ফাঁসের মূল হোতা আমাদের শিক্ষকরা। সরকারকে বিপদে ফেলতে পাবলিক পরীক্ষার দিন সকালে শিক্ষকরা প্রশ্ন পেয়েই ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তা ফাঁস করে দিচ্ছেন। আগে বিজি প্রেস ছিল প্রশ্ন ফাঁসের আখড়া। আমরা নানাভাবে সেখানে প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ করেছি। বর্তমানে আমাদের শিক্ষার চালক শিক্ষকরাই প্রশ্ন ফাঁস করছেন।’

বছরের শেষ দিকে শিক্ষামন্ত্রীর অসহায়ত্ব শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের অনেকটাই ভাবিয়ে তোলে। প্রশ্ন ওঠে, খোদ শিক্ষা প্রশাসনের প্রধান কর্তাব্যক্তিই যদি সমাধান করতে না পারেন, তাহলে এই প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ করবে কে? এ ছাড়া দুদক বছরের শেষ দিকে কয়েক শ কোচিংবাজ শিক্ষকের তালিকা প্রকাশ করে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই কোচিংবাজ শিক্ষকের বেশির ভাগই প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িত। শিক্ষার্থীদের বেশি নম্বর পাইয়ে দিতে পরীক্ষার দিন সকালে মোবাইল ফোনে প্রশ্ন তুলে তাঁরা তা বাইরে পাঠাচ্ছেন। তবে শিক্ষাবিদরা শিক্ষার্থীদের মাথা থেকে পরীক্ষার ভার কমাতে বলেছেন। এ ছাড়া প্রশ্ন ফাঁস বন্ধে সরকারের সদিচ্ছার পাশাপাশি ফাঁসকারীদের কঠোর শাস্তির কথাও বলেছেন তাঁরা।
 


মন্তব্য