kalerkantho


বছরজুড়ে আলোচনায় সিইসি

৩১ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



বছরজুড়ে আলোচনায় সিইসি

বছরের শুরু থেকে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও কমিশনাররা ছিলেন আলোচনায়। কমিশন গঠিত হওয়ার পরই প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা আলোচনায় আসেন। তিনি ১২তম প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি চার কমিশনারসহ পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগ পান। এর আগে এ পদে আরো ১১ জন দায়িত্ব পালন করেছেন। সব কিছু ঠিক থাকলে তাঁর নেতৃত্বাধীন কমিশনের অধীনেই আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে কে এম নুরুল হুদার নাম প্রকাশ হওয়ার পরই আলোচনায় চলে আসেন তিনি। কারণ চাকরি জীবনে ২০০২ সালে বিএনপি জোট সরকারের সময় তাঁকে বাধ্যতামূলকভাবে অবসরে যেতে হয়েছিল। সে কারণে অনেকেই বিষয়টি আলোচনায় আনেন। তবে দায়িত্ব নেওয়ার পর সিইসি নিজে ঘোষণা দেন, দায়িত্ব পালনকালে কেউ ব্যক্তি আক্রোশের শিকার হবেন না। নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করবেন। এখন পর্যন্ত নিজের সেই বক্তব্যের সফল বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন তিনি। বর্তমান কমিশনের অধীনে কুমিল্ল, নারায়ণগঞ্জ ও রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনসহ যে কয়টি নির্বাচন হয়েছে, তাতে কমিশন সমালোচনা এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।

গত ৩১ জুলাই সুধীসমাজের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সংলাপ শুরু করে কমিশন। গণমাধ্যম, রাজনৈতিক দল, নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থা, নারী নেত্রীদের প্রতিনিধি ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে এ সংলাপ চলে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত।

ইসির এ সফল যাত্রায় ১৫ অক্টোবর বিএনপির সঙ্গে সংলাপে দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠাতা বলায় আরেকবার আলোচনায় আসেন সিইসি। সেদিন সংলাপে জিয়াউর রহমানের প্রশংসা করে নূরুল হুদা বলেন, ‘বহুমত, রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়ে জিয়াউর রহমান বিএনপি গঠন করেন। পরবর্তী সময় বিএনপি সরকার গঠন করে। জিয়াউর রহমান ছয় বছর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। তার মধ্য দিয়ে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়।’ পরের দিন রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে বিশ্ব খাদ্য দিবসের এক সেমিনারে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে এটি সিইসির একটি কৌশল হতে পারে। বিএনপির এখন খুশি খুশি ভাব। এটা যেন নির্বাচন পর্যন্ত বজায় থাকে।’

এ ছাড়া ১৬ অক্টোবর সংলাপে অংশ নিয়ে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠাতা বলায় সিইসি কে এম নুরুল হুদার পদত্যাগ দাবি করেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী।

সেদিন সংলাপে আড়াই ঘণ্টার মতো বৈঠক করে বের হয়ে তিনি জানান, তাঁরা সংলাপ বর্জন করেছেন।

কিন্তু ১৭ অক্টোবর এক বিবৃতিতে যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক বলেন, ‘আমাদের প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে এক রকম ভূতে পেয়েছিল। এ জন্য তিনি ষোড়শ সংশোধনীর রায়ে বলেছিলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কারো একক নেতৃত্বে হয়নি। এবার ভূতে পেয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদাকে। এ জন্য তিনি জিয়াকে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠাতা বলেছেন।’ ‘বিএনপির মুখপাত্রের মতো’ কথা বলে সিইসি তাঁর নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

অবশ্য ২৬ অক্টোবর সংলাপ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা বলেন, ‘বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠাতা এটা এখনো ওন করি।’ তিনি দাবি করেন, ‘১৯৭৫ থেকে ৭৭ পর্যন্ত দেশে গণতন্ত্র ছিল না। এর আগে ছিল। পরে জিয়াউর রহমান তা প্রতিষ্ঠা নয় পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কোনো দলকে খুশি করার জন্য নয়। এটা তথ্যভিত্তিক কথা।’

সর্বশেষ ২১ ডিসেম্বর রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়েও চ্যালেঞ্জের মুখে ছিলেন সিইসিসহ বর্তমান কমিশন। এখানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বর্তমান মেয়র প্রার্থী হন। নির্বাচনে আসে বিএনপিও এবং কাওছার জামান বাবলাকে প্রার্থী করে। এদিকে জাতীয় পার্টির দুর্গ বলে কথিত রংপুরে দল থেকে মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফাকে প্রার্থী করা হয়। ভোটের আগে ব্যক্তিগত সফরে রংপুর গিয়ে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ কমিশনের প্রতিও এক ধরনের সতর্ক বার্তা দেন। তিনি বলেন, ‘এই নির্বাচন কমিশনের এসিড টেস্ট। আশা করি, তারা জাতীয় নির্বাচনের আগের এই নির্বাচন করে জনগণের আস্থার জবাব দিতে পারবেন। কারণ, এখানে লাঙলের পক্ষে গণজোয়ার এসেছে।’

প্রধান তিনটি দল নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় নির্বাচন কমিশনও বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করে। ১৯৩টি কেন্দ্রের মধ্যে ১২৮টিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত সব কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে মোট ১৯৩টি কেন্দ্রে লাঙল প্রতীকে এক লাখ ৬০ হাজার ৪৮৯ ভোট পেয়ে ভূমিধস বিজয় পান জাপার মোস্তফা। আওয়ামী লীগের প্রার্থী সদ্য সাবেক মেয়র শরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু পান ৬২ হাজার ৪০০ ভোট। তিনি অবশ্য নিজ কেন্দ্রেই জাপা প্রার্থীর কাছে পরাজিত হয়েছেন। আর বিএনপির প্রার্থী কাওছার জামান বাবলা পান মাত্র ৩৫ হাজার ১৩৬ ভোট। নির্বাচন মানেই সংঘাতের চিরাচরিত প্রথা থেকে বেরিয়ে আসতে পারার সফলতা বর্তমান কমিশনকে দিতে কার্পণ্য করছেন না বোদ্ধারা।

গত ১৫ ফেব্রুয়ারি কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের পর সবচেয়ে বড় নির্বাচন কুমিল্লা সিটি। নিরপেক্ষতা প্রমাণের এ নির্বাচনে ইতিমধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ আরো তিনজন নির্বাচন কমিশনার কুমিল্লায় গিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচনের কঠোর বার্তা দিয়ে আসেন। বিএনপির অভিযোগ ছিল, ক্ষমতাসীনরা আচরণবিধি লঙ্ঘন করছে, স্থানীয় প্রশাসন নির্লিপ্ত ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হয় এবং বিএনপি প্রার্থী মেয়র পদে জয়লাভ করেন।


মন্তব্য