kalerkantho


প্রবাসী আয়ে ধস, পাচারও অব্যাহত

৩১ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



বাংলাদেশের অর্থনীতি বড় হচ্ছে, অতি দরিদ্র মানুষের হার যেমন কমছে, তেমনি বাংলাদেশ থেকে বিদেশে অর্থ পাচারের হারও বেড়েছে। এ বছরের ২ মে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যানশিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) তাদের প্রতিবেদনে জানায় যে বাংলাদেশ থেকে ২০১৪ সালে ৭৩ হাজার কোটি টাকা দেশের বাইরে পাচার হয়ে গেছে। টাকার মূল্যে এটিই এক বছরে সব থেকে বড় অঙ্কের পাচার বলে মনে করা হচ্ছে। আমদানি-রপ্তানির সময় পণ্যের প্রকৃত মূল্য গোপন করার মাধ্যমেই এই অর্থের বড় অংশ পাচার করা হয়েছে।

২০১৪ সালের পরিমাণ অর্থ বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে পাচার হয়ে গেছে, তা চলতি অর্থবছরের মূল্য সংযোজন কর (মূসক) খাতে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার সমান। চলতি বাজেটে মূসক থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য হচ্ছে ৭২ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা।

এ বছর সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলো তাদের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ থেকে গত বছর সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে পাঁচ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশিদের নামে যে পরিমাণ অর্থ দেখানো হচ্ছে, তার পুরোটাই পাচার নয়। দেশটিতে অনেক বাংলাদেশি বৈধভাবে আয় করছেন। তাঁরাও তাঁদের টাকা সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকেই রাখছেন। প্রতিবেদনটি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বাংলাদেশে যখন রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়ে, তখন দেশ থেকে অর্থপাচারও বেড়ে যায়। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রথম বছর, গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৩ সালে বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচার অনেক বেড়ে গেছে।

সুইস ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে সুইস ব্যাংকে পাচার হয়েছে চার হাজার ২৫১ কোটি টাকা। আগের বছর এর পরিমাণ ছিল তিন হাজার ১২৩ কোটি টাকা। এ ছাড়া ২০১২ সালে এক হাজার ৯২২ কোটি, ২০১১ সালে এক হাজার ২৭৯ কোটি, ২০১০ সালে এক হাজার ৯৭৯ কোটি, ২০০৯ সালে এক হাজার ২৫২ কোটি, ২০০৮ সালে ৮৯৮ কোটি ও ২০০৭ সালে দুই হাজার ৪১ কোটি টাকা পাচার হয়েছে।

এ ছাড়া বছরের শেষ দিকে এসে প্যারাডাইজ পেপারস কেলেঙ্কারিতেও বাংলাদেশের অনেকের নাম উঠে এসেছে।

এদিকে এ বছর আন্দোলন-সংগ্রামে দেশ অস্থিতিশীল না হলেও আর্থিক খাতের অবস্থা ভালো ছিল না। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে অর্থনীতির প্রধান চারটি সূচকে অবনতি হয়েছে। অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি প্রবাসী আয়ে ধস নেমেছে। আগের বছরের সঙ্গে তুলনা করলে আয় কমেছে ১৫ শতাংশ। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত এক কোটি প্রবাসী বাংলাদেশি বিগত অর্থবছরে যে পরিমাণ টাকা দেশে পাঠিয়েছে, তা গত পাঁচ অর্থবছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। রপ্তানি আয়েও গতি ছিল না। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রপ্তানি আয় কম হয়েছে ৬ শতাংশের মতো। গত আট বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে। উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে যে পরিমাণ ঋণ সহযোগিতা পাওয়ার আশা করেছিল অর্থ মন্ত্রণালয়, তাতেও বড় ধরনের ধস নেমেছে এ অর্থবছরে। অর্থ মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য বলছে, বিগত অর্থবছরে রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল তিন হাজার ৭০০ কোটি ডলার। কিন্তু রপ্তানি আয় হয়েছে তিন হাজার ৪৮৩ কোটি ডলার। আয় কম হয়েছে ২১৭ কোটি ডলার। এর মধ্যে পোশাক খাতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে  মাত্র ০.২০ শতাংশ। তৈরি পোশাক খাতে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন বলে গত রবিবার ইপিবি থেকে জানানো হয়।

বিগত অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি বাস্তবায়িত হয়েছে ৮৯ শতাংশ, যা গত আট বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে সর্বশেষ ২০০৯-১০ অর্থবছরে ৯০ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়িত হয়েছিল। এ অর্থবছরে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো ব্যয় করেছে মোট এক লাখ ছয় হাজার ৮২০ কোটি টাকা। অথচ এর আগের অর্থবছরে ব্যয় হয়েছিল ৮৭ হাজার ৬৭ কোটি টাকা। সে তুলনায় ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ২৩ শতাংশ বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত অর্থবছরে প্রবাসীরা এক হাজার ২৭৭ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছে দেশে, যা বিগত পাঁচ অর্থবছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছিল এক হাজার ৪৯৩ কোটি ডলার। এতে দেখা গেছে, বিগত অর্থবছরে এর আগের অর্থবছরের তুলনায় রেমিট্যান্স কমেছে ২১৬ কোটি ডলার বা ১৪.৪৭ শতাংশ।

বিগত অর্থবছরে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা থেকে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৭৭ কোটি ডলার কম পেয়েছে বাংলাদেশ। ৪১৭ কোটি ডলার ছাড় হওয়ার কথা ছিল। ছাড় হয়েছে ৩৪০ কোটি ডলার। এর আগে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থ ছাড় হয়েছিল ৩৫৬ কোটি ডলার।
 



মন্তব্য