kalerkantho


এপারে মানবতা ওপারে নৃশংসতা

৩১ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



এপারে মানবতা ওপারে নৃশংসতা

বাংলাদেশ আয়তনে ছোট একটি দেশ। নানা প্রতিকুলতার সঙ্গে লড়াই করে দেশটি সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে মিয়ানমারের জান্তা সরকার কর্তৃক দেশটির রোহিঙ্গা, কাচিনসহ ক্ষুদ্র জাতিসত্তা নিধনে বেপরোয়া হত্যাযজ্ঞ চালানোর কারণে বাংলাদেশে এ বছরেই মিয়ানমার থেকে অনুপ্রবেশ করেছে ছয় লাখের বেশি রোহিঙ্গা। আগে থেকেই চার লাখের মতো মিয়ানমারের নাগরিক এ দেশে বাস করছে। ফলে সব মিলিয়ে হুট করে আসা এই ব্যাপক সংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়া ছিল বিশাল চ্যালেঞ্জ।

বিদায়ী বছরের ২৫ আগস্ট রাখাইন রাজ্যে নতুন করে নিধনযজ্ঞ ও বিতাড়ন শুরুর পর থেকে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশমুখী ঢলের পর সাড়ে ছয় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বিভিন্ন সময় মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা ছিল প্রায় চার লাখ। সব মিলিয়ে বর্তমানে মিয়ানমারের সাড়ে ১০ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে বাস করছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করতে হত্যা, গুম, খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগসহ মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটন করছে মিয়ানমার সামরিক বাহিনী। এ ঘটনায় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল মানবতার পক্ষে। নিপীড়িত এই জনগোষ্ঠীকে ঠাঁই দিয়ে সে কারণে বিশ্ববাসীর প্রশংসা কুড়িয়েছে বাংলাদেশ। সারা বছরই বাংলাদেশে প্রধান আলোচনার একটি ছিল রোহিঙ্গা ইস্যু।

রোহিঙ্গা শিবিরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি : কালের কণ্ঠ
এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র, ওআইসি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন মিয়ানমারকে কড়া সতর্কবার্তা দিলেও চীন ও রাশিয়ার কারণে বড় ধরনের কোনো অবরোধ আনা যায়নি দেশটির ওপর। এর পরও গত কয়েক দশকের মধ্যে এবারই প্রথম মিয়ানমার রোহিঙ্গা হত্যাকাণ্ডের পর শক্ত প্রতিরোধের মুখে পড়েছে।

সত্তরের দশকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকেই রাখাইন রাজ্যে অস্থিরতা, নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের ফলে বাংলাদেশে রোহিঙ্গার ঢল নেমেছে। মিয়ানমার এর আগে দুই দফায় বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের নিজেদের নাগরিক বলে স্বীকার করে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। ২০০৫ সাল থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। বাংলাদেশে প্রায় ৩৩ হাজার রোহিঙ্গা ‘শরণার্থী’ মর্যাদা নিয়ে অবস্থান করছিল। এর বাইরে ছিল আরো প্রায় তিন থেকে পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা। সে সময় রাখাইন রাজ্যে ছিল ১১ থেকে ১৩ লাখ রোহিঙ্গা। গত বছরের অক্টোবরে রাখাইনে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান শুরুর পর থেকে এ বছরের ২৪ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে। গত ২৫ আগস্ট রাখাইন রাজ্যে নতুন করে অভিযান শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ছয় লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশে এখন রোহিঙ্গার সংখ্যা সাড়ে ১০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে বলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ধারণা করছেন। অন্যদিকে মিয়ানমারে রোহিঙ্গার সংখ্যা কমে চার বা ছয় লাখে নেমে থাকতে পারে। তা ছাড়া নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র দাবি করে আসছে।

রোহিঙ্গা শিবিরে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।  ছবি : কালের কণ্ঠ
নিরাপত্তা অভিযান বন্ধ হয়েছে বলে মিয়ানমার জাতিসংঘকে জানালেও রোহিঙ্গারা এখনো দেশ ছাড়ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কূটনীতিক কালের কণ্ঠকে বলেন, মিয়ানমার অতীতেও রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বলেছিল, এবারও বলছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কতটা ফল আসবে, তা বলা কঠিন।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে এ বছর বহু আলোচিত ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশ সফর করেছেন। সরেজমিনে দেখে গেছেন রোহিঙ্গাদের দুঃখ-দুর্দশার চিত্র। এর মধ্যে রয়েছেন তুরস্কের ফার্স্টলেডি, মালয়েশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী, জর্দানের রানি, আন্তর্জাতিক রেডক্রস ও রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির মহাসচিব এল হাদজি আমাদু গুয়ে সি, ইইউর মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাবিষয়ক কমিশনারসহ অনেকে।



মন্তব্য