kalerkantho


৮ বি ভা গে বৈ শা খ

আট বিভাগে বৈশাখী উত্সব

৬ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



আট বিভাগে বৈশাখী উত্সব

বাংলা নববর্ষ এখন বাঙালির জীবনে সর্ববৃহত্ সামাজিক উত্সবে পরিণত হয়েছে। ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ মিলিত হয় বর্ষবরণের এই আনন্দে।

 

ঢাকা

বাবুল হৃদয়

রমনার বটমূলে ছায়ানটের ঐতিহ্যবাহী প্রভাতি সংগীতানুষ্ঠানের ভেতর দিয়ে সূচনা হবে উত্সবের সবচেয়ে বড় আনুষ্ঠানিকতার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে বের হবে বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা। উত্সবের মূল কেন্দ্র রমনা-সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে ধানমণ্ডির রবীন্দ্রসরোবর, পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্ক হয়ে সারা শহরই হয়ে উঠবে উত্সবমুখর। এ ছাড়া ঢাকা ও ঢাকার আশপাশে সবুজবাগ, বাসাবো বালুর মাঠ, যাত্রাবাড়ী দনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ মাঠ, রামপুরার আফতাবনগর খেলার মাঠ, উত্তরা ফ্রেন্ডস ক্লাব, উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টর খেলার মাঠ, টঙ্গী সরকারি কলেজ মাঠ, মুন্সীগঞ্জ পুলিশ লাইনস সংলগ্ন সৈকত, নারায়ণগঞ্জ সোনারগাঁ জাদুঘর ও চাষাঢ়া জিয়া হল মাঠে বসবে বর্ণাঢ্য বৈশাখী মেলা। এসব মেলায় পাওয়া যাবে হাতের তৈরি কুটির শিল্পের নানা জিনিস যেমন চেয়ার, টেবিল, চৌপায়া, ব্যালন, পিঁড়ি, রেহেল, লাঠি, ইঁদুর ধরার ফাঁদ, কুলা, নারিকেল কোরানি, পুতুল, গাঁইল, চেগাইট, খড়ম, বাঁশের বাঁশি, পাউডি, ডাল ঘুটনি, ঘুড়ির নাটাই, মাটির তৈরি রকমারি জিনিস, খেলনা, মুড়ি, মণ্ডা, মিঠাই, জিলাপি, বাতাসা, তিলের খাজা ইত্যাদি। এ ছাড়া নানা রকম তাঁতের শাড়ির পাশাপাশি মিলবে চিতই, পাক্কান, তিরো, তালের ভাপা, পাটিসাপটা, পোয়া পিঠা ইত্যাদি। পাওয়া যাবে শিশুদের খেলনা ও কসমেটিকস। রাজধানীর বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের মেলা খানিকটা ভিন্ন ধাঁচের। মাটি ও কাঠের তৈজসপত্র এবং কুটির শিল্পের নানা বাহারি পণ্য পাওয়া যাবে এই মেলায়। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) ও বাংলা একাডেমির সহযোগিতায় আয়োজন করা হয় ১০ দিনের এই মেলা। মেলা প্রাঙ্গণে চারদিকে ছোট-বড় শতাধিক স্টল বসে। প্রতিটি স্টলে থরে থরে সাজানো হয় দেশজ পণ্যের সম্ভার। এর মধ্যে মাটির তৈরি বিভিন্ন পণ্য, তালপাতার হরেক রকম পাখা, বাঁশের তৈরি বিভিন্ন পণ্য, হাতে তৈরি বাঁশ ও বেতের পণ্য, মৃিশল্প, শখের হাঁড়ি, পটচিত্র, শোলার পণ্য, পিতলের পণ্য, পাটপণ্য, নকশিকাঁথা, মুখোশ, চাদর, কুশন, শতরঞ্জি, মাটির গয়না, রকমারি চুড়ি, ফিতা, তাঁত ও জামদানি শাড়ি, থ্রিপিস, পুঁতির মালা পাওয়া যাবে এই মেলায়। এ ছাড়া থাকে পুতুলনাচ, বানরনাচ, বায়োস্কোপ ও লোকসংগীতের জমজমাট আসর। এই মেলায় পাওয়া যাবে কাঠের তৈরি নানা বাদ্যযন্ত্র ও অন্দরসাজের নানা উপকরণ। বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে একতারা, দোতারা, খঞ্জনি ও ঢোল। অন্দরসাজের উপকরণের মধ্যে রয়েছে সিরামিকসের শোপিস, কার্পেট, পাপোশ, শিকা, কাগজের ফুল ও পুতুল, শোলার তৈরি পাখি, মাটির ঘড়া, সরাচিত্র, ঝাঁপি, টেপা পুতুল, তামা-পিতলের তৈজসসহ নানা পণ্য। এবার অবশ্য নিরাপত্তার জন্য বিকেল ৫টার মধ্যে উন্মুক্ত স্থানে অনুষ্ঠান শেষ করতে হবে। তবে উত্সবের রেশ থেকে যাবে তার পরেও।

 

চট্টগ্রাম

মুস্তফা নঈম

পহেলা বৈশাখের মেলা গ্রামবাংলার লোকায়ত সংস্কৃতি উত্সব। এই উত্সব গ্রামবাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্যের অংশ। এই একটা দিনে সব বাঙালি যেন এক হয়ে যায়। একই মঞ্চে ধ্বনিত হয় ভালো থাকার সংগীত। বৈশাখ মাসের শুরু থেকে সারা দেশের মতো বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা বা অঞ্চলে নানা নামে মেলা বসে। চট্টগ্রামে মেলা ও উত্সবের আলাদা ঐতিহ্য রয়েছে। সনাতন ও বৌদ্ধ পূজা-পার্বণ এবং পীর-ফকিরের মাজার ঘিরেও বহু মেলা বা উত্সব হয়ে আসছে। একসময় এসব মেলা ও উত্সব ঘিরে জারি-সারি-পালা-বাউল গানের আসর বসত। তবে কালের বিবর্তনে সেই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এখন আর চোখে পড়ে না। পহেলা বৈশাখের আগে চৈত্র মাসের শেষ দিন থেকে চৈত্রসংক্রান্তির একটি উত্সব যুক্ত হয়ে আছে বৈশাখ উত্সবের সঙ্গে। চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় চৈত্রসংক্রান্তির মেলা হয়। এসবের মধ্যে সীতাকুণ্ডের চৈত্রসংক্রান্তি, কলমপতি মেলা (কলমপতি, রাউজান, স্নান, ২৭ ও ২৮ চৈত্র), কাট্টলী সমুদ্র উপকূলে চৈত্রের শেষ দুই দিন কাট্টলী মেলা অনুষ্ঠিত হয়।

বৃহত্তর চট্টগ্রামের পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়িসহ পুরো পার্বত্য এলাকায় বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলো ঐতিহ্যবাহী বাংলা বর্ষ বিদায় ও বর্ষবরণ উত্সবকে কেন্দ্র করে নানা আয়োজন করে। পাহাড়ি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলো নিজস্ব সাংস্কৃতিক ধারায় নিজস্ব আঙ্গিকে পাহাড়ের ঐতিহ্যে এই বৈসাবি উত্সবের আয়োজন করে। চৈত্রসংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখে তারা নিজেদের সংস্কৃতি অনুসারে বিজু সাংগ্রাই, বিষু বিহু ও সাংক্রোন উদ্যাপন করে। পাহাড়ের এই বর্ণিল উত্সব চলে তিন থেকে পাঁচ দিনব্যাপী। এ সময় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে বৈসাবি পালনে প্রস্তুতি ও কেনাকাটার মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয় উত্সবের আমেজ। কাপ্তাই হ্রদে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে শুরু হবে ঐতিহ্যবাহী বিজু, সাংগ্রাই, বিহু ও বৈসুক কিংবা বৈসাবি। কক্সবাজারে বসবাসকারী রাখাইন সম্প্রদায়ও তাদের নিজস্ব আঙ্গিকে বৈশাখী উত্সব পালন করে। একসময় চট্টগ্রামে বৈশাখ উদ্যাপনে গ্রামে গ্রামে বলিখেলা মেলার আয়োজন হতো। সেসব বলিখেলা ও মেলার অনেক আয়োজনই এখন আর হয় না। তার পরও এখনো কিছু গ্রামীণ মেলা টিকে আছে। এর মধ্যে পাহাড়তলী, রাঙ্গুনিয়ায় পহেলা বৈশাখ থেকে তিন দিনব্যাপী মহামনি মেলা, সীতাকুণ্ডে পাঁচ দিনের বৈশাখী মেলা এবং রাউজানের তিন দিনের মেলা উল্লেখযোগ্য।

চট্টগ্রাম শহরে জব্বারের বলিখেলাকে কেন্দ্র করে আয়োজিত মেলা চট্টগ্রামের ঐতিহ্যের অংশ। বৈশাখ মাসের ১২ তারিখ থেকে তিন দিন এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়। কাগজপত্রে তিন দিন বলা হলেও অঘোষিতভাবে মেলা চলে সাত থেকে আট দিন। এই মেলা ঘিরে শুধু চট্টগ্রাম নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কুটির শিল্পকেন্দ্রিক ব্যবসায়ীরা অপেক্ষায় থাকে। দেশের দূরবর্তী বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীরা নানা রকমের গৃহস্থালি পণ্য নিয়ে মেলায় আসে। কৃষিকাজে ব্যবহূত সরঞ্জাম, গৃহসজ্জার আসবাব, দা, ছুরি, কোদাল, গাছের চারা—এমন হাজারো পণ্য পাওয়া যায় এই মেলায়। বন্দরনগর চট্টগ্রামে পহেলা বৈশাখের উত্সবের মূল কেন্দ্র ডিসি হিল। সম্মিলিতভাবে পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন নামের একটি কমিটির উদ্যোগে বৈশাখ বরণের অনুষ্ঠান আয়োজন হয় চট্টগ্রাম নগরের ইস্পাহানি পাহাড়ের পাদদেশে। এ ছাড়া বৈশাখী উত্সবের বেশ বড় আসর বসে বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সদর দপ্তর সিআরবির শিরীষতলায়। পাহাড়ি ঢালে বিশাল এলাকাজুড়ে শতবর্ষী বেশ কিছু শিরীষগাছের ছায়ায় বর্ষবরণ উত্সবে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে পুরো প্রাঙ্গণ। ডিসি হিল ও শিরীষতলা ছাড়াও শিল্পকলা একাডেমি এবং নগরের মহিলা সমিতি স্কুলে বর্ষবরণ মেলা হয়ে থাকে।

 

 

খুলনা

গৌরাঙ্গ নন্দী

আধুনিক নগরজীবনে ঐতিহ্যবাহী মেলার রূপ বেশ খানিকটা বদলে গেছে। তবে মেলা নিয়ে মানুষের মনে সমান আগ্রহ রয়েছে। খুলনা মহানগরীর শান্তিধাম বা পঞ্চবীথির মোড়ে বসে বর্ষবরণের সবচেয়ে জমজমাট ঐতিহ্যবাহী মেলা। মাটির পুতুল, বিশেষ করে সেনহাটির পালদের তৈরি পুতুল ও তৈজসপত্র এই মেলার মূল আকর্ষণ। তিন দিনের এই মেলায় শিশুদের লোকজ খেলনার পাশাপাশি নাগরদোলা, চরকিসহ বিভিন্ন আয়োজন করা হয়। খুলনা মহানগরীর শান্তিধাম মোড় ছাড়াও ফুলতলার শিকিরহাট, দামোদর খেয়াঘাট, বটিয়াঘাটা, ডুমুরিয়ার রংপুর প্রভৃতি স্থানে মেলার আয়োজন হয়। বহু দিন থেকে চলে আসা এই মেলাগুলোয় নতুন বাণিজ্যিক ভাবনা যুক্ত হওয়ায় এখন বৈশাখী মেলা ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। স্থানীয় কারুশিল্পীদের উত্পাদিত পণ্য এবং কৃষিপণ্যই থাকে গ্রামীণ মেলার মূল বেচাকেনার জিনিস। বাঁশ, বেত, পাট, শোলা, ধাতব, মৃত্, চামড়া, তন্তুজাত হরেক রকমের কারুপণ্য ও বাচ্চাদের খেলনাসামগ্রী মেলাকে বর্ণাঢ্য করে তোলে। এর পাশাপাশি থাকে মুড়ি-মুড়কি, খই-চিঁড়া, পিঠা, নাড়ু, খাজা, গজাসহ মজাদার খাদ্যসামগ্রী। থাকে নাগরদোলা, পুতুলনাচ, যাত্রাপালা, সার্কাসসহ হরেক রকমের আয়োজন। দেশীয় ও লোকজ পণ্যের পাশাপাশি বিভিন্ন খাদ্যশস্য, তাঁতের শাড়ি ও অন্যান্য পোশাক, লুঙ্গিসহ বিভিন্ন ধরনের পোশাকের পসরা বসে। লোহা ও অ্যালুমিনিয়ামের তৈজস, ক্রোকারিজ, বাঁশের তৈরি গৃহস্থালি পণ্যসহ গৃহসজ্জার সব ধরনের পণ্যই পাওয়া যায়।

 

 

বরিশাল 

রফিকুল ইসলাম

দুই দশক ধরে বরিশালে নববর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত সবচেয়ে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান হচ্ছে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। বরিশাল চারুকলা বিদ্যালয়ের উদ্যোগে বিএম স্কুলের তমালতলায় উদীচীর বৈশাখের প্রভাতি অনুষ্ঠান শেষে বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরু হয়ে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে। ৩৪ বছর ধরে বরিশাল উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী আয়োজন করে আসছে বৈশাখী মেলা। প্রতিবছরের মতো এবারও তিন দিনব্যাপী মেলা অনুষ্ঠিত হবে বিএম স্কুল মাঠে।

বঙ্গোপসাগর তীরের গ্রাম রপদন। বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলায় এই গ্রামের মাঠে পহেলা বৈশাখে বসে হাতির মেলা। মেলার প্রধান আকর্ষণ খড়ি আর বাঁশের ওপর কাগজের কারুকাজখচিত বিশাল আকৃতির হাতি। হাতির চারপাশে মেলার পসরা সাজিয়ে বসেন দোকানিরা। মেলার আয়োজক মুক্তিযোদ্ধা ভাস্কর মনি মণ্ডল এবং তাঁর সহযোগীরা এই হাতি তৈরি করেন। শুধু হাতিটি দেখতেই বহু মানুষের জমায়েত হয় বৈশাখী এই হাতির মেলায়।

বানারীপাড়া উপজেলার পৌর এলাকার ডাকবাংলো সড়কে প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে বসে তুলার মেলা। প্রায় ২০০ বছরের পুরনো মেলার প্রধান আকর্ষণ তুলা হলেও এই মেলাকে কেন্দ্র করে খাবার ও বিকিকিনিও চলে।

 

সিলেটে বর্ষবরণ

আহমেদ নূর

সিলেটে বর্ষবরণের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সাংগঠনিকভাবে সিলেটে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বৈশাখি মেলা। সিলেটে বৈশাখী মেলার আয়োজন শুরু হয় বাংলা ১৩৯০ সন (১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দ) থেকে। খেলাঘর ও উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর উদ্যোগে নগরের মীরাবাজারে মডেল হাই স্কুল প্রাঙ্গণে প্রথম বৈশাখী মেলা অনুষ্ঠিত হয়। তখন এটাই ছিল সিলেটের একমাত্র বৈশাখী মেলা। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছাড়াও হরেক রকম পণ্যের স্টল থাকত মেলায়। এই মেলায় দেশীয় ঐতিহ্যবাহী পণ্যের স্টল, কুটির শিল্পের স্টল, কারুপণ্যের প্রদর্শনী, বানরনাচ, সাপের খেলা, চরকিসহ নানা আয়োজন থাকত। প্রায় ১৬ বছর একটানা বৈশাখী মেলা অনুষ্ঠিত হওয়ার পর স্থানাভাবে প্রান্তিক চত্বরের বৈশাখী মেলা বন্ধ হয়ে যায়। তবে বৈশাখী মেলা না হলেও বৈশাখ উদ্যাপনের নানা আয়োজন চলতে থাকে বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে। প্রায় তিন বছর সিলেটে কোনো বৈশাখী মেলা না হওয়ায় বাংলা ১৪১২ (২০০৫ খ্রিস্টাব্দ) সনে সিলেট সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে আবার মেলা আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর পর থেকে প্রতিবছর সিলেটের ঐতিহ্যবাহী কীন ব্রিজের কাছে সুরমা নদীর পারে সপ্তাহব্যাপী বৈশাখী মেলা চলে। বর্ষবরণের এই কর্মসূচির মধ্যে বৈশাখী মেলা ছাড়াও আনন্দ শোভাযাত্রা, শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বাউল গান এবং পিঠা উত্সবও রয়েছে। সিলেটের সংগীত সংগঠন আনন্দলোক ১৪০১ বাংলা সন থেকে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান করে আসছে। এ ছাড়া জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ, বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পী সংস্থা, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, সাংস্কৃতিক সংগঠন সোপান, সম্মিলিত নাট্য পরিষদসহ বিভিন্ন নাট্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন আলাদাভাবে বর্ষবরণ কর্মসূচি পালন করে আসছে। এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে প্রভাতি সংগীত, শোভাযাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বাউল গান। সিলেটে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান বেশ বড় পরিসরে হয় ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজে। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজনও বর্ণাঢ্য। হবিগঞ্জে বড় পরিসরে তিন দিনের বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়ে থাকে। কালের কণ্ঠ’র হবিগঞ্জ প্রতিনিধি শাহ ফখরুজ্জামান জানান, হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলায় জনতার ঢল নামে প্রতিবছর। এই মেলায় সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা জেলা থেকেও মানুষের সমাগম ঘটে। মেলায় কৃষিজ পণ্যসহ প্রয়োজনীয় সব পণ্য থাকে।

কৃষকরা প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে সারা বছর এই মেলার অপেক্ষা করে থাকে। লাঙল, জোয়াল, লাঙলের ফলা, মই, দা, কাঁচি, খাঁচা, লাঠি, বর্শা, মাছ ধরার সরঞ্জামসহ অসংখ্য পণ্যের সমাহার বসে এখানে। কৃষিপণ্য ছাড়াও মাটির তৈরি হাঁড়ি, পাতিল এবং শিশুদের খেলনা মেলায় পাওয়া যায়। মিষ্টি তরমুজ আর বাহারি খাবারও থাকে এই মেলায়।

 

 

ময়মনসিংহ

নিয়ামুল কবীর সজল

শহরের সবচেয়ে বড় বৈশাখী মেলাটি বসে ময়মনসিংহ শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন পার্ক এলাকায়। চার দিনের এই মেলায় লাখো মানুষের ভিড় থাকে। এ ছাড়া নববর্ষে ভূঁইয়া বাড়ির মাঠে (নাসিরাবাদ কলেজ মাঠ) চৈত্রসংক্রান্তির মেলা শুরু হয়ে বৈশাখী মেলা হয়ে শেষ হয়। উল্লেখযোগ্য বৈশাখী মেলা হয় ত্রিশাল উপজেলার নজরুল একাডেমি মাঠে, বর্মা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে, গফরগাঁও পৌর শহরের গরুরহাটা বটতলায়, পাঁচবাগ ইউনিয়নের গলাকাট বাজার ও দত্তের বাজারে, জামালপুর শহরের দয়াময়ী মোড়ে, শেরপুর সদর উপজেলার গাজীর খামার ইউনিয়নের বাকারকান্দা গ্রামে এবং পাকুড়িয়া ইউনিয়নের তাড়াগর গ্রামে। গাঙ্গি খেলা, লাঠিবাড়ি খেলা, ঘোড়দৌড়, সাইকেল রেস, মোরগ লড়াইসহ নানা ধরনের খেলাধুলার আয়োজন করা হয় এ মেলায়। শেরপুর শহীদ দারোগ আলী পৌর পার্কে, নকলা উপজেলার গণপদ্দি হাই স্কুল মাঠে, নেত্রকোনা জেলার মোক্তারপাড়ায় মগড়া নদীর পারে মেলা বসে। এসব মেলার আকর্ষণ ছেলে ও মেয়েদের পৃথক কাবাডি প্রতিযোগিতা, ছেলেদের কুস্তি প্রতিযোগিতা, মোরগ লড়াই, হ্যান্ডবল, ঘুড়ি ওড়ানো প্রতিযোগিতা এবং লোকজ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলা উপজেলার শ্যামগঞ্জ হাফেজ জিয়াউর রহমান ডিগ্রি কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত হয় তিন দিনব্যাপী বৈশাখী মেলা।

 

রাজশাহী

রফিকুল ইসলাম ও রেদওয়ানুল হক বিজয়

ভোরে রাজশাহী জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হয়। শহরের বিভিন্ন কলেজ ও স্কুল মাঠে বসে বৈশাখী মেলা। দুপুরের পরেই পদ্মাপারে শুরু হয় বৈশাখী কনসার্ট। লালন শাহ পার্ক, বড়কুঠি ও চরসহ পুরো পদ্মাপারেই বৈশাখী উত্সব অনুষ্ঠিত হয়। নৃত্য, সংগীত পরিবেশন, আবৃত্তি, গম্ভীরা, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, গ্রামীণ খেলাসহ ইত্যাদি আয়োজনে উত্সবমুখর হয়ে ওঠে রাজশাহী। এ ছাড়া রাজশাহী জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন, বিভাগীয় গ্রন্থাগার, রাজশাহী কলেজসহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন উপলক্ষে শিক্ষার্থী ও সাধারণ পাঠকদের মধ্যে রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কালচারাল ইনস্টিটিউট তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর, শহীদ কামারুজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান, শিশু পার্ক বিনা টিকিটে উন্মুক্ত রাখা হয়। বর্ষবরণের মূল আকর্ষণ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ। বাংলার ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপালা, বাউল গানসহ বৈশাখী মেলা বসে চারুকলায়। রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ও মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করে। এ ছাড়া সকাল-সন্ধ্যা শহীদ মিনার চত্বরে পুতুলনাচ, বাংলা নাচ, কমেডি শো, ফ্যাশন শো ও লোকজ সংগীত পরিবেশিত হয়। সকাল থেকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার, হাসপাতাল, শিশু পরিবার, শিশু সদনে (এতিমখানা) ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবার পরিবেশন করা হয়। কারাবন্দিদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং কয়েদিদের তৈরি বিভিন্ন দ্রব্যের প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।

 

রংপুর

স্বপন চৌধুরী

রংপুরের চব্বিশ হাজারীতে লোকনাথ মন্দিরে চৈত্রসংক্রান্তিতে মেলার আয়োজন হয় শত বছর ধরে। বিশেষ আকর্ষণ চড়কপূজা। এ ছাড়া স্থানীয় কারুশিল্পীদের উত্পাদিত পণ্য এবং কৃষিপণ্যই থাকে গ্রামীণ মেলার মূল বেচাকেনার জিনিস। বাঁশ, বেত, পাট, শোলা, ধাতব, মৃত্, চামড়া, তন্তুজাত হরেক রকমের কারুপণ্য ও বাচ্চাদের খেলনার বিপুল সমাবেশ গ্রামীণ মেলাকে বর্ণাঢ্য করে তোলে। কয়েক বছর ধরে বুড়িরহাটের বুড়ি মন্দিরেও পহেলা বৈশাখে মেলা বসে। নগরীতে শোভাযাত্রাসহ নানা আয়োজনের বাইরে পহেলা বৈশাখে চিকলী বিল সিটি পার্ক, ঘাঘট নদের তীরে অবস্থিত প্রয়াস সেনা বিনোদন পার্ক, পুরনো শহর মাহিগঞ্জ ও গঙ্গাচড়ায় তিস্তা নদীর পারসহ জেলার আটটি উপজেলাতেও বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়। এ ছাড়া মাহিগঞ্জ ডিমলা রাজ দেবোত্তর এস্টেট প্রাঙ্গণে তিন দিনব্যাপী বউ মেলার আয়োজন করা হয়, যে মেলায় সমাগম ঘটে শুধু নারীদের। এখানে ক্রেতা-বিক্রেতা নারীরাই। তবে চৈত্রসংক্রান্তিতে সনাতন হিন্দু সমপ্রদায়ের প্রধান উত্সব হলো চড়ক। এর সঙ্গে চলে মেলা। চৈত্র মাসজুড়ে উপবাস, ভিক্ষান্নভোজন পালন শেষে সংক্রান্তির দিন আয়োজন হয় চড়ক  মেলা। এ মেলায় মাঠের মধ্যে ‘চড়কগাছ’ নামের লম্বা খুঁটি পোঁতা হয়। এরপর ভক্তরা পিঠে লোহার বড়শি বিদ্ধ করে চড়কে ঘোরে। বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, চৈত্রসংক্রান্তি ঘিরে সন্ন্যাসীরা বাদ্যের তালে তালে নেচে নেচে  দেবদেবীর প্রতিকৃতি (পাট) মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তাঁরা যে বাড়িতে যান, সেই বাড়ির গৃহিণী পরিষ্কার পিঁড়ি বা জলচৌকি পেতে দেন। এরপর তাঁরা ওই পিঁড়ি বা জলচৌকির ওপর পাট নামান। এই সময় গৃহস্থের মঙ্গল কামনায় নেচে নেচে গান পরিবেশন করেন সন্ন্যাসীরা। গান পরিবেশন শেষে সন্ন্যাসীদের চাল, সবজি কিংবা টাকা উপঢৌকন দেন গৃহিণীরা।



মন্তব্য