kalerkantho

বি শে ষ র চ না

দিনে দিনে বৈশাখ

বিপ্লব সাহা
ফ্যাশন ডিজাইনার, বিশ্বরঙ

৬ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



দিনে দিনে বৈশাখ

বৈশাখের ফ্যাশন লাইফস্টাইলের একটা অংশ। কালের বিবর্তনে পোশাকের রং, ঢং, নমুনায় এসেছে পরিবর্তন। পহেলা বৈশাখ অনুষ্ঠান তো মূলত প্রয়োজনের তাগিদে তৈরি হয়েছে। খাজনা আদায়ের জন্য সম্রাট আকবরের সময় থেকেই পহেলা বৈশাখের প্রচলন। একটা সময় পহেলা বৈশাখ অনুষ্ঠান ছিল গ্রামকেন্দ্রিক। নতুন কাজ, নতুন ফসল, নতুন সূর্য—সব কিছুর মধ্যে নতুনত্বের ছোঁয়া। সব কিছু নতুনভাবে বরণ করার পাশাপাশি নতুন পোশাকের চলটাও তখন থেকেই শুরু হয়।

একটা সময় মফস্বলে ঈদ-পূজার চেয়ে পহেলা বৈশাখ ঘিরে আয়োজন কোনো অংশে কম ছিল না। যাঁরা একটু সংস্কৃতিমনা ছিলেন, তাঁরা নতুন বছরকে একটু অন্যভাবে বরণ করে নিতেন। ধীরে ধীরে এটি শহরের মানুষের মধ্যেও জায়গা করে নিতে শুরু করে।

চারুকলা ইনস্টিটিউটের কিছু ছাত্র ও শিক্ষক ঢাকায় একটি শোভাযাত্রা আয়োজনের কথা ভাবেন। ১৯৮৭ সালে জয়নুল উত্সবে প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একটি পরীক্ষামূলক শোভাযাত্রা করা হয়। তাতে ছিল চারটি মাত্র ঘোড়া, ২০-২৫টি মুখোশ আর কিছু ঢোল। পড়ে যায় ব্যাপক সাড়া। সাধারণ ছাত্ররাও মিশে যায় এর সঙ্গে। ১৯৮৮ সালে (বাংলা ১৩৯৪) প্রথম নববর্ষের শোভাযাত্রা বের করা হয়। আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে যে প্রতিবাদী এক চরিত্র রয়েছে, এ ক্ষেত্রেও তার প্রমাণ মিলল। তখন দেশব্যাপী চলছিল স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন। এই শোভাযাত্রা স্বৈরাচার ও তার হাত ধরে চলা মৌলবাদের বিরুদ্ধে যেন জোর প্রতিবাদ জানাল। এরও বেশ পরে বর্ষবরণ যখন নাগরিক উত্সবে পরিণত হলো, মূলত তখন থেকে পোশাকেও এলো আধুনিক ফ্যাশনের ছোঁয়া। শুরু হলো পোশাকে রং, নকশা, ম্যাটেরিয়াল আর মোটিফ নিয়ে নানা নিরীক্ষা।

১৯৯৪ সালে চারুকলায় পড়া অবস্থায় মুখোশ বানাতাম আমি। তখনো কিন্তু মানুষের মধ্যে এ ধারণা ছিল না যে নতুন বছরে নতুন কাপড় পরতে হবে। তখন পর্যন্ত বৈশাখ মানেই    লাল-সাদা শাড়ি কিংবা পাঞ্জাবি। মুখোশের মধ্যেও তো অনেক রং দেখা যায়, অজস্র রঙের খেলা। তাহলে পোশাকে কেন শুধু লাল-সাদা? তখন থেকেই শুধু লাল বা সাদার বাইরেও নকশা করতে শুরু করি। আর এখন তো উজ্জ্বল সব রঙের ব্যবহারই দেখা যাচ্ছে। সাদা-লাল শাড়ি শুধু একটি উত্সবকে কেন্দ্র করে পরা যাবে, কিন্তু বিভিন্ন রং থাকলে তা সব সময় পরা যায়। একটা সময় সাদা-লাল থেকে বের হয়ে ক্রেতারাও ভিন্ন রঙের পোশাক কিনতে শুরু করল।  তখনো বাংলাদেশের ফ্যাশন হাউসগুলো এভাবে চিন্তা করতে পারেনি, কারণ তারা গতানুগতিক ধারার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

ধীরে ধীরে পহেলা বৈশাখের ব্যাপকতা বাড়তে থাকল। পরে অন্য ফ্যাশন হাউসগুলোও শুধু বৈশাখের জন্যই পোশাক তৈরি করতে শুরু করল। যারা ভারতীয় কিংবা অন্যান্য দেশের কাপড় বিক্রি করত, তারাও বুঝতে পারল যে পহেলা বৈশাখের জন্যই তৈরি হয়েছে বিশাল বাজার।

এখন যে বাজার, তা শুধু দেশের জন্য নয়, এটি সর্বজনীন। এখন বিদেশে পাঠানোর জন্যও বৈশাখের পোশাক তৈরি হচ্ছে।

ফ্যাশন আসলে স্রোতের মতো ঘুরেফিরে আসে। আশি অথবা নব্বইয়ের দশকে যে ফ্যাশন ছিল, সেই ফ্যাশন ২০১৮ সালে ফিরে আসছে। পাঞ্জাবির ক্ষেত্রে কখনো লম্বা পরছে, আবার কখনো শর্ট। লাইফস্টাইলের সঙ্গে ফ্যাশন নিবিড়ভাবে জড়িত। আবহাওয়ার সঙ্গে কাপড় সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকতে হবে এবং কোনো একটা ট্রেন্ড ঠিক তখনই সফল হয়, যখন মানুষ তাতে আরাম পায়। পোশাক অনেকটা ভাষার মতো। পোশাক দেখলেই আমরা বুঝতে পারি এটি কোথাকার সংস্কৃতি বহন করছে।

মানুষ এখন নিজের সংস্কৃতিকেই পোশাকের মাধ্যমে বহন করতে সক্ষম। একটা সময় ছিল যখন আমাদের দেশের মানুষ বিদেশি পোশাকই বেশি পরত। কিন্তু এখন নিজেদের দেশে তৈরি পোশাকের মর্যাদা বুঝতে পেরেছে তারা।

এখন অনেকেই পোশাকে বিশেষ থিম নিয়ে কাজ করে। এবার বৈশাখ উপলক্ষে আমি সোনারগাঁও পানামনগর থিম নিয়ে কাজ করছি। মানুষ যখন এই নগরের ইতিহাস পোশাকের মধ্যে দেখবে, তখন এখানকার মানুষ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানবে এবং সেই জিনিসগুলো নিয়ে ভাববে।

অনুলিখন : এ এস এম সাদ

 



মন্তব্য