kalerkantho


ঐ তি হ্য

যশোর অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী খাবার

ফখরে আলম, যশোর   

৬ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



যশোর অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী খাবার

শিশুদের জন্য ‘আল্লা আল্লা’ আয়োজন

ফখরে আলম, যশোর

বাঙালির সব পালা-পার্বণ, সামাজিক অনুষ্ঠান, শুভ কাজ বা সংবাদ, জয়, কৃতিত্ব, পরীক্ষার ফল, চাকরি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়নে আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর মধ্যে হাতে তৈরি মিষ্টান্ন উপহার দেওয়ার রীতি অনেক আগে থেকেই। শত বছর ধরে বাঙালি এই প্রথা মেনে আসছে। প্রাচীনকালে ‘গুড়জল’ দিয়ে অতিথিকে মিষ্টিমুখ করানো হতো। সে সময় ধান ও আখ চাষের ওপর মিষ্টি নির্ভরশীল ছিল। আখ, খেজুর, তালের গুড়-মিছরিই ছিল মিষ্টি। মধ্যযুগে ছানা আবিষ্কৃত হলে মিষ্টি তৈরিতে বিপ্লব সংঘটিত হয়। টকের সাহায্যে দুধকে ভেঙে ছানা তৈরি করে সেই ছানা দিয়ে বিভিন্ন মিষ্টি তৈরি শুরু হয়। কিন্তু বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত ক্ষীর, পায়েস আজও স্বনামে-সুনামে মাথা তুলে আছে। যশোর অঞ্চলে ‘আল্লা আল্লা’, হ্যালা, সরুই পিঠা, রসের ক্ষীর, দুধকদু—এসব ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি খাবার। গ্রামের বধূরা হারিয়ে যাওয়া এই খাবারগুলো আগলে রেখেছে। মিষ্টি খাবারের পাশাপাশি আঞ্চলিক কয়েক রকম ঝাল খাবারও ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। অতিথি আপ্যায়ন, কুলখানি, মুখেভাত, খতনা, গায়েহলুদ, বিয়ে, ঈদ, মহররম, বর্ষবরণসহ বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এই খাবারগুলো অতুলনীয়। হকদানা, ছাক্কা, ডিমের খাট্টা, কাঁঠালের বিচি দিয়ে কুকড়োর (মুরগি) মাংস, চুই ঝাল খাসির মাংস যশোর অঞ্চলের শত বছরের রান্নার ইতিহাসকে সমুজ্জ্বল রেখেছে।

 

ঘাটকোল

যশোরের প্রায় সবার প্রিয় খাবার ঘাটকোল। প্রচলিত নাম ঘেঁটকচু। ঘাটকোল খাওয়া যায় নানা উপায়ে। ভর্তা, কাঁঠালের বিচি দিয়ে ঘাটকোল ভুনা, তেলের ওপর ঘাটকোল ভাজি। গ্রীষ্ম-বর্ষা এ দুই ঋতুতে ঘাটকোলের কদর বেড়ে যায়। অনেকে মাছ-মাংসের বদলে ঘাটকোল ব্যঞ্জন দিয়েই ভূরিভোজ করে। বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রচুর ঘাটকোলগাছ জন্মে। আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য তাঁর ‘চিরঞ্জীব বনৌষধি’ গ্রন্থে ঘাটকোল সম্পর্কে লিখেছেন, ‘এটি অতিশয় উত্তেজক, উদুরশুল নাশক, রক্তস্রাব নিবারক ও বিরোচক। বিষাক্ত সাপের কামড়ে মূল বেটে দংশিত স্থানে প্রলেপ ও কিছুটা খেতে দেওয়ার প্রচলন আছে। মৌমাছি, বোলতা, ভিমরুল, বিছায় কামড়ালে যন্ত্রণা উপশমে মূল বেটে দেওয়া হয়। ঘাটকোল খেলে পায়খানা পরিষ্কার হয়। রক্তস্রাব কমে। পেটের ব্যথা কমে।’ ঘাটকোলের ডাঁটাই সবাই খায়। তবে পাতা বেটে খাওয়ারও প্রচলন আছে।

 

ঘাটকোল-কাঁঠালের বিচি কষা

এক আঁটি ঘাটকোল এক ইঞ্চি আকারে টুকরা করতে হবে। কয়েকটি কাঁঠালের বিচি কেটে নিতে হবে। ঘাটকোল ও কাঁঠালের বিচি সিদ্ধ করার পর কড়াইয়ে তেল, পরিমাণমতো হলুদ, লবণ, মরিচ, পেঁয়াজ, আদা, রসুন বাটা দিয়ে খুব ভালো করে কষিয়ে নিতে হবে। এই ব্যঞ্জনটি গরম ভাতে অত্যন্ত উপাদেয়।

 

নারিকেল দুধে ঘাটকোল

এক আঁটি ঘাটকোল ছোট টুকরা করে কেটে পানিতে সিদ্ধ করে রাখতে হবে। এরপর পরিমাণমতো তেল, হলুদ, লবণ, আদা, রসুন, শুকনা মরিচ বাটা দিয়ে সিদ্ধ করা ঘাটকোল কষিয়ে এক বাটি নারিকেলের দুধ দিতে হবে। নারিকেলের দুধ শুকিয়ে তেল বের হলে নামিয়ে গরম গরম পরিবেশন করতে হবে।

হ্যালা

এটি মূলত মিষ্টিজাতীয় খাবার। হ্যালা খাওয়া হয় রুটি দিয়ে। অনেকে একে হ্যালা রুটিও বলে। হুজুর বাড়ি মিলাদ পড়াতে এলে সাধারণত তাঁকেসহ অন্যদের হ্যালা খেতে দেওয়া হয়। 

হ্যালা রান্নার জন্য প্রয়োজন আতপ চালের গুঁড়া ৫০০ গ্রাম, খেজুর গুড় ৫০০ গ্রাম, তেজপাতা ২টি, লবণ এক চা চামচ, একটি নারিকেল কোরা। এসব একসঙ্গে পরিমাণমতো মিশিয়ে ১৫-২০ মিনিট ধরে রান্না করতে হবে। আঠা আঠা হলে নামিয়ে পরিবেশন করতে হবে।

 

ছাক্কা

ছাক্কা যশোর অঞ্চলের একটি কঠিন খাবার। বিয়েশাদি ছাড়াও কুলখানিতে ছাক্কা থাকবেই। খাবারের শুরুতে ছাক্কা পরিবেশন করা হয়; পরে মাছ, মাংস বা অন্য কিছু। খাসির চর্বি আর মুগডাল কিংবা ছোলার ডাল দিয়ে ছাক্কা রান্না করা হয়। অনেকে ছাক্কাকে সুস্বাদু করার জন্য কলিজাও দেয়।

 

উপকরণ : মুগ কিংবা ছোলার ডাল ৫০০ গ্রাম, খাসির চর্বি ১০০ গ্রাম, পেঁয়াজ কুচি ১ কাপ, আদা ও রসুন বাটা ২ চা চামচ, মরিচ বাটা পরিমাণমতো, হলুদ, লবণ পরিমাণমতো, এলাচ ৪টি, লবঙ্গ ৬টি, দারুচিনি ২ কাঠি, তেল ২ টেবিল চামচ।

রন্ধন প্রণালী : প্রথমে ডাল সিদ্ধ করে রাখতে হবে। এরপর পেঁয়াজ আর গরম মসলা তেলে ভেজে সব মসলা দিয়ে ভালো করে কষিয়ে ডাল দিতে হবে। পরিমাণমতো পানি দিয়ে রান্না করতে হবে ১৫ মিনিট। এরপর ১ ইঞ্চি মাপে কাটা চর্বি দিতে হবে। চর্বি দিয়ে আরো ১৫ মিনিট রান্না করে নামানোর আগে কয়েকটি কাঁচা মরিচ ও ১ চা চামচ ভাজা জিরা পাউডার দিয়ে ছাক্কা ঘন হয়ে গেলে নামাতে হবে।

 

ছিটে রুটি

যশোরের ছিটে রুটি খেয়ে জামাই শ্বশুরবাড়ির কথা ভুলতেই পারে না। খুশবুময় ‘আলো’ (আতপ) চালের ছিটে রুটি আর কুকড়োর (মুরগি) মাংসের যেন জবাব নেই। ছিটে রুটি তৈরিতেও গৃহবধূর আছে বিশেষ কারিশমা। ছিটে রুটি নরম হয়। কাগজের মতো পাতলা হয়। এটি ছিটে পিঠা হিসেবেও পরিচিত। যশোরের বাঘারপাড়া ও মণিরামপুর উপজেলার ছিটে রুটি বেশি বিখ্যাত।

ছিটে রুটি তৈরির জন্যে প্রয়োজন ঢেঁকিতে কোটা গুঁড়া চাল। আমন মৌসুমে কটকতারা কিংবা অন্য কোনো খুশবুযুক্ত ধানের আতপ চাল তৈরির পর ঢেঁকিতে গুঁড়া তৈরি করা হয়। হালকা গরম পানিতে গুঁড়া লবণ দিয়ে গুলিয়ে ছিটে রুটি তৈরির জন্য প্রস্তুত করা হয়। এরপর কাঠের চুলায় লোহার কড়াই খুব ভালোভাবে তাতিয়ে নিয়ে কলাপাতার ডগার সাহায্যে কড়াইয়ে তেল মাখিয়ে নেওয়া হয়। এরপর গৃহবধূরা হাত গুঁড়ার গোলায় ডুবিয়ে পাঁচ আঙুলে ছিটিয়ে কড়াইয়ে গোলা দেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তৈরি হয়ে যায় ছিটে রুটি। মাঝারি আঁচে এই রুটি তৈরি করে নামাতে হবে। খেতে হবে মুরগির মাংস দিয়ে। তবে খাসির মাংস, গরুর মাংস দিয়েও খাওয়া চলে।

ডিম-আমড়ার খাট্টা

এই রান্নাটি যশোর অঞ্চলের মানুষের খুবই প্রিয়। বাড়িতে মেহমান এলে ডিম-আমড়ার খাট্টা রান্না করা হয়। আবার অনেকে শুধু ডিম-আমড়া রেঁধে এক তরকারি দিয়েই খাবার সাবাড় করেন। এই রান্নাটির জন্য দরকার ১টি নারিকেল কোরা, ৪টি ডিম, ১০টি আমড়া, রসুন ও আদা বাটা ২ চা চামচ, লবণ পরিমাণমতো, চিনি ২ চা চামচ, এলাচ ২টি, জিরা ২ চা চামচ, দারুচিনি ২ কাঠি। প্রথমে আমড়া ছিলে আস্ত আমড়া কাঁটাচামচ দিয়ে কেঁচিয়ে নিতে হবে। ডিম-আমড়া সিদ্ধ করে পনি ঝরিয়ে আলাদা পাত্রে রাখতে হবে। ২ টেবিল চামচ তেল কড়াইয়ে দিয়ে আদা ও রসুন বাটা কষিয়ে ডিম-আমড়া দিয়ে নারিকেলের দুধ ঢেলে ১০ মিনিট রান্না করতে হবে। অন্য একটি কড়াইয়ে জিরা, গরম মসলা, ২টি পেঁয়াজ কুচি ভেজে সব একসঙ্গে বেটে ডিম-আমড়ায় ঢেলে দিতে হবে। আবার ১৫ মিনিট রান্না করলে পানি শুকিয়ে মাখা মাখা হয়ে তেল বের হবে। এবার চিনি দিয়ে নামাতে হবে। এই পদটি সাধারণত শেষে খাওয়া হয়।

 

রসের ক্ষীর

শীত মৌসুমে রসের ক্ষীরই যশোর মাতিয়ে রাখে।

উপকরণ : রস ৪ কেজি, আতপ চাল ৫০০ গ্রাম, লবণ ১ চা চামচ, নারিকেল কোরা ১টি, তেজপাতা ২টি।  প্রথমে রসে চাল ফুটিয়ে নিতে হবে। এরপর সব উপকরণ দিয়ে পাতলা করে এই ক্ষীর রান্না করতে হবে।

 

 

সরুই পিঠা

যশোর অঞ্চলের নতুন ধানের চালের গুঁড়া দিয়ে তৈরি সরুই পিঠা খুবই জনপ্রিয় একটি মিষ্টান্ন। সাধারণত শবে মেরাজের সময় রোজা রেখে সরুই পিঠা আর খই একসঙ্গে মিশিয়ে ইফতার করা হয়।

উপকরণ : ৫০০ গ্রাম খুসবুমাখা আতপ চালের গুঁড়া, ৫০০ গ্রাম খেজুর গুড়, ২টি তেজপাতা, ২টি কাঁচা নারিকেল, ১ চা চামচ লবণ।

প্রস্তুত প্রণালী : প্রথমে চালের গুঁড়া সিদ্ধ করে খামির তৈরি করে নিতে হবে। এরপর পিঁড়ির ওপর কিছুটা খামির নিয়ে লম্বা তার বানাতে হবে। সেই তার হাতে কেটে দুই মাথা চিকন করে ১ ইঞ্চি পরিমাণ সরুই পিঠা বানাতে হবে। এই পিঠা অন্য সব উপকরণ দিয়ে মাখা মাখা করে রান্না করতে হবে।

 

চুই ঝাল খাসির মাংস

যশোর-খুলনা অঞ্চলে চুই ছাড়া খাসির মাংস রান্নাই হয় না। মাংসের স্বাদ বাড়ানোর জন্যই চুই ঝাল ব্যবহার করা হয়। সে কারণে উৎসবের সময় চুই ঝালের দাম বেড়ে যায়। ৫০০ টাকার চুইয়ের দাম বেড়ে এক হাজার টাকায় ওঠে। ঈদ, পালা-পার্বণ-উৎসবে চুই ঝাল খাসির মাংসের বিশেষ এই রান্নার কোনো তুলনা নেই। এবার যশোরের হাটবাজারে চুই ঝাল বিক্রি হয়েছে প্রতি কেজি ৫০০ থেকে ১২০০ টাকা।

চুই কিংবা চুই ঝাল নামে পরিচিত লতাজাতীয় এই গাছটি দেখতে একেবারে পানগাছের মতো। এর কাণ্ড মসলা হিসেবে গরু ও খাসির মাংসে দেওয়া হয়। আঙুলের মতো চিকন লতার দাম কম। আর গাছের গোড়ার দাম সবচেয়ে বেশি। মাংস রান্নার সময় লতা ফেড়ে দেওয়া হয়। এতে এক অপূর্ব স্বাদের সৃষ্টি হয়। সেই স্বাদ ঝাল ঝাল। এই ঝালের বিশেষত্ব হচ্ছে, ঝালে উহ্-আহ্ করলেও ঝালের ঝাঁজ স্থায়ী হয় না। এ ছাড়া এর অনেক ভেষজ গুণ রয়েছে। যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা জেলায় সবচেয়ে ভালো চুই উৎপাদিত হয়। প্রবীণ কোনো গাছকে অবলম্বন করে চুই বেড়ে ওঠে। অনেকে চুই দিয়ে মাছও রান্না করেন। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি প্রিয় পদ ছিল যশোরের কই দিয়ে চুই।

 

চুই খাসি রাঁধবেন যেভাবে

উপকরণ : কালো বড় খাসির মাংস ১ কেজি, তেল ৪ টেবিল চামচ, লবণ ও হলুদ পরিমাণমতো, ছোট রসুন ১০টি, শুকনা মরিচ ছেঁড়া ১০-১২টি, গরম মসলা বাটা ১ চা চামচ, পেঁয়াজ বাটা ২ চা চামচ, জিরা বাটা আধা টেবিল চামচ, চুই ঝাল ১০০ গ্রাম, আদা ও রসুনের রস ১ কাপ।

রন্ধন প্রণালী : মাংসের মাঝারি টুকরাগুলো একবার ধুয়ে নিন। এরপর চুই বাদে তেল কড়াইয়ে গরম করে সব উপকরণ দিয়ে ভালোভাবে কষান। এরপর মাংস দিন। মাঝারি আঁচে রান্না করুন ৩০ মিনিট। এরপর আঙুলের মতো টুকরা করে কেটে রাখা চুই ঝাল ও আস্ত রসুন দিন। ফের ২০ মিনিট কম আঁচে রান্না করুন। মনে রাখবেন, এই রান্নায় কোনো পানি দেওয়া চলবে না। মাংস থেকে তেল বের হবে। কালচে লাল রং ধারণ করবে। গরম ভাত, পোলাওয়ের সঙ্গে পরিবেশন করুন।

 

ঐতিহ্যবাহী ‘আল্লা আল্লা’

উঠানে ধান ওঠার পর সেই ধানের আতপ চাল দিয়ে ‘আল্লা আল্লা’ ক্ষীর রান্না করা হয়। এই ক্ষীর কলাপাতায় খেতে দেওয়া হয়। খাওয়ার আগে শিশুরা একসঙ্গে ‘আল্লা আল্লা’ বলে চিৎকার করে। শিশুদের খাওয়ার পর গৃহস্থ অন্ন গ্রহণ করেন। এ ছাড়া মনস্কামনা পূরণ করার জন্যও ‘আল্লা আল্লা’ দেওয়া হয়। বৃষ্টি না হলে ছোট গর্ত করে তার মধ্যে পানি দিয়ে ব্যাঙ ছেড়ে ছোট শিশুরা ‘আল্লা মেঘ দে পানি দে’ গান গেয়ে আল্লা আল্লা করে ক্ষীর খায়। বাড়ির বউয়ের বাচ্চা না হলে বউকে মাঝখানে বসিয়ে ‘আল্লা আল্লা’ দেওয়া হয়। আগে শিশুরা ক্ষীর খায়, পরে বউ আল্লাহর নামে এই ক্ষীর খায়।

আল্লা আল্লা সাদা ক্ষীরের উপকরণ

১ কেজি আতপ চাল, ১টি নারিকেল কোরা, সামান্য লবণ, এক-দুটি তেজপাতা।

প্রস্তুত প্রণালী

প্রথমে পানি দিয়ে চাল সিদ্ধ করতে হবে। এরপর নারিকেল কোরা, লবণ, তেজপাতা দিয়ে নরম করে রাঁধতে হবে। ক্ষীরের রং হয় সাদা। সাধারণত এই ক্ষীরে কোনো মিষ্টি দেওয়া হয় না। তবে আজকাল অনেকে চিনি কিংবা গুড় দিয়েও এই ক্ষীর রান্না করেন।

 

কাঁঠালের বিচি কুকড়ো মাংস

‘কাঁঠালের বিচি কুকড়োর গোশ। যত দোষ নন্দ ঘোষ’—কাঁঠালের বিচি মুরগির মাংসের তরকারি খেয়ে মনের আনন্দে কিশোররা এমন প্রবাদ আউড়ে লাফিয়ে বেড়ায়। যশোর অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী খাবার হচ্ছে কাঁঠালের বিচি কুকড়ো (মুরগি) মাংস। গ্রীষ্ম মৌসুমে সাধারণত এই পদটি গৃহস্থবাড়ির আঙিনা গন্ধে ভরিয়ে তোলে। তবে শীত মৌসুমেও বিশেষ পদ্ধতিতে সংরক্ষিত কাঁঠালের বিচি দিয়ে কুকড়োর মাংস রান্না হয় আর খাওয়া হয় ছিটে রুটি দিয়ে। এটিও জামাই আদরের অন্যতম খাবার। এ ছাড়া মেহমানদারিতে কুকড়ো মাংসের জুড়ি নেই। মোরগ নয়, নবীন মুরগি, যে মুরগি ডিম পাড়ার উপযোগী, সেই মুরগি দিয়ে এই পদটি রান্না করা হয়।

রন্ধন প্রণালী

১ কেজি ওজনের একটি কুকড়ো ছোট ছোট টুকরা করা হয়। প্রায় ২৫০ গ্রাম কাঁঠালের বিচি ধুয়ে পরিষ্কার করে রাখা হয়। এই বিশেষ পদটির জন্য খাঁটি সরিষার তেল, ভাজা জিরার গুঁড়া, ছেঁড়া শুকনা মরিচ প্রয়োজন। আর প্রয়োজন সনাতন কাঠের চুলার। তবে অন্য চুলায়ও সতর্কতার সঙ্গে কুকড়োর মাংস রান্না করা যায়। হাঁড়ি কিংবা কড়াইয়ে পরিমাণমতো সরিষার তেল দিয়ে তাতে কয়েকটি পেঁয়াজ কুচি কিংবা বাটা ভালো করে ভেজে নিতে হবে। এরপর দিতে হবে পরিমাণমতো আদা, রসুন ও জিরা বাটা। দিতে হবে কয়েকটি এলাচ, লবঙ্গ, দারুচিনি। পরিমাণমতো হলুদ ও লবণও দিতে হবে। দিতে হবে ৮ বা ১০টি ছেঁড়া শুকনা মরিচ। সামান্য পানি দিয়ে এসব মসলা ভালোভাবে কষাতে হবে। এরপর মুরগির মাংস দিয়ে ১০-১৫ মিনিট কষিয়ে দিতে হবে কাঁঠালের বিচি। ফের ৫ মিনিট কষিয়ে পরিমাণমতো পানি দিতে হবে। ভালো আঁচে ১৫ মিনিট রান্নার পর আঁচ কমিয়ে চুলার ওপর কিছুক্ষণ রেখে দিতে হবে। মাংস দিয়ে তেল বের হবে। রং হবে লাল। ঝোল থাকতেই নামাতে হবে। নামানোর আগে দিতে হবে ১ চা চামচ গরম মসলা ও ভাজা জিরার গুঁড়া। কুকড়োর মাংসের ঝোলে ডুবিয়ে আয়েশ করে খেতে হবে ছিটে রুটি। তবে পরোটা, গমের আটার রুটি, চালের গুঁড়ার রুটির সঙ্গেও খাওয়া চলে। যশোর সদর উপজেলার চাঁচড়া গ্রামের কুকড়োর মাংসের পাকা রাঁধুনি নাসিমা আলম। তিনি বলেন, ‘আমরা নিজেদের খাবারের পাশাপাশি নিকটাত্মীয়দের কাঁঠালের বিচি ও কুকড়োর মাংস দিয়ে আপ্যায়ন করি। মুরগির টুকরাটি এক-দেড় ইঞ্চির মতো হতে হবে। স্বাদের জন্য চড়া ঝাল দিতে হবে। খাওয়ার পর অতিথি উশইশ করবে। এতেই আনন্দ। অতিথি কোনো দিনই কুকড়োর মাংসের কথা ভুলতে পারবে না।’

 

দুধকদু

যশোর অঞ্চলে জামাইকে দুধকদু দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। অন্য জেলায় দুধকদুকে দুধলাউ বলা হয়।

উপকরণ : ছোট কচি লাউ ১টি, দুধ ৪ কেজি, ঘি ২ টেবিল চামচ, চিনি ৫০০ গ্রাম, এলাচ ৪টি, কাজু বা পেস্তাবাদাম ১০০ গ্রাম।

প্রস্তুত প্রণালী : দুধ জ্বাল দিয়ে ঘন করে রাখতে হবে। লাউ খুব মিহি করে কুচিয়ে পাতলা কাপড়ে বেঁধে পানি ঝরানোর জন্য ১ ঘণ্টা রেখে দিতে হবে। রান্নার পাত্রে ঘি ঢেলে কুচানো লাউ ভেজে নিয়ে দুধ দিতে হবে। মাঝারি আঁচে ২০ মিনিট রান্নার পর এলাচ ও চিনি দিয়ে আবার ১০ মিনিট রান্না করে ঘন হয়ে এলে নামিয়ে বাদাম দিয়ে পরিবেশন করতে হবে।

তাঁরাই ঐতিহ্যের রন্ধনশিল্পী

যশোর সদর উপজেলার ভাতুড়িয়া দাড়িপাড়া গ্রামের মা জোহরা খাতুন হ্যালা, সরুই পিঠার মাস্টার। তিনি যশোর অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী সব রান্না ধরে রেখেছেন। আর এসব রান্না হাতে-কলমে তাঁর মেয়ে রহিমা খাতুনকে শিখিয়েছেন। রহিমা খাতুন বলেন, ‘আমি শুধু হ্যালা, আল্লা আল্লা নয়, ছিটে রুটি কুকড়োর মাংস রান্না করতে পারি। আমার রান্না আত্মীয়-স্বজনই শুধু নয়, গ্রামের মোড়ল-মাতব্বররা খেয়ে প্রশংসা করেছেন।’ একই গ্রামের গৃহবধূ আমেনা খাতুন (৭২) একজন ঐতিহ্যের রন্ধনশিল্পী। ১২ বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয়। এর পর থেকে তিনি হাঁড়ি ঠেলছেন। পাকান পিঠা, ছিটে রুটি, কাচিপোড়া পিঠা তৈরিতে তাঁর জুড়ি নেই। তিনি বলেন, ‘এখন চোখে ঠিকমতো দেখতে পাই না। তার পরও আমার ছিটে রুটি বাতাসে উড়ে যায়। আমি নতুন প্রজন্মকে পিঠা তৈরির কলাকৌশল শিখিয়েছি।’ সদর উপজেলার খেদাপাড়া গ্রামে বাড়ি শিল্পী খাতুনের। তিনিও হারিয়ে যাওয়া খাবারের রন্ধনশিল্পী। তিনি বলেন, ‘চিপস, চকোলেট, চা-বিস্কুট যশোরের পিঠা ও খাবারকে কোণঠাসা করে ফেলেছে। তার পরও আমরা সরুই পিঠা, হ্যালা পিঠার জন্য ঐতিহ্য ধরে রেখেছি।’



মন্তব্য