kalerkantho


অঝোর অলকাধারা

ভারতের নারী সংগীত পরিচালকদের মধ্যে এখন সবচেয়ে আলোচিত অলকানন্দা দাশগুপ্ত। ‘সেক্রেড গেমস’-এর সংগীত পরিচালনা করে নাম কুড়িয়েছেন তিনি। লিখেছেন আবু সালেহ শফিক

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



অঝোর অলকাধারা

অলকানন্দার বাবা বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত। ‘বাঘ বাহাদুর’, ‘লাল দরজা’, ‘চরাচর’, ‘মন্দ মেয়ের উপাখ্যান’ ইত্যাদি ছবির পরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্তকে অনেকেরই চেনা। সেই বুদ্ধদেবের মেয়ে অলকানন্দা সংগীত পরিচালক হলে আগ্রহ কিছু বেড়েই যায়। কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে ইংরেজিতে স্নাতক এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর। সেন্ট জেভিয়ার্সে চলচ্চিত্র বিষয়েও পড়েছেন দুই বছর। তারপর টরন্টোর ইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে সংগীতসৃজন বিষয়েও পড়েছেন। দেশে ফিরে অমিত ত্রিবেদীর সঙ্গে জুটে গিয়েছিলেন। অমিত বলিউডের নামি সংগীত পরিচালক। তাঁর সঙ্গে থেকে অলকা কাজ করেছেন ‘উড়ান’, ‘আয়শা’, ‘নো ওয়ান কিলড জেসিকা’, ‘চিল্লার পার্টি’ ইত্যাদি ছবিতে। অলকা বলছিলেন, ‘২০০৯ সালে কলকাতায় ফিরে আসার পর এক বন্ধুর কাছ থেকে অমিতের নম্বর পাই। বললাম—আমি সংগীত বিষয়ে পড়েছি, তোমাকে হেল্প করতে চাই। কয়েক দিন পর থেকেই তার সঙ্গে কাজ শুরু করি। সহকারী হিসেবে তার কম্পোজিশনের নোটেশন লিখতাম যন্ত্রীদের জন্য। অফিসের হিসাবও রাখতাম। কম্পিউটারে সংগীত তৈরি করা আমাকে শিখিয়েছে অমিত। কারণ তখন পর্যন্ত আমি শুধু পিয়ানোতে গান লিখতাম।’

অলকা একা প্রথম সংগীত করেছেন ২০১১ সালে, মারাঠি ছবি ‘শালা’য়। ২০১৩ সালে কাজ করেছেন ‘বিএ পাস’, ‘আনোয়ার কা আজব কিসসা’ ইত্যাদি ছবিতে। ২০১৭ সালে ‘ট্র্যাপড’। এ বছর তিনি আলোচনায় ‘সেক্রেড গেমস’ দিয়ে। নেটফ্লিক্সের জন্য তৈরি এই ওয়েব সিরিজটির পরিচালক অনুরাগ কাশ্যপ আর বিক্রমাদিত্য মোতওয়ানে। সাইফ আলী খান, নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকীর মতো তারকারা অভিনয় করেছেন। কমনওয়েলথ রাইটার্স প্রাইজ বিজয়ী বিক্রম চন্দ্রের একই নামের রহস্য উপন্যাস থেকে তৈরি  সিরিজটি। ২০টি ভাষায় এর সাবটাইটেল হয়েছে। অলকা বলছিলেন, ‘শুরুর সংগীতটা নিয়ে ঝামেলা হয়েছিল বেশ। আমি নার্ভাস ছিলাম। সময়ও ছিল কম। বিক্রম আর আমি পরস্পরকে নানা ভাবনা ছুড়ে দিচ্ছিলাম। পরে বললাম, বাড়ি গিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় ভাবব আর তোমাকে একটা মিউজিক পিস পাঠাব। শুনে জানিয়ো। শেষে ঠিক হলো, এটি হবে প্রার্থনা সংগীতের মতো, তবে কোনো ধর্মের লোকই মিল খুঁজে পাবে না। আমার পছন্দের যন্ত্রসংগীত চেলো ব্যবহার করেছি এতে। চেলো আমার সব সংগীতেই থাকে। চেলিস্ট রস্ত্রপভিচ এবং ইয়োহানেস ব্রামসের ভায়োলিন কনসার্ট শুনে চেলোর প্রেমে পড়ি। তবে ভারতে চেলিস্ট খুঁজে পাওয়া সত্যি কঠিন।’

সঙ্গে যোগ করেন, “পর্বগুলোর জন্য সংগীত তৈরিতে তুলনামূলক বেশি সময় পেয়েছিলাম। গল্পের ভেতরের কথাটা ধরে ফেলতে পারলে কাজ অনেক সহজ হয়ে যায়। ভয় ছিল গোপন কথাটা ধরতে পারছি কি না। শেষে গল্পের ভেতরে এমন ডুবে গিয়েছিলাম যে সংগীত তৈরি হয়ে গিয়েছিল। ‘ধুয়া ধুয়া’, ‘সাইয়া’সহ চারটি গান আছে সিরিজটিতে। ‘সাইয়া’ চার নম্বর পর্বে আছে। বিপিন ভোঁসলে (একটি চরিত্র) নির্বাচনে জিতলে দাঙ্গা বেধে যায়—এমন দৃশ্যের প্রেক্ষাপটে গানটি। মনে হচ্ছিল, এখানে ভয় ধরানো দরকার। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদলে যেমন হয়, তেমন সংগীত দিয়েছি এতে। সিরিজটি আমার কাছে কিছুটা ডার্ক, কিছুটা মজার। কিছু সত্যও লুকিয়ে আছে এতে। এর মধ্যে শূন্যতা আছে, মন খারাপের ব্যাপার আছে, আছে মৃত্যুও। আমি ধরার চেষ্টা করেছি, সম্ভবত পেরেছিও।’

এ আর রহমান, আর ডি বর্মনের সংগীত পছন্দ করেন অলকা। বলছিলেন, ‘ওই সব দিনে যখন সংগীত নিয়ে এত কথা হতো না, বর্মন তখন অদ্ভুত সব চিন্তার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। শোলের (১৯৭৫) কথা বলি—তিনি একটি দোলনা দোলার শব্দ এমনভাবে ব্যবহার করেছেন যে ভয় তৈরি হয়। তারপর সত্য পে সত্য (১৯৮২) ছবিতে গড়গড় করার (গার্গল) শব্দ ব্যবহার করেছেন।’

অলকা নিজেই নিজের সবচেয়ে বড় সমালোচক, “পুরস্কার পেলে ভালো লাগে, প্রশংসা শুনতেও। তবে শেষ বিচারক আমি নিজে। দিন কয়েক আগে ‘সেক্রেড গেমস’-এর চার নম্বর পর্বটি এক বন্ধুর সঙ্গে আবার দেখছিলাম। একপর্যায়ে বললাম, ‘বন্ধ করো। কারণ আমি ভুলগুলো ধরতে পারছিলাম এবং কষ্ট পাচ্ছিলাম।”



মন্তব্য