kalerkantho


তাঁদেরও আছে ঈদ

চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির তালিকা অনুযায়ী বেকার শিল্পীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন শ। ঈদ সামনে রেখে তাঁদের সবাই ভিড় জমাচ্ছেন এফডিসিতে। যদি পাওয়া যায় কাজ বা আর্থিক সাহায্য—পরিবার নিয়ে ঈদটা তো অন্তত করতে হবে! লিখেছেন সুদীপ কুমার দীপ। ছবি তুলেছেন মোহাম্মদ আসাদ

৭ জুন, ২০১৮ ০০:০০



তাঁদেরও আছে ঈদ

এফডিসিতে ক্যান্টিনের পাশের বেঞ্চে বসে আছেন জুনিয়র শিল্পীরা

৩ জুন বিকেলবেলা। এফডিসির গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই দেখা হলো সহকারী পরিচালক মিরাজের সঙ্গে। সর্বশেষ কাজ করেছেন মালেক আফসারীর ‘অন্তর জ্বালা’য়। এরপর এক বছর পার হয়ে গেলেও হাতে নেই নতুন ছবি। সামনেই ঈদ। কী করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। চেহারাও বিমর্ষ। ‘অনেক প্রযোজকের কাছে বকেয়া টাকা পাই। কেউ দিতে চাইছে না। পকেটের অবস্থা এমন, ফ্লেক্সিলোড করার উপায়ও নেই। ঈদ করব কিভাবে’—বললেন মিরাজ।

চার নম্বর ফ্লোরে চোখ পড়ল মধ্যবয়সী এক নারীর দিকে। একটি প্রাডো গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। একটু পর গাড়িতে ওঠার জন্য এগিয়ে এলেন স্যুট পরা এক ব্যক্তি। মহিলা তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। কাছে যেতেই বিষয়টি স্পষ্ট হলো। তিনি একজন প্রযোজক। তাঁর কাছে ঈদ সালামি দাবি করেছেন মহিলা। পকেট থেকে পাঁচ শ টাকার একটি নোট বের করে দিলেন প্রযোজক। দারুণ খুশি হলেন মহিলা। মিরাজ সেটা দেখিয়ে বললেন, ‘ওরা জুনিয়র শিল্পী। লোকলজ্জা ভুলে হাত পাততে পারে। কিন্তু আমরা? প্রায় এক শ ছবির সহকারী আমি। রুবেল, মান্না থেকে শুরু করে শাকিব খান, জায়েদ খানসহ সময়ের সব তারকার সঙ্গে কাজ করেছি। আমার নির্দেশে তাঁরা শট দিয়েছেন। এখন আমি তাঁদের কাছে গিয়ে কী করে হাত পাতি!’

ক্যান্টিনে কথা হলো জুনিয়র শিল্পী রিমার সঙ্গে। ডিভোর্সি এই নারীর দিনাজপুরে এক মেয়ে আছে, পড়ে ক্লাস নাইনে। ঈদে নতুন জামা নেবে বলে এরই মধ্যে দুই দিন ফোন করেছে। ‘নতুন কোনো ছবি হচ্ছে না। পুরনো যে পরিচালকদের কাজ করেছি, তাঁদের ওপর ভরসা করেই এফডিসিতে এসেছি। ভাবছি কিছু টাকা দেওয়ার অনুরোধ করব। পরের কোনো ছবিতে হয়তো কাজ করে শোধ করে দেব’—বললেন রিমা।

শুধু রিমা নয়, দুই শতাধিক ছবির অভিনেতা কমল পাটেকার। শাকিব খান অভিনীত বেশির ভাগ ছবিতে কাজ করেছেন। তিনিও বলেন একই কথা, ‘এফডিসিতে এলে মনটা খারাপ হয়ে যায়। আমি নিজেও সচ্ছল নই। অভিনয়ের বাইরে কিছু করি না। সহ-অভিনেতারা যখন তাঁদের অসহায়ত্বের কথা বলেন, পকেটে যা থাকে দিয়ে দিই। বুঝি, একটা মানুষ কতটা অসহায় হলে পরে আরেকজনের কাছে হাত পাতে।’ এ সময়ের জনপ্রিয় কমেডি অভিনেতা চিকন আলী। ইউটিউবে চ্যানেল খুলেছেন। ক্যামেরা আর কয়েকজন ছেলে-মেয়ে নিয়ে তৈরি করেছেন টিম। শর্ট ফিল্ম, কমেডি নাটিকা তৈরি করে আপলোড দেন। এই খবর এফডিসিতে পৌঁছতেই চিকন আলীকে ঘিরে ধরেন অভিনেতা মাসুদ। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। তাঁকে কাস্টিং দিতেই হবে। দুই বছর কোনো কাজ করেননি। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় বলেন, কাজ জুটিয়ে তবেই ফিরবেন। কিন্তু হয় না। আগে বেশ কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করেছেন চিকনের সঙ্গে। আর তাই চিকনের চ্যানেলে কাজ করার অধিকার তাঁর আছে। চিকন বলেন, ‘মাসুদ ভাইয়ের মতো অনেকেই আসেন আমার কাছে। এই রোজায় চাপটা বেশি। কাকে রেখে কাকে নেব! তা ছাড়া ইউটিউবে কী এমন টাকা পাওয়া যায় যে ওদের দেব! খুব লজ্জায় পড়ে যাই। ওদের ধারণা, আমি সিনেমা করছি না অথচ পকেটে টাকা আছে। তার মানে ইউটিউবে দারুণ ব্যবসা। সত্যি বলতে, আমি নিজেও কিন্তু কাজ খুঁজছি।’

শিল্পী সমিতির রেজিস্ট্রার জাকির। দীর্ঘদিন ধরে এই দায়িত্ব পালন করছেন। জানালেন, এই বছরের মতো খারাপ সময় নাকি আগে কখনো দেখেননি। রোজার প্রথম দিন থেকে প্রতিদিন সকাল থেকে শিল্পীরা আসেন। বসে থাকেন চুপচাপ, কোনো কাজ নেই। জাকিরের মতে, বেকার শিল্পী প্রায় সাড়ে তিন শ। শিল্পী সমিতির তহবিল থেকে প্রতিবছর সাহায্য করা হয় তাঁদের। তবে সেটা দিয়ে কি আর ঈদ হয়? এঁদের অবস্থার উন্নতি করতে গেলে দরকার কাজ। জাকিরের মতো একই কথা বললেন দুই শতাধিক ছবির অভিনেতা বাদল, ‘রাস্তায় বের হলেই লোকে চিনে ফেলে। অন্য কোনো কাজও যে করব তার উপায় নেই। মুখিয়ে থাকতে হয় শুটিংয়ের জন্য। কিন্তু নতুন ছবি শুরুই হয় না। এর মধ্যে যখন ঈদ বা অন্য কোনো উত্সব আসে, দিকহারা হয়ে পড়ার মতো অবস্থা হয়। আমার মতো অনেকেই আছে, যারা না পারছি কারো কাছে হাত পাততে, আবার না পারছি পরিবারকে খুশি করতে।’

 



মন্তব্য