kalerkantho


তাঁদের বয়ানে

কির ডালেয়া, অভিনেতা

১২ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



তাঁদের বয়ানে

কীর ডালেয়া

১৯৬০ সালে এক জ্যোতিষী আমার হাত দেখে ভবিষ্যদ্বাণী করে, ‘আপনার দিকে একটি স্পেসশিপ ধেয়ে আসছে।’ এর কিছুদিন পরেই আমার এজেন্টের কাছে শুনতে পাই, স্ট্যানলি কুব্রিক তাঁর নতুন কল্পবিজ্ঞানধর্মী চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্রে আমাকে চাচ্ছেন। আরো উত্তেজিত হয়ে পড়ি যখন শুনি চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যকার আর্থার সি ক্লার্ক। তাঁর কল্পবিজ্ঞানধর্মী গল্প পড়েই যে কেটেছিল আমার ছোটবেলা।

প্রথম দিন চিত্রায়ণ শুরুই করা যাচ্ছিল না কারণ খুঁতখুঁতে কুব্রিক আমার জুতো পছন্দ করছিলেন না। সে ঝামেলা মেটানোর পর আমি একেবারেই অস্বস্তিতে পরে যাই কাজ করতে। কুব্রিক সেটি বুঝতে পেরে আমাকে ডেকে বলেন, ‘আমি যা চাই তার পুরোটাই তোমার মধ্যে আছে।’

ঘূর্ণায়মান স্পেসক্রাফটটা ছিল দারুণ। শুধু স্পেসক্রাফট কেন, পুরো ছবিই কুব্রিকের তীক্ষ মেধার পরিচায়ক। ঘূর্ণায়মান স্পেসক্রাফটে আমি ওপরের দিক থেকে উল্টো হয়ে ধীরে ধীরে আরেক সঙ্গীর দিকে আমার আগানোর দৃশ্যটার পুরোটাই ছিল ক্যামেরা কারসাজি ও সেটের বৈশিষ্ট্য। উল্টো অবস্থায় আমার সঙ্গীর খাওয়ার দৃশ্যটা একেবারেই স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল। কারণ, তারা খাবারের অংশ কাঁটাচামচের সঙ্গে আঠা দিয়ে লাগিয়ে দিয়েছিল।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ‘হাল-৯০০০’-এর স্বর কেমন হবে সেটি নিয়ে চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন কুব্রিক। হুট করেই তাঁর এক সহকারী পরিচালকের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘তুমি তো লন্ডন থেকে এসেছো। তুমিই কণ্ঠ দেবে।’

শুরুতে চলচ্চিত্রটি নিয়ে অনেক সমালোচনা হলেও ধীরে ধীরে দর্শকদের প্রিয় চলচ্চিত্রে পরিণত হয়। প্রেক্ষাগৃহগুলো তখন মাতাল অথবা নেশাগ্রস্ত দর্শকদের দিয়ে ভর্তি হয়ে যায়, কারণ স্বাভাবিক অবস্থায় চলচ্চিত্রটি কেউই বুঝত না বলে দাবি করত সবাই!

ডগলাস ট্রামবল, ভিজুয়্যাল ইফেক্ট সুপারভাইজার

চলচ্চিত্রটি তৈরি করতে লেগেছিল ১০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি, যা সে সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ছিল অসম্ভব রকম বড় অঙ্ক। আমি মোটামুটি নিশ্চিত যে কাজের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আমাদের যেতে হয়েছে, তা যদি আগে বোঝা যেত তাহলে অনেকে কাজ করতেই রাজি হতো না; কিন্তু আজ ৫০ বছর পরে এসে মনে হয় আমরা সফল। এখনো নভোচারীদের সঙ্গে দেখা হলে অনেকেই যখন বলে চলচ্চিত্রটি দেখেই তারা জ্যোতিঃপদার্থবিদ্যায় আগ্রহী হয়েছে, তখন গর্ববোধ করি। 

২৩ বছর বয়সেই স্ট্যানলি কুব্রিক আমাকে সবচেয়ে কঠিন কাজগুলো দিতেন। আমি কখনো স্পেসশিপ নকশা করতাম, কখনো শাটল বানাতাম, কখনো মহাকাশের ল্যান্ডস্কেপ তৈরি করতাম। নাসার অনেক বিজ্ঞানীর মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় উপদেষ্টা ছিলেন হ্যারি লাঞ্জ। তিনি প্রখ্যাত নািস বিজ্ঞানী ওয়ার্নাল ফন ব্রাউনের সহকারী হিসেবেও কাজ করেছেন।

যেহেতু সে সময়ে কম্পিউটারের কাজ খুবই সীমিত ছিল তাই বেশির ভাগ কাজই আমাদের করতে হতো ৭০ এমএম ক্যামেরার সামনে। সে জন্য সেট ও সিনেমাটোগ্রাফির কাজ হতে হতো একদম নিখুঁত। ছবির শেষ কী হবে তা নিয়ে কুব্রিকের খুঁতখুঁতানির জন্য কাজটা হয়ে উঠেছিল ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। এমনকি তিনি কম্পিউটার কম্পানি আইবিএমকে অনুরোধ করেছিলেন নির্মাণে সহায়তার জন্য একটি নতুন ধরনের অ্যালগোরিদম তৈরি করতে। কিছুদিন চেষ্টা করে আইবিএমও কুব্রিকের চাহিদার কাছে হার মানে। আমাকে শুরুতে নয়, মাসের জন্য চুক্তিবদ্ধ করা হলেও শেষ করতে আড়াই বছর লেগে গিয়েছিল। কুব্রিক সব সময়েই তাঁর কলাকুশলীদের স্বার্থ রক্ষার্থে কাজ করতেন। একপর্যায়ে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে বলা হয় তাড়াতাড়ি শেষ করতে, নয়তো কাজটি আরো অনেক সময় ধরেই করতেন কুব্রিক, হতো আরো নিখুঁত।



মন্তব্য