kalerkantho


শিল-পাটায় ঘষাঘষি প্রাণ যায় মরিচের

১২ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



শিল-পাটায় ঘষাঘষি প্রাণ যায় মরিচের

শাকিব-বুবলি

মাহিয়া মাহির সঙ্গে টানা কাজ করছেন সাইমন। অন্যদিকে বাপ্পীর হয়েছে নায়িকা সংকট। শাকিব খানের বিপরীতে চুক্তিবদ্ধ হয়েও বাদ পড়েছেন বিদ্যা সিনহা মিম, মিষ্টি জান্নাত, রাহা তানহা খান ও তানহা মৌমাছি। আরিফিন শুভও চান পছন্দমতো নায়িকা। মাঝখানে বিপদে পড়ছেন নির্মাতারা। তারকাদের রেষারেষির কারণে আটকে গেছে বেশ কিছু ছবি। লিখেছেন সুদীপ কুমার দীপ

 

২০১৪ সাল। শাহাদাৎ হোসেন লিটনের ছবি ‘লাভ স্টেশন’-এ জুটি বাঁধলেন বাপ্পী চৌধুরী ও মিষ্টি জান্নাত। শুটিং করতে গিয়ে একসময় তাঁরা আপনি থেকে তুমি, তুমি থেকে তুইতে নামলেন। ছবিটি মুক্তির পর দুজনকে নিয়ে ভাবতে শুরু করলেন নির্মাতারা। কিন্তু হুট করে কী যে হয়ে গেল, তাঁরা আর একসঙ্গে অভিনয় করতে চাইলেন না! জান্নাত প্রযোজিত ‘তুই আমার’-এ বাপ্পীর অভিনয় করার কথা থাকলেও করলেন সাইমন। মুক্তির সময় বাধল আরেক ঝামেলা। সাইমনকে কোনোভাবেই ছবির প্রচারণায় আনতে পারলেন না প্রযোজক জান্নাত। শুধু তাই নয়, মুস্তাফিজুর রহমান মানিকের ‘জান্নাত’-এ সাইমনের বিপরীতে অভিনয় করার কথা ছিল জান্নাতের, করলেন মাহিয়া মাহি। কেন? ঘটনাটা পরিষ্কার করলেন জান্নাত নিজেই। বললেন, ‘সাইমনকে আমার ব্যাপারে হয়তো কেউ ভুল বুঝিয়েছে। এত দিনে আমাদের অন্তত পাঁচটি ছবি মুক্তি পেয়ে যেত। কিন্তু একটিও হলো না। প্রযোজক-পরিচালকরা আমাদের এক করতে না পেরে ফিরে গেছেন। ব্যক্তিগত এসব রেষারেষির কারণে ক্ষতিটা কিন্তু হলো চলচ্চিত্রেরই। আমরা একসঙ্গে কাজ করলে ২০ জন টেকনিশিয়ান কাজ পেতেন। ভালো থাকত তাঁদের পরিবার।’

জান্নাতের কথার সত্যতা মিলল ৩১ মার্চ। সেদিন পরিচালক মিনহাজ অভি তাঁর দ্বিতীয় ছবি ‘মন পবনের নাও’-এর জন্য সাইমন আর মিষ্টি জান্নাতকে জুটি করার সিদ্ধান্ত নিলেন। জান্নাত রাজি, প্রস্তাব নিয়ে গেলেন সাইমনের কাছে। সিদ্ধান্ত নিলেন ২ এপ্রিল দুজনকে চুক্তিবদ্ধ করবেন। কিন্তু না, সাইমন এই মুহূর্তে ছবিটি করতে চান না বলে সাফ সাফ জানিয়ে দিলেন। কারণ জানতে চাইলে সাইমন বললেন, “সামনে মাহির সঙ্গে ‘জান্নাত’ মুক্তি পাবে। আমাদের প্রথম ছবি ‘পোড়ামন’ সুপারহিট। দীর্ঘদিন পর আবার পর্দায় হাজির হচ্ছি আমরা। সবাই আগ্রহ নিয়ে আছে। এর মধ্যে আরেকজন নায়িকার সঙ্গে কাজ করলে যদি ছবিটির ব্যবসায় কোনো প্রভাব পড়ে! শুধু শুধু ঝুঁকি নিতে চাই না।”

ব্যক্তিগত রেষারেষির কারণে সবচেয়ে বেশি ছবি বাদ দিয়েছেন শাকিব খান। অপু বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে একসময় শাবনূর-পূর্ণিমা-পপির সঙ্গে একের পর এক ছবির প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন। সেই অপু বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হলে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করেন তিনি। ‘বসগিরি’, ‘রংবাজ’, ‘শ্যুটার’ ও ‘অহংকার’—চারটি ছবিতেই রাতারাতি অপুর বদলে যুক্ত হলেন শবনম বুবলি। এমনকি অপুকে সঙ্গে নিয়ে প্রায় পুরো ছবির শুটিং করেছেন এমন কয়েকটি ছবিও আছে আটকে—‘মাই ডার্লিং’, ‘পাঙ্কু জামাই’, ‘লাভ ২০১৪’ ও ‘মা’। ছবিগুলোর ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত।

শাকিব-অপু-বুবলি দ্বন্দ্বের পরও থেমে নেই রেষারেষি। শাপলা মিডিয়ার দুটি ছবিতে শাকিব খানের বিপরীতে অভিনয়ের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন বিদ্যা সিনহা মিম। প্রথম ছবি ‘আমি নেতা হব’ মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু এই প্রযোজনা সংস্থার আর কোনো ছবিতে মিমকে দেখা যাবে কি না সন্দেহ। ‘ক্যাপ্টেন খান’-এ এখন মিমের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন শবনম বুবলি। এই প্রযোজনা সংস্থার আরো কয়েকটি ছবিতে শাকিবের বিপরীতে চুক্তিবদ্ধ হন মিষ্টি জান্নাত, তানহা মৌমাছি ও রাহা তানহা খান। তাঁদের কেউই শেষ পর্যন্ত শাকিবের নায়িকা হতে পারবেন বলে মনে করছে না সংশ্লিষ্টরা। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানটির নির্মিতব্য ছবি ‘আমার স্বপ্ন আমার দেশ’, ‘চিটাগাইঙ্গা পোয়া নোয়াখাইল্লা মাইয়া’ ও ‘গার্লফ্রেন্ড’ ছবিগুলোতে তাঁদের অভিনয় করার কথা থাকলেও এখন করছেন বুবলি, শ্রাবন্তী চ্যাটার্জি ও শুভশ্রী গাঙ্গুলী। শাপলা মিডিয়ার উপদেষ্টা ও পরিচালক উত্তম আকাশ বলেন, ‘শাকিবের ভক্ত এখন বাংলাদেশ ও কলকাতা জুড়ে। তিনি ভক্তদের কথা মাথায় রেখে অনুরোধ করেছেন তাঁর বিপরীতে আমরা যেন ভেবেচিন্তে কাস্টিং করি। আর এখন ছবিগুলোতে যে নায়িকারা কাজ করছেন তাঁদের নেওয়া হয়েছে শাকিবের কথাতেই।’

শাকিবের এমন সিদ্ধান্তের শিকার হয়েছেন অনেক নবাগত নায়িকাও। ২০১৬ সালে বদিউল আলম খোকন একটি ছবিতে শাকিবের বিপরীতে চুক্তিবদ্ধ করেন নবাগত ছোঁয়াকে। শাকিবের শিডিউল নেওয়ার পর সংগীত পরিচালক, নৃত্য পরিচালক, মারপিট পরিচালকসহ অন্য কলাকুশলীদেরও চুক্তিবদ্ধ করেন। কিন্তু শুটিংয়ের ঠিক আগ মুহূর্তে খোকনকে শাকিব জানান, ছবিটি তিনি করছেন না। শাকিবকে বোঝাতে ব্যর্থ হন খোকন। শেষমেশ ছবিটিই আর হয়নি। এই ছবির কারণেই শাকিব-খোকন জুটির দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব নষ্ট। ‘প্রিয়া আমার প্রিয়া’, ‘নাম্বার ওয়ান শাকিব খান’, ‘মাই নেম ইজ খান’, ‘হিরো দ্য সুপারস্টার’-এর মতো হিট ছবি উপহার দেওয়া এই নায়ক-পরিচালক জুটির সম্পর্ক এখন দা-কুমড়ার মতো।

অভিযোগ উঠেছে মাহিয়া মাহির বিপক্ষেও। আর সেই অভিযোগের আঙুল তুলেছেন পরিচালক জুটি শাহীন-সুমনের একজন ওয়াজেদ আলী সুমন, যাঁর ছবি দিয়ে অভিষিক্ত হয়েছিলেন মাহি। ‘ফালতু’ ছবিতে চুক্তিবদ্ধ করেন মাহিকে। তাঁর বিপরীতে নেওয়া হয় মোশাররফ করিমকে। মাঝপথে এসে ছবিটি করবেন না বলে পরিচালককে জানিয়ে দেন মাহি। কেন? কারণ কিছুই বলেননি। শুধু পারিশ্রমিক ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। সুমন বলেন, ‘জানি না, মাহি কেন এমন করল। যদি সে ছবিটি করতে রাজি হতো তাহলে এত দিন শুটিং শেষ করে মুক্তি দিতে পারতাম। বাণিজ্যিক ছবিতে অভিষেক ঘটত মোশাররফ করিমের। হয়তো ইন্ডাস্ট্রি একটা ব্যবসাসফল ছবিও পেত।’

অভিযোগ উঠেছে, প্রথম ছবির নায়ক বাপ্পীর সঙ্গেও এখন অভিনয় করতে চান না মাহি। এ বিষয়ে বাপ্পীর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে মাহি বলেন, ‘আমি তো নতুনদের সঙ্গেও কাজ করছি। কে আমার বিপরীতে অভিনয় করবেন সেটার চেয়ে গল্পটা কী, আমার চরিত্রটা কেমন—সেটা নিয়েই আমার যত মাথাব্যথা। হয়তো এমন হতে পারে, কেউ বাপ্পীর বিপরীতে অভিনয়ের জন্য আমার কাছে প্রস্তাব এনেছেন, কিন্তু গল্প পছন্দ হয়নি। তখন বাজারে ছড়িয়েছেন আমি বাপ্পীর সঙ্গে অভিনয় করব না।’ তবে মাহির এই কথা ধোপে টেকে না। কারণ এই সপ্তাহে মুক্তি পাওয়া ‘পলকে পলকে তোমাকে চাই’-এর নায়ক-নায়িকা বাপ্পী-মাহি। ছবিটি নিয়ে সংবাদমাধ্যমে মাহি বলেছেন, ‘এ রকম একটা ছবিতে আমি কাজ করেছি, এ জন্য আফসোস হচ্ছে।’ তার মানে ছবিটি করার সময় তিনি চিত্রনাট্য দেখেননি! একটা সময় জাজ মাল্টিমিডিয়া ঘোষণা দিয়েছিল ‘পোড়ামন’ নায়ক সাইমনের সঙ্গে আর অভিনয় করবেন না মাহি। এখন মাহির হাতে থাকা বেশির ভাগ ছবির নায়কই সাইমন।

রেষারেষির তালিকা থেকে বাদ পড়েননি আরিফিন শুভও। তাঁর কারণে সিনিয়র অনেক পরিচালকের ছবি আটকে আছে। বললেন উত্তম আকাশই, ‘আমার প্রযোজক প্রস্তুত। শুভর সঙ্গে বৈঠক করলাম ধানমণ্ডির এক রেস্টুরেন্টে। গল্প শুনল, সম্মতিও দিল। পরে শুনি কাজটি করতে আগ্রহী নয়। ছবিটি থেকে আমাকে বাদ দিয়ে অন্য পরিচালককে চায়। নায়িকাও নিতে হবে তার পছন্দমতো। এটা কেমন কথা! আমিই প্রযোজক জোগাড় করলাম অথচ আমাকেই কি না বাদ দিতে চায়! শুধু শুভর কারণে আর ছবিটি হয়নি। প্রযোজকও ফিরে গেলেন।’

ছবির নির্মাণ দিন দিন কমে যাচ্ছে। অথচ ব্যক্তি রেষারেষির কারণে আটকে যাচ্ছে একের পর এক ছবি। বিষয়টি নিয়ে কথা হলো অভিনেতা ফারুকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমাদের সময় রাজ্জাক, আলমগীর, সোহেল রানা, উজ্জল, আমিসহ সবাই সবার সঙ্গে অভিনয় করতাম। অথচ এখন শুনি কে কার সঙ্গে অভিনয় করবে সেটা নিয়েও ঝামেলা। খুব শিগগির এই অবস্থার অবসান হওয়া দরকার। নইলে ছবি নির্মাণ আরো কমে যাবে।’



মন্তব্য