kalerkantho


‘যা পেয়েছি তাতেই খুশি’

১ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



‘যা পেয়েছি তাতেই খুশি’

৫০ বছরে ৩০০ চলচ্চিত্র—সত্যিই একসমুদ্র অভিজ্ঞতা শ্রীদেবীর। দক্ষিণের সিনেমাজগৎ জয়ের পর রাজত্ব করেছেন হিন্দি সিনেমায়, হয়ে উঠেছেন পুরো ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিনেত্রী। আশি ও নব্বইয়ের দশকে শুধু তাঁর নামেই ছবি চলত। ২০১৭ সালের জুন মাসে নিজের সর্বশেষ মুক্তি পাওয়া ছবি ‘মম’র প্রচারণায় কলকাতা এসেছিলেন অভিনেত্রী। সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন পরিচালক অরিন্দম শীল ও সাংবাদিক গৌতম ভট্টাচার্যকে। শ্রীদেবীর প্রয়াণ উপলক্ষে ‘সংবাদ প্রতিদিন’-এর সেই সাক্ষাৎকারটির নির্বাচিত অংশ প্রকাশ করা হলো

 

খুব সাধারণভাবে সবার সঙ্গে বড় হয়েছি। আমাদের কাজের জায়গাটা আমাদের কাজের জায়গায়। কিন্তু তার বাইরে আমরা সবাই সাধারণ মানুষ। আমি তো আমার সন্তানদের জন্য বাজারে গিয়ে নিজে মাছ কিনি। আমি আমার সন্তানদের শরীর নিয়ে বেশি চিন্তিত। তাই ভালো মাছ নিজে কিনে আনি।

 

এখন তো এত প্রমোশন, এত ইন্টারভিউ। আগে তো এত সব করতে হতো না।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতেই হয়। তখন ছবি রিলিজের আগে দু-তিনটি ইন্টারভিউ। কিন্তু এখন তো সবটাই বদলে গেছে।

 

কিন্তু এই যে এত বেশি মানুষের সান্নিধ্যে আসা, এত প্রমোশন—এতে কোথাও সেই মহাতারার ম্যাজিকটা নষ্ট হয় না?

মানুষের সঙ্গে এখন কমিউনিকেট করতে হয়। দর্শকদের কাছে পৌঁছতে হয় নিজের ছবি নিয়ে। সেটাই প্রমোশনের রীতি। তবে আমি একটা জিনিসে বিশ্বাস করি, ছবিটা কিন্তু ভালো হতেই হবে। মানুষকে যে এখন জানাতে হয় যে এ রকম একটা ছবি রিলিজ হচ্ছে।

 

কিন্তু ‘মিস্টার ইন্ডিয়া’ বা ‘লামহে’র মতো ছবির তো  প্রমোশনের দরকার হতো না।

এই যে বললাম সময় বদলে গেছে। এখন তো নেটের যুগ।

 

আপনি কি খুব প্রযুক্তিপ্রিয়? টুইটারেও বিশেষ অ্যাকটিভ নন।

না, খুব বেশি নয়। আমি মোবাইল শুধু ফোন করার জন্য ব্যবহার করি। আর কিছুই পারি না।

 

কোন সময়টা আপনার বেশি ভালো লাগে? এখন, না তখন?

সেই সময় একটা সরলতা ছিল। একটু ধীরগতিতে সব কিছু হতো। কিন্তু এখন সবাই ভীষণ প্রফেশনাল। আমার এই সময়টা বেশ ভালো লাগছে। এখন একটা ছবি তৈরি হচ্ছে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর।

 

তার মানে কি আপনি বলতে চাইছেন, আগের দিনে লোকজন কম প্রফেশনাল ছিল?

না না, আমি সে কথা বলছি না। আসলে এখন প্রত্যেকটা ডিপার্টমেন্ট খুব পরিষ্কার তাদের কাজ নিয়ে। প্রত্যেকের কাজ সেই ডিপার্টমেন্ট অনুযায়ী ভাগ করা থাকে। অনেক বেশি স্পেশালাইজড। তখন মনিটর ছিল না, এখন সব কিছু দেখে নেওয়া যায়।

 

ফিল্মের রোল করার সেই ঘরঘর আওয়াজ থেকে এখন নিশ্চুপ ডিজিটাল...

এখন আর আগের মতো এই এত রোল চলে যাচ্ছে বলে অ্যার্টিস্ট কনশাস হয়ে যায় না। এখন তো সেই টেনশন নেই। যতক্ষণ না শট ঠিক হচ্ছে, আমরা চেষ্টা করতেই থাকি। কত সময় নষ্ট হতো তখন রোল বদলাতে, ডাবিং করতে...কনটিনিউইটি লেখা হতো। এখন হয় না।

 

এখন তো শিল্পীরা নিজেদের শট মনিটরে গিয়ে চেক করতে পারে।

ঠিক। অথচ সেই সময় তো অনেকটাই ইন্দ্রিয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিলাম আমরা। আমরা এখন ভ্যানিটি ভ্যান পাই। তখন তো গাছের পেছনে গিয়ে পোশাক বদলাতে হতো।

 

আপনি গাছের পেছনে পোশাক বদল করেছেন?

ওটা কথার কথা বলছি, কিন্তু ব্যাপারটা তো প্রায় সে রকমই ছিল। কারো বাড়ি গিয়ে অনুরোধ করতে হতো...এখন তো লাক্সারি ভ্যান। তাই বলে বলছি না পুরনো দিনগুলো খারাপ ছিল। কিন্তু  সুবিধা এখন অনেক বেশি ভালো।

 

আচ্ছা, সারা ভারতবর্ষের মানুষ যে সময় আপনার জন্য পাগল ছিল, পুরুষদের এত অ্যাটেনশন আপনি সামলাতেন কিভাবে?

(হেসে ফেললেন) না না, কাকে কত দূরে রাখতে হবে সেই মাপটা জানা দরকার। আর কিছুই না।

 

আপনি ভারতবর্ষের প্রথম সুপারস্টার অভিনেত্রী...

আমি কী বলব বলুন। আমি কৃতজ্ঞ আমার ডিরেক্টর ও প্রযোজকদের প্রতি, যাঁরা আমার ওপর বিশ্বাস রেখেছেন। এত ভালো চরিত্র দিয়েছেন।

 

আচ্ছা, যখন আপনার ‘চাঁদনি’, ‘লামহে’ বা ‘মিস্টার ইন্ডিয়া’ টেলিভিশনে দেখে মানুষ আজও আপ্লুত  হয়ে এসব কথা বলে আপনাকে, তখন কেমন লাগে?

আমি আপ্লুত হয়ে যাই। এত ভালোবাসা, এই ইনস্টাগ্রাম, টুইটারে মানুষের এত শুভেচ্ছা...আমার আরো কাজ করতে ইচ্ছা করে।

 

প্রিয়াঙ্কা বা দীপিকারা হলিউডে গিয়ে কাজ করছেন, তখন আপনার খারাপ লাগে না যে আপনি সারা ভারত জয় করেছেন। এখনকার মতো সুযোগ পেলে আপনিও ওঁদের মতো...

আমি দক্ষিণ থেকে বোম্বে পৌঁছেছি লাস্ট। সেটাই অনেক লম্বা একটা জার্নি। অনেক কঠিন।

 

আপনি আপনার মেয়েকে তৈরি করছেন অভিনেত্রী হওয়ার জন্য...

না না, ও নিজেই তৈরি হচ্ছে। আমি তৈরি করছি বলাটা ভুল হবে।

 

আপনি কী গাইডেন্স দিচ্ছেন ওকে?

ও খুব সেন্সিবল মেয়ে। ওর কাজের প্রতি খুব প্যাশনেট।

 

কিন্তু এই ইন্ডাস্ট্রিতে পা রাখার আগে আপনি ওকে কিছু বলেছেন?

আমি আসলে একটু ভীতই ছিলাম। জানি এই ইন্ডাস্ট্রি কত কঠিন, কত ত্যাগ করতে হয়। জ্বর, শরীর খারাপ—সব নিয়েও কাজ করতে হবে...আমরা যা করেছি কাজের জন্য করেছি, মন থেকে মেনে নিয়ে করেছি। কিন্তু যখন মনে হয় নিজের সন্তানকেও সেই কষ্টটা করতে হবে, তখন মন মানতে চায় না। আমি চাই, ও ইনডিপেনডেন্ট হোক।

 

কালই পড়ছিলাম, এক বিখ্যাত পরিচালক বলেছেন, ‘বাহুবলি’তে আপনাকে কাস্ট করতে পারেননি আপনার চাহিদার জন্য।

আমি সেটার ব্যাখ্যা দিয়েছি।

 

৩০০টি ছবি এবং ৫০ বছর সিনেমাজগতে থাকার পর যখন কেউ আপনার সম্পর্কে এমন কথা বলে, তখন খারাপ লাগে না?

না না, সবাই এ রকম নয়। হয়তো প্রযোজক ডিরেক্টরকে ভুল বুঝিয়েছে। আমি এ নিয়ে কথা বলতে চাইনি। এটা আমার রুচি নয়।

 

আপনার তো একসমুদ্র অভিজ্ঞতা। সেই অভিজ্ঞতা, সেই স্মৃতি ধরে রাখতেই ইচ্ছা করে না? কোনো আত্মকথা...

আমি কখনো ভাবিনি। আমার কথা তো সবাই জানে। বিশেষত্ব আর কী এমন আছে?

 

আপনি নিজেকে কিভাবে সামলাতেন, যখন আপনার এত নামডাক?

আমরা খুব সাধারণ পরিবার থেকে এসেছি। খুব সাধারণভাবে সবার সঙ্গে বড় হয়েছি। আমাদের কাজের জায়গাটা আমাদের কাজের জায়গায়। কিন্তু তার বাইরে আমরা সবাই সাধারণ মানুষ। আমি তো আমার সন্তানদের জন্য বাজারে গিয়ে নিজে মাছ কিনি। আমি আমার সন্তানদের শরীর নিয়ে বেশি চিন্তিত। তাই ভালো মাছ নিজে কিনে আনি।

 

আপনি নিজে রাঁধেন?

না, আমি রান্না একেবারে পারি না। জীবনে কখনো সময় পাইনি রান্নাঘরে গিয়ে রান্না করার।

 

আপনার মতো একজন বিশাল মাপের অভিনেত্রী সাধারণ জীবন যাপন কী করে পারে? ইচ্ছা করলে যে বাজারে চলে যান, এটা কী করে সম্ভব?

কেন নয়। আমি এইভাবেই বড় হয়েছি। আমি যখন ক্যারিয়ারের শীর্ষে, তখনো আমার মা আমাকে খুব সাধারণভাবেই দেখতেন। আমরা বাড়িতে পূজা করতাম। আমরা বোনেরা সবাই একসঙ্গে মজা করে বড় হয়েছি। মাটিতে ঢালাও বিছানা পেতে শুয়েছি। আমাকে কখনো আমার মা-বাবা আলাদাভাবে দেখতেন না। আমাদের পরিবারে সবাই এক।

 

সেই ‘চাঁদনি’র সময়ও?

আমার তো ৬টা বাজল কি শুটিং শেষ, আর বাড়ি। একেবারে স্কুলের ছুটি।

 

বাঙালিরা তো মাছ খুব ভালোবাসে। বাঙালি সম্পর্কে আপনার কী ধারণা?

আমার মেয়ের দেখাশোনা যিনি করতেন, তিনি বাঙালি। তিনি মাছের ঝোল খুব ভালো রাঁধতেন।

 

আচ্ছা, আপনি কি নতুন ডিরেক্টরদের সঙ্গে কাজ করতে বেশি আগ্রহী এখন?

গল্প ভালো লেগেছে বলে কাজ করেছি। গৌরীকে [‘ইংলিশ ভিংলিশ’ পরিচালক] খুব ভালো লেগেছিল। ডিরেক্টরকে সেন্সিবল হতে হবে।

 

এখন তো মানুষকে সুন্দর করার কত উপকরণ! প্রাণায়াম থেকে কত উপদেশ কত রকমের! আপনি কিভাবে খুশি থাকেন?

পজিটিভ অ্যাটমসফিয়ারে থাকা, প্রকৃতির সঙ্গে থাকা আমি খুব ভালোবাসি। আর পেইন্টিং করতে ভালোবাসি।

 

আপনি ছবিও আঁকেন!

হ্যাঁ। ছবি সংগ্রহও করি। আমার আঁকা একটা ছবি ক্রিস্টিজে ৫০ হাজার ডলারে বিক্রি হয়েছে।

 

আজকের অভিনেত্রী যে এত মিডিয়া অ্যাডিউলেশন পায়, তখন এতটা হতো না। কখনো মনে হয় না যে এগুলো পেলে ভালো হতো?

যা পেয়েছি তাতেই খুশি। বাবা আইনজীবী ছিলেন। মা গৃহবধূ। আমি অনেক কিছু পেয়েছি।


মন্তব্য