kalerkantho


ঢাকার বাইরে

‘আমার গান আমি গাইলে মুরশিদের গান গাইবে কে’

১ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



‘আমার গান আমি গাইলে মুরশিদের গান গাইবে কে’

তাঁর বড় পরিচয় তিনি বাউল শাহ আবদুল করিমের শিষ্য। এই বাউলশিল্পী নিজেও গান লেখেন। পাঁচ শর মতো গান লিখেছেন। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে তাঁর ব্যাপক খ্যাতি। বাউল আবদুর রহমানকে নিয়ে লিখেছেন কালের কণ্ঠ’র সিলেট ব্যুরো প্রধান আহমেদ নূর

 

কিছুদিন আগেই তাঁর ডাক পড়েছিল বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত মেলায় গান করার। আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন লেখক ও স্থপতি শাকুর মজিদের মাধ্যমে। সেখানে মূল সুরে বাউল শাহ আবদুল করিমের গান গেয়ে শ্রোতাদের বিমোহিত করেন। পাশাপাশি গাইলেন শেখ ভানুর গান, গাইলেন নিজের লেখা গানও। তবে দুই বছর আগে ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে ফোক ফেস্টে করিমের গান গাইতে পারাটাই তাঁকে সবচেয়ে বেশি আলোড়িত করে। আবদুর রহমানের ভাষায়, ‘ফোক ফেস্ট এখটা সাংঘাতিক বেফার। আট দেশর শিল্পীরা তারার কালচার লইয়া আইছলা ইকানও।’ করিমের সবচেয়ে কাছের শিষ্য হওয়াতেই এমন বড় মঞ্চে গাওয়ার সুযোগ হয়েছে বলে মনে করেন তিনি, ‘শাহ আবদুল করিমের সঙ্গ নেওয়ার প্রতিদান পাইলাম ইকানও। ইটা আমার জীবনের মস্তবড় পাওয়া। আমার গান গাওয়া সার্থক অইছে।’ ফোক ফেস্টে শাহ আবদুল করিমের মূল সুরে চারটি গান গেয়েছিলেন—‘মন মজালে ওরে বাউলা গান’, ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’, ‘মাটিরও পিঞ্জিরায় সোনার ময়নারে’ এবং ‘বন্দে মায়া লাগাইছে’। প্রথমে শঙ্কা ছিল পরিবর্তিত সুরে অভ্যস্ত নাগরিক শ্রোতারা মূল সুরের গান কিভাবে নেবে? দর্শকরা মন্ত্রমুগ্ধ হলো, আরো শুনতে চাইল, কিন্তু সময়বাঁধা অনুষ্ঠানে সেই সুযোগ ছিল না।

জন্ম হবিগঞ্জ জেলার আজমিরিগঞ্জের জলসুখা গ্রামে ১০ মে, ১৯৫৫। বাবা একরাম হোসেন ছিলেন সংস্কৃতমনা। পুঁথি পাঠে সুনাম ছিল আশপাশের পাঁচ-সাত গ্রামের মধ্যে। নিয়মিত ডাক পড়ত মাহফিলে। যদিও বাবার এসব কর্ম বোঝার বয়স হওয়ার আগেই [মাত্র পাঁচ বছর বয়সে] বাবাহারা হন আবদুর রহমান। কিন্তু রক্তের টান বলে কথা। চতুর্থ শ্রেণিতে ওঠার আগেই গানে মজে যান। শুরু করেন স্কুল ফাঁকি দেওয়া। একমাত্র সন্তানকে শিক্ষিত করে তুলতে প্রাণান্ত চেষ্টা করে যান মা হাজেরা বিবি। মায়ের জোর চেষ্টায় দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েন রহমান। এলাকায় গানের আসরে গিয়ে আর গ্রামের একমাত্র রেডিওতে আব্দুল আলীম, আব্বাসউদ্দীন, মুর্শেদ আলী শাহীর গান শুনে আত্মস্থ করতে থাকেন। নিজে নিজেই গাইতেন। একদিন গ্রামের একজন একটা একতারা নিয়ে রাস্তার ধারে বাজাচ্ছিলেন। কয়েকজন জড়ো হয়ে শুনছিলেন। আবদুর রহমানকে দেখে একজন বললেন, এই একটা গান গাও তো। তিনি সঙ্গে সঙ্গে গাইলেন, ‘কে যাও মদিনার পথে ওহে মুসাফির।’ শুনে সবাই অবাক! একজন বললেন, ‘এইটা কে রে?’ আরেকজন জবাব দিলেন, ‘একরাম ভাইয়ের ছেলে।’ প্রশ্নকারীর মন্তব্য, ‘তাহলে তো এমন গাইবেই। রক্তে যে গান মেশানো।’

আজমিরিগঞ্জে প্রায়ই আসতেন শাহ আবদুল করিম। গ্রামের করিমভক্ত খরান (আজিজুর রহমান) একদিন বললেন, ‘তোমার লেখাপড়া আছে, গানও গাইতে পারো, আবদুল করিমের সঙ্গে চলে যাও। শিখতে পারবে।’ আজিজুর রহমানই আরেক দিন বললেন, ‘বাবা তো এসেছেন। কালকে বড় মাহফিল আছে। আমার সঙ্গে চলো।’ সেখানে করিমকে প্রথম গান শোনানোর সুযোগ পেলেন রহমান। করিমেরই গান ‘কে যাও মদিনার পথে ওহে মুসাফির/মোদের কেউ নাইরে...’ শুনে তাঁর প্রতি কিছুটা আগ্রহী হলেন করিম। শর্ত দিলেন, গান শিখতে হলে সঙ্গে যেতে হবে। রহমান রাজি। কিন্তু একমাত্র ছেলেকে ছাড়তে চাইলেন না মা। মাকে যতক্ষণে বোঝাতে সক্ষম হলেন ততক্ষণে চলে গেছেন করিম। আরো কিছুদিন পর তিনি সুনামগঞ্জের ধল গ্রামে গেলেন করিমের কাছে।

করিমের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ৩৬ বছর তিনি কাটিয়ে দেন তাঁর সান্নিধ্যে। করিমের সাহচর্যে তাঁর সব গান আত্মস্থ করতে লাগলেন। ধল গ্রামের শিক্ষক দেবেন্দ্র কুমার করিমের গানগুলো এত দিন লিপিবদ্ধ করে আসছিলেন। এবার সেই দায়িত্ব পড়ল রহমানের কাঁধে। করিমের সান্নিধ্যে যাওয়ার আগেই দুটি গান লিখেছিলেন আবদুর রহমান। করিমের সঙ্গ পেয়ে সংখ্যাটা বাড়তে থাকল। এরই মধ্যে নিজের এলাকায় রহমানের সুনাম ছড়িয়েছে। বাড়িতে বেড়াতে গেলে ডাক পড়ত মাহফিলে গাওয়ার। সেখানে তিনি করিমের গান গাইতেন, সঙ্গে নিজের লেখা দুই-একটা গানও। পরবর্তী সময়ে করিমের সঙ্গে অনুষ্ঠানে গেলে মাঝেমধ্যে করিম নিজে থেকে বলতেন, ‘তোমার বান্দা একটা গান গাইলাও ব্যাটা।’

এ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ শ গান রচনা করেছেন। নিজের গান নিজে কম গান। তাঁর কথায়, ‘আমার গান আমি গাইলে মুরশিদের গান কে গাইবে। আমি তাঁর গান গাই। আমার গান গাইবে শিষ্যরা।’ বেঁচে থাকতেই তিনি আবদুল করিমের সব গান মূল সুরে রেকর্ড করে যেতে চান। তাঁর মতে, ‘করিম যে সুরে গানগুলো গাইতেন, তা একমাত্র আমিই জানি।’

আবদুর রহমানের শিষ্যরা এখন তাঁর গান গাইছেন। অন্য অনেক বাউল শিল্পীও গেয়েছেন। বাউল কালা মিয়া ও সিরাজ উদ্দিনের সিডিও বেরিয়েছে তাঁর লেখা গানে। এ ছাড়া তাঁর শিষ্য সৌভাগ্য দেবী, শাহানুর ইসলাম, রুবেল সরকার, লিংকন দাসরা গাইছেন আবদুর রহমানের গান। তাঁর লেখা ‘দেহের ভেতর অচিন পাখি আছে কিভাবে’, ‘আমি প্রাণবন্ধুর কাঙ্গালিনী/বন্ধুরে আনিয়া দে রে সজনী’, ‘কথা দিয়া যাওরে বন্ধু আসিবায়/না আসিলে অভাগিনীরে প্রাণে মারিবায়’, ‘আমার ঘরে প্রাণবন্ধুর ঠিকানা, স্বভাবের দোষে আমি বন্ধুরে দেখিতে পাই না’—এমন অসংখ্য গান শ্রোতাপ্রিয় হয়েছে।

১৯৮২ সালে নিজ গ্রামের সাজেদা আক্তারকে বিয়ে করে সংসারী হন। নানা অনটনের মধ্যেও চার ছেলে, দুই মেয়েকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে যেতে চান। তাঁর কথায়, ‘আমি তো দোকানদারি গান করিনি কখনো। সন্তানদের জন্য তাই কোনো সম্পদ রেখে যাওয়া সম্ভব হবে না। শিক্ষিত করে যেতে পারলে তারা সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবে।’ পড়াশোনার পাশাপাশি দ্বিতীয় ছেলে আশিকুর রহমান বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করছে।

শাহ আবদুল করিমের উপদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করার চেষ্টা করেন রহমান। রাজধানী তাঁকে বারবার ডেকেছে। গেলে হয়তো আর্থিক সচ্ছলতা ফিরত। কিন্তু গুরু আবদুল করিম চাইতেন না বলে সেদিকে কোনো দিন পা বাড়াননি, ‘বাবা বলতেন, যত উছাত গিয়া উঠবে তোর চোখটাও তত উছাত যাইব। তুই যদি ভাঙা ঘরে ঘুমাছ তো ভাঙা ঘরের ভাবটা তোর অন্তরের মধ্যে থাকব।’ সেই ভাবটা লালন করতে আবদুর রহমান প্রাণান্ত চেষ্টা করে যাচ্ছেন এখনো। গুরুর উপদেশ ছিল, যেকোনো জায়গায় গান গাইতে গেলে অন্তত একটা দেশের গান গাওয়ার। সেটাও করার চেষ্টা করেন। যখন গানের ক্যাসেটের জয়জয়কার তখন তাঁরও ইচ্ছা হয়েছিল নিজের একটা ক্যাসেট বের করার। সেই ইচ্ছার কথা জানিয়েও ছিলেন। করিম সায় দেননি। একবার বলেছিলেন, ‘ক্যাসেট দিয়ে কী হবে, তুমি নিজেই তো ক্যাসেট।’ এরপর আর সেই চিন্তা করেননি রহমান।

তবে রাজধানীমুখী না হলেও দেশের বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের সরাসরি গানের অনুষ্ঠানে গেয়েছেন। ভারতের কলকাতা, শিলচরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে আমন্ত্রণ পেয়ে বেশ কয়েকবার গান গেয়ে এসেছেন।

শাহ আবদুল করিম সব সময় মানবতাবোধ, অসাম্প্রদায়িক সমাজ নির্মাণের জন্য গান লিখেছেন, গেয়েছেন। সেই বোধের বীজ তাঁর মধ্যেও বপন করে গেছেন বলে মনে করেন বাউল আবদুর রহমান, ‘গানই পারে মানুষের মন থেকে হিংসা-বিদ্বেষ মুছে দিতে। আমার গান যারা শুনেছে তারা অন্তত বিপথগামী হয়নি।’


‘সিলেট অঞ্চলের অন্যতম প্রধান বাউল আবদুর রহমান। শাহ আবদুল করিমের সাধনসঙ্গী হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। বাউল ধারার চিন্তা-চেতনা তিনি লালন করেন এবং ধারণ করেন।’

আমিরুল ইসলাম চৌধুরী বাবু

সভাপতি, সিলেট নজরুল একাডেমি

 

‘আমার চোখে বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের পরেই আবদুর রহমান। ওস্তাদ হিসেবে আমি তাঁকে মানি। দীর্ঘদিন ধরে তাঁর সঙ্গে গান করছি। তিনি দেশে-বিদেশে পরিচিত এক বাউল।’

আসগর আলী

শাহ আবদুল করিমের শিষ্য



মন্তব্য