kalerkantho


সাত ভাই চম্পা সমাচার

১ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



সাত ভাই চম্পা সমাচার

১১ হাজার বর্গফুটের সেটে ৫২টি জোন, ২০০ শিল্পীর পরিশ্রমে নির্মিত হয়েছে ৩০০ পর্বের টিভি সিরিজ ‘সাত ভাই চম্পা’। অঙ্গ, বঙ্গ ও কলিঙ্গ—তিন রাজ্যের পৌরাণিক গল্প নিয়ে তৈরি সিরিজটির প্রচার শুরু হয়েছে চ্যানেল আইতে [বুধ, বৃহস্পতি ও শুক্রবার রাত ৮টায়]। ধারণা করা হচ্ছে, দেশের সর্বাধিক ব্যয়বহুল এই সিরিজটির কল্যাণে দেশি টিভিমুখী হবে দর্শক। সিরিজটির বিস্তারিত জানাচ্ছেন মীর রাকিব হাসান

 

 

অনেক দিন ধরেই এমন একটা সিরিজ করার পরিকল্পনা চ্যানেল আই কর্তৃপক্ষের মাথায় ঘুরছিল। চ্যানেলে চ্যানেলে যখন ডাব করা বিদেশি সিরিয়ালের ছড়াছড়ি, তখনই এমন কিছু করার জোর তাগিদ পেল চ্যানেলটি। ২০১৬ সালে পরিচালক রিপন নাগ তাঁর টিম নিয়ে বসলেন চ্যানেল আইয়ের ফরিদুর রেজা সাগর, শাইখ সিরাজ, ইবনে হাসান খানের সঙ্গে। এত বড় প্রজেক্ট, এত বাজেট—কোনো কিছুতেই ‘না’ করলেন না তাঁরা।

 

শুরু হলো সেট নির্মাণ

২০১৬ সালের নভেম্বরে তেজগাঁওয়ের কোক স্টুডিওতে প্রথম সেট তৈরি করা হয়। পরের বছর ফেব্রুয়ারিতে স্থানান্তর করা হলো এফডিসির সবচেয়ে বড় জসীম ফ্লোরে। এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিদিন ৮০ থেকে ১০০ জন সেট তৈরির কাজ করলেন। মে মাসের প্রথম দিন শুরু হলো শুটিং। সেটের আনুষঙ্গিক অনেক কিছুই সত্যিকারভাবে নির্মাণ করতে হয়েছে—দোলনা, সিংহাসন, মন্ত্রীদের বসার আসন। একই ফ্লোরে ২৮টি সেট। এর মধ্যে যেমন আছে রাজদরবার, তেমনি আছে কারাগার ও গুহা।

বঙ্গের রাজপ্রাসাদে ব্যবহার করা হয়েছে বিভিন্ন ধরনের বাঙালিয়ানা মোটিফ—পদ্ম, শাপলা, জামদানি প্রভৃতি।

 

শিল্পী নির্বাচন

টিভি খুললেই যাঁদের নিয়মিত দেখা যায় এমন শিল্পীদের না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন প্রযোজক-পরিচালক। নতুনদের প্রাধান্য দেওয়ার কারণ, যাতে দর্শকের চোখে তাঁরা চরিত্রের মানুষটি হয়ে ওঠেন। তবে অনেক     সিনিয়র শিল্পী আছেন, যাঁরা নাটক খুবই কম করছেন; যেমন—চলচ্চিত্রের খল অভিনেতা আহমেদ শরীফ, টাইগার রবি। এ ছাড়া আছেন সুব্রত, মানস     বন্দ্যোপাধ্যায়। আছেন বিজ্ঞাপনে কণ্ঠ দেওয়া মাজহারুল ইসলাম। রাজদরবারের ঘোষক তিনি। রাজকবি হয়েছেন বাউলশিল্পী শফী মণ্ডল। এই প্রথম অভিনয় করছেন তিনি। আহমেদ শরীফ আছেন মহামন্ত্রী হিসেবে। রাজমাতা চরিত্রে নৃত্যশিল্পী মুনমুন আহমেদ। ঘোড়া চালাতে পারেন এমন শিল্পীদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। নায়লা আজাদ নূপুরের তত্ত্বাবধানে নতুনদের গ্রুমিং করানো হয়েছে। সিনিয়র শিল্পীরাও প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।

 

স্থান ও রানিদের নামের বৈচিত্র্য

সবচেয়ে ছোট রানির ঘরে চম্পার জন্ম। মূল গল্পটা সেখান থেকেই। এখন দেখানো হচ্ছে পাঁচ রানি আছেন।  কিভাবে যষ্ঠ বা সপ্তম রানি আসবেন, ধীরে ধীরে এগুলো দেখানো হবে। প্রত্যেক রানির আবার আলাদা বৈশিষ্ট্য; যেমন—বড় রানি গান জানেন, তাঁকে বলা হয় সুরসাগরের রাজকন্যা। মেজো রানিকে বলা হয় আলোর দেশের রানি। সেজো রানি প্রাসাদসুন্দরী। তার পরেরজন এসেছেন কামরূপ-কামাখ্যা থেকে, তিনি জাদু জানেন। তার পরেরজন অঙ্গের রাজকুমারী, কারণ তিনি অঙ্গ থেকে এসেছেন।

সিলেটের পুরনো নাম জয়ন্তিকা, নোয়াখালীর সুধারাম, বরিশালের চন্দ্রদ্বীপ, নদীয়ার নবদ্বীপ—এ রকম নামগুলো ব্যবহার করা হয়েছে গল্পের বিভিন্ন স্থানের নাম হিসেবে।

 

চম্পা আসবেন দ্বিতীয় সিজনে

প্রথম সিজনে থাকবে দেড় শ পর্ব। সপ্তম রানির গর্ভে চম্পার জন্ম হওয়ার পর তাকে পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া হবে। এখানেই শেষ হবে প্রথম সিজন। এই সিজনকে বলা হচ্ছে আদি পর্ব। চম্পার গল্প দ্বিতীয় সিজনে।

 

দুই পাতার গল্পে কিভাবে ৩০০ পর্ব?

ঠাকুরমার ঝুলিতে ‘সাত ভাই চম্পা’ দুই পাতার গল্প। এর সঙ্গে রূপকথার আরো ছোট ছোট গল্প এক করে এই সিরিজের গল্প। ছোট ছোট সেই রূপকথার গল্পকে সহযোগী গল্প করা হয়েছে। গল্পে এক রাজার নাম শাহ ইরফান, কিন্তু তাঁর উপাধি বিজয় বাহু। নামটা নেওয়া হয়েছে ইতিহাস থেকে। এক হাজার বছর আগের গল্প বলতে গিয়ে নির্মাতা স্থানীয় কোনো নায়ককে খোঁজার চেষ্টা করেছেন। রিপন নাগ বলেন, ‘আমাদের একজন যুবরাজ ছিলেন নবম শতাব্দীতে, যাঁদের রাজত্ব ছিল বর্তমান বরিশাল, ওই সময়ের চন্দ্রদ্বীপে। প্রায় এক শ নৌকায় ২৬ হাজার সৈন্য নিয়ে তিনি সিংহল দ্বীপ [বর্তমান শ্রীলঙ্কা] আক্রমণ করে সেখানকার রাজকন্যাকে বিয়ে করেন। এখন যাদের সিংহলি বলি, তারা আসলে আমাদেরই বংশধর। আমাদের পূর্বপুরুষ বিজয় বাহু সেখানে গিয়েছিলেন। আমরা ওই ধরনের বিষয় এনেছি, যেগুলো আমাদের গর্ব করার বিষয়, কিন্তু কালের বিবর্তনে আমরা ভুলে গেছি। এ ধরনের অনেক তথ্যের সম্মিলন করার চেষ্টা করেছি এখানে।’

চিত্রনাট্য ও সংলাপ রচয়িতা নাজাকাত খান বলেন, ‘ছয় মাস ধরে গবেষণা করেছি এই সিরিজের জন্য। প্রচুর বই পড়েছি, সিনেমা-সিরিয়াল দেখেছি। আদি যুগ ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছি। সংলাপ এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর-প্রত্যুত্তরে একটা আকর্ষণ না থাকলে এত বড় সিরিজে দর্শক ধরে রাখা সম্ভব নয়।’

 

এত বাজেট তোলা সম্ভব?

বলা হচ্ছে দেশের সর্বাধিক ব্যয়বহুল টিভি প্রজেক্ট। কিন্তু সেই বাজেটের পরিমাণ জানাতে অনিচ্ছুক প্রযোজক-পরিচালক। তবে তাঁদের বিশ্বাস, এই মার্কেট থেকে বাজেটটা তুলে আনা সম্ভব। আমাদের চ্যানেলগুলো বাইরের দেশের সিরিজ বাংলায় প্রচার করে থাকে, চ্যানেল আই চেষ্টা করছে এই সিরিজটা অন্য দেশে বিক্রি করতে। সবাইকে একটা বার্তাও দিতে চায় সিরিজ সংশ্লিষ্টরা, যদি সঠিকভাবে প্ল্যান করে ব্যয় করা হয়, সেই অর্থ বাংলাদেশের মার্কেট থেকে তোলা সম্ভব।

 

শিল্প নির্দেশনা ও সাজসজ্জা

সব কলাকুশলীই বাংলাদেশের। শিল্প নির্দেশনা দিয়েছেন চয়ন কুমার দাস, ঢাকা ইউনিভার্সিটির চারুকলা থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছেন। পোশাক পরিকল্পনা করেছেন নোশীন রহমান। শুধু পোশাকই নয়, সিরিজে ব্যবহৃত গয়নার ডিজাইনও তাঁর করা। সাজসজ্জা করেছেন কাইয়ুম মেহেদী।

 

প্রপস সংগ্রহ

ব্যবহৃত অস্ত্রশস্ত্র আনা হয়েছে বিভিন্ন দেশ থেকে—জাপান, কানাডা, আমেরিকা, চীন ও ভারত। লক্ষ রাখতে হয়েছে, যেন এসবের ডিজাইন আমাদের ডিজাইনের সঙ্গে যায়। রাজা ও সেনাপতি যে তলোয়ার ব্যবহার করছেন সেটা রুপার তৈরি। পুরনো ছুরি বা তলোয়ারগুলোর বেশির ভাগই রাজস্থানের বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রচুর প্রপস আনা হয়েছে দেশের শৌখিন মানুষদের কাছ থেকে, যাঁরা পুরনো জিনিস সংগ্রহে রাখতে পছন্দ করেন। এর মধ্যে আছে মোমবাতি, মোমদানিসহ বিভিন্ন ধরনের পাত্র।

 

শুটিংয়ে বিড়ম্বনা

রাজদরবারে শুট করার সময় প্রচুর প্রদীপ জ্বালাতে হয়। এ কারণে প্রায়ই সেটে আগুন লেগে গেছে। কয়েকজন অভিনয়শিল্পীর লম্বা চুলে আগুন ধরেছে। কস্টিউমে আগুন লেগে গেছে। সেটে সব সময়ই একজন চিকিৎসক থাকেন। মহারাজার কয়েকজন স্টান্ট আছে। তবু তাঁর পিঠের ও পায়ের চামড়া উঠে গেছে।

 

দেরি নয়, ঠিকই আছে

দুই বছর আগে শুটিং শুরু হলেও প্রচার শুরু গত সপ্তাহে। এমন একটা সিরিজের জন্য সময়টা ঠিকই আছে, মনে করেন পরিচালক। তবে দেরি হওয়ার আরো আনুষঙ্গিক ব্যাপারও ছিল। যেমন—অনেক বাছাই করে রাজার জন্য একটা ঘোড়া ঠিক করা হলো। ট্রাকে নিয়ে আসার সময় অ্যাকসিডেন্টে ঘোড়ার পা ভেঙে গেল। ওই ঘোড়ার জন্যও ১০ দিন বসে থাকতে হয়েছে।

 

জি বাংলা বনাম চ্যানেল আই

অক্টোবর থেকে ভারতে জি বাংলায় চলছে একই নামের সিরিজ। দর্শক বিভ্রান্ত হবে না তো? নির্মাতা বলেন, ‘আমাদের থিম আর ওদের থিম ভিন্ন। ওরা অনেক বেশি গ্রাফিকস ব্যবহার করেছে, আমরা চেষ্টা করেছি বাস্তবিক করার। তা ছাড়া ওরা একজন রানিকে কেন্দ্র করে গল্প এগিয়ে নিয়ে গেছে, এখানে সাত রানির গল্প। আমাদের দেশীয় কালচার ও গল্প আছে এখানে। আমাদেরটা অনেক বেশি বাস্তব।

 

গবেষণা করেই মাঠে নেমেছি

শাইখ সিরাজ প্রযোজক

আসলে আমাদের একটা দায়িত্ব আছে। অনেক দিন ধরে শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা করছি। সেখান থেকেই নিজেরা উদ্যোগী হলাম। টিভি নাটক থেকে দর্শক যখন ছুটে যেতে শুরু করল, ভারতীয় সিরিয়াল দেখতে শুরু করল, আমরা তখন ‘৫১-বর্তী’ করে দর্শক ফেরালাম। ফের এই প্রয়োজনবোধটা সামনে এলো। যখন নাটকে অস্থিরতা, বিদেশি সিরিয়াল আর ডাবিংয়ে সয়লাব হয়ে যাচ্ছে সব, তখন চিন্তা করলাম, আমরা বাইরে থেকে না এনে নিজেরাই এমন কিছু তৈরি করে বিদেশে রপ্তানি করতে পারি। অনেকে মনে করেন, এত বড় বাজেট! এই বাজার থেকে সেটা তোলা সম্ভব? হান্ড্রেড পার্সেন্ট সম্ভব। আমরা সেটা গবেষণা করেই মাঠে নেমেছি। তা ছাড়া পুরনো কালজয়ী সেসব কাহিনি নতুন করে মানুষের সামনে তুলে ধরারও একটা তাগিদ ছিল। তরুণ প্রজন্মও এটাতে আকৃষ্ট হবে বলে মনে করি। আমাদের ঐতিহ্যকে সামনে নিয়ে আসাও একটা লক্ষ্য।

 

অনেকেই তাকিয়ে আছেন আমাদের দিকে

রিপন নাগ পরিচালক

এটা এমন একটা সিরিজ, যার দিকে শুধু দর্শকই নয়, অন্য পরিচালক বা অভিনেতারাও তাকিয়ে আছেন। এ ধরনের প্রজেক্ট সফল হলে আমরা নিশ্চিত, ভবিষ্যতে এমন আরো অনেক প্রজেক্ট হবে। নাটকের বাজেট কম বলে অনেক পরিচালক অভিযোগ করেন, এই সিরিজের পর তাঁদের অভিযোগ গুরুত্ব পাবে।

যদি বলা হয়, দর্শক কেন দেখবে এই সিরিজ? বলব, এখানে নাচ, গান, অ্যাকশন, গ্ল্যামার—সব কিছুই রাখার চেষ্টা করেছি। কী নেই—পাতাল কারাগার, অন্ধকূপ, মুখোশ মানুষ, কবিরাজি, পেত্নি, ঠগদের গল্প, কামরূপ-কামাখ্যার গল্প, মণিপুরের গল্প, জয়ন্তিকার গল্প। আমাদের এ অঞ্চলের অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গর গল্প। দর্শককে আকৃষ্ট করবেই।



মন্তব্য