kalerkantho


অস্ত গেলেন শশী

আর দশজন বলিউড অভিনেতার চেয়ে অনেক দিক থেকেই ব্যতিক্রম শশী কাপুর। সিনেমায় তুমুল জনপ্রিয়তা পাওয়ার পরও মঞ্চ ছাড়েননি, সমান তালে তাঁকে দেখা গেছে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রেও। প্রচলিত বাণিজ্যিক সিনেমার বাইরে করেছেন ভিন্ন ধারার অনেক ছবিও। প্রযোজক হিসেবেও তাঁর কাজ প্রশংসিত হয়েছে বরাবর। ৭৯ বছর বয়সে প্রয়াত অভিনেতাকে নিয়ে লিখেছেন লতিফুল হক

৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



অস্ত গেলেন শশী

পৃথ্বিরাজ কাপুরের ছেলের সিনেমায় আসা আশ্চর্য কিছু ছিল না; না এলেই বরং অবাক হতো মানুষ। মাত্র আট বছর বয়স থেকে পর্দায় দেখা দিয়ে নিরাশ করেননি শশী কাপুর।

তবে বড় হওয়ার পর যা করেছেন তা সত্যিই অবাক করেছে অনেককে। তারকাপুত্র হিসেবে বলিউডের চেনা ছকে চলার সঙ্গে সঙ্গে নতুন কিছুও যোগ করেছেন শশী।

নায়কের ভূমিকায় আবির্ভাব যশ চোপড়ার ‘ধর্মপুত্র’ দিয়ে। এরপর ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে সত্তরের দশক টানা কাজ করেন, হয়েছেন বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয়। বিশেষ করে ‘জানওয়ার অউর ইনসান’, ‘কাভি কাভি’, ‘তৃষ্ণা’র মতো একক হিট অমিতাভ বচ্চনের মতো উচ্চতায় নিয়ে যায়। তাঁর সেরা সময়ে ছিলেন বলিউড তারকাদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া অভিনেতা।

পুরো ক্যারিয়ারে ১৬০টির বেশি সিনেমা করেছেন। এর মধ্যে ১২টি আন্তর্জাতিক ছবি। হালের ভারতীয় অভিনেতা-অভিনেত্রীদের বিদেশি ছবি করা নিয়ে এত মাতামাতি, অথচ তার অনেক আগেই পথ দেখিয়েছিলেন শশী।

শুধু সংখ্যায় নয়, তাঁর অভিনীত বেশির ভাগ ইংরেজি সিনেমা হয়েছিল দর্শক-সমালোচকনন্দিত। অভিনীত হিন্দি সিনেমাগুলোর মধ্যে ৬১টিতেই একক নায়ক শশী, যার ৩৩টি সুপারহিট। বহু তারকাময় ৫৪টি ছবিতেও নিজেকে আলাদা করে চিনিয়েছেন, যেগুলোর ৩৪টি দুর্দান্ত ব্যবসা করেছে। এক ডজন বিদেশি ছবির মধ্যে সাতটিতেই তিনি ছিলেন প্রধান চরিত্র, যা সেই সময়ের বিচারে উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

কাজের ক্ষেত্র মুম্বাই হলেও কলকাতার সঙ্গে তাঁর ছিল নিবিড় যোগাযোগ। ১৯৩৮ সালে এই শহরেই জন্মেছিলেন কিনা। ছেলেবেলা কেটেছে ভবানীপুরের এক ভাড়া বাড়িতে। এরপর বহুবার এই শহরে এসেছেন নাটক করতে বাবার ভ্রাম্যমাণ নাটকের দল ‘পৃথ্বী থিয়েটার’ নিয়ে। ব্রিটিশ অভিনেত্রী জেনিফার ক্যান্ডলের সঙ্গে থিয়েটার করতে গিয়েই পরিচয় কলকাতায়। পরে বিয়ে। সত্যজিত্ রায়ের সঙ্গেও তাঁর ছিল ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। তাঁর লেখা অবলম্বনে ‘কিসসা কাঠমাণ্ডু কা’ টিভি সিরিজে ফেলুদা হয়েছিলেন। আরেক ফেলুদা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গেও ছিল তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। শশীর মৃত্যুর পর এক লেখায় সৌমিত্র তাঁর সম্পর্কে বলেছেন, ‘শেকসপিয়ার ছিল তাঁর অন্তরমহলে, হিন্দি সিনেমার এত জনপ্রিয় নায়ক হয়েও যা কখনো মন থেকে মুছে যায়নি। ’

শশী ছিলেন দারুণ সুদর্শন, নিজের চোখ আর হাসির জন্য ছিলেন বিখ্যাত। সে জন্যই কি না তাঁর সঙ্গে জুটি হলে সব নায়িকাকেই মানিয়ে যেত। বলিউডের অবিস্মরণীয় বেশ কয়েকটি জুটি হয়েছে তাঁর সঙ্গে। এর মধ্যে শর্মিলা ঠাকুরের সঙ্গে করেছেন ১২টি চলচ্চিত্র। ‘ওয়াকত’, ‘সুহানা সফর’, ‘আমনে সামনে’সহ ছয়টি সুপার-ডুপার হিট। এ ছাড়া রাখি গুলজার, জিনাত আমান, হেমা মালিনীর সঙ্গে করেছেন যথাক্রমে দশ ও ছয়টি করে সিনেমা। সত্তরের দশকের হিন্দি সিনেমা মানেই দারুণ সব গান। তাঁর লিপে ‘পরদেশিয়া সে না আঁখিয়া মিলানা’, ‘তুম বিন জাঁউ কহাঁ’, ‘খিলতে হ্যায় গুল য়হাঁ’র মতো গানের দৃশ্য ভক্তদের মনে চিরস্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। শুধু গানই বা কেন, সংলাপের ক্ষেত্রেও তো তাঁর চরিত্রগুলো লাজবাব। ‘দিওয়ার’-এ তাঁর সেই ডায়ালগ ‘মেরে পাস মা হ্যায়’ তো রীতিমতো ইতিহাস।

ব্যক্তিজীবনে কিছু নিয়ম মেনে চলতেন শশী কাপুর। পুরো ক্যারিয়ারে কখনই রবিবার কাজ করেননি। রবিবার মানে তাঁর কাছে শুধুই ছুটি। সারা দিন বাড়িতেই থাকতেন, কোনো অতিথিকেও আমন্ত্রণ জানাতেন না।

অভিনয়ের সঙ্গে পরিচালনাও করেছেন শশী। অভিনয় কমিয়ে দেওয়ার পর দুটি ছবি পরিচালনা করেন। এর মধ্যে ‘আজুবা’ উল্লেখ করার মতো।

১৯৮৪ সালে শশী কাপুর সবচেয়ে বড় ধাক্কা খান। ক্যান্সারে স্ত্রী জেনিফারের মৃত্যু কার্যত তাঁর জীবন থামিয়ে দেয়। নিজেকে গুটিয়ে নিতে থাকেন। শেষের দিকে শুধু হুইলচেয়ারে পৃথ্বী থিয়েটারে গিয়ে বসে থাকতেন। ক্রমেই দুর্বল হতে হতে শেষমেশ একেবারেই চলে গেলেন।

প্রযোজক শশী
সত্তরের দশকে বলিউডে একের পর এক কাজ করছিলেন। বেশির ভাগই মসলা ছবি। কিন্তু নিজের প্রযোজিত প্রথম ছবিতেই চমক—একেবারে অন্য ঘরানার ছবি বাছলেন শশী। ১৯৭৯ সালে মুক্তি পাওয়া শ্যাম বেনেগালের ‘জুনুন’ ফিল্মফেয়ারসহ বেশ কয়েকটি পুরস্কার পায়। প্রযোজনার সঙ্গে সিনেমায় অভিনয়ও করেন শশী। এই ছবিতে স্ত্রী জেনিফারসহ শশীর সন্তানদেরও অভিনয় করতে দেখা যায়। দুই বছর পর বেনেগালের পরের ছবি ‘কালযুগ’ও প্রযোজনা করেন। বিপরীতে ছিলেন রেখা। মহাভারতের আধুনিক সংস্করণ ব্যাপক প্রশংসিত হয়। প্রযোজক হিসেবে শশীর আরেকটি সফল সিনেমা ‘উত্সব’। দ্বিতীয় শতাব্দীর সংস্কৃত নাটক ‘মৃচ্ছকটিক’ অবলম্বনে তৈরি এই ছবির নায়িকা ছিলেন রেখা।

শশীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ‘৩৬ চৌরঙ্গী লেন’। শশীকে প্রথম ছবির প্রযোজক হিসেবে পাওয়া গল্প বলেন অপর্ণা সেন, “আমার প্রথম ছবির প্রযোজক হিসেবে শশীকে পাব, এটা আমার দূরতম কল্পনায়ও ছিল না। শশী কাপুরের আইডিয়াটা একান্তই মানিক কাকার [সত্যজিত্ রায়]। তিনিই আমাকে বলেন, ‘তোর গল্পের সিনপসিসটা শশীকে পাঠা না! আমার মন বলছে, ও রাজি হয়ে যাবে। ’ যা হোক, সিনপসিস পাঠিয়ে দেওয়ার পর শশী ফোন করল। বলল, ‘সিনপসিসটা আমার খুব ভালো লেগেছে। কিন্তু তুমি ছবির ডিরেকশন দিতে পারবে সে আমি কী করে বুঝব?’...এরপর মুম্বাই গিয়ে দেখা করলাম। ” প্রযোজক হিসেবে শশী কতটা দারুণ সে উদাহরণও দেন অপর্ণা, “আগে সহকর্মী হিসেবে আমরা ‘বোম্বে টাকিজ’, ‘জানেমন’, ‘ইমান ধরম’ করেছিলাম। অভিনেতা হিসেবে সে দারুণ, এটা সবাই জানে; কিন্তু প্রযোজক হিসেবেও সে ছিল অসাধারণ। এরপর আমি তার মতো প্রযোজক আর পাইনি। ওর সব কিছুর মধ্যেই একটা পার্সোনাল টাচ ছিল। ”


মন্তব্য