kalerkantho


দুখিনী বাংলা

খাদিজার বুঝি আর সংসার করা হলো না

বোন খাদিজার বিয়ের অনুষ্ঠানে যাবেন বলেই সন্তানসহ রওনা হয়েছিলেন জামশেদা; কিন্তু বুড়িগঙ্গায় ট্রলারডুবিতে আরো স্বজনদের সঙ্গে মারা যান তিনি। এর পর থেকে কষ্টে আছেন খাদিজা। আব্দুল আজিজ শিশির কথা বলে এসেছেন

১৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০



খাদিজার বুঝি আর সংসার করা হলো না

স্বামীর সঙ্গে জামশেদা

‘স্বপ্ন ছিল আবারও ঘর বাঁধব। নতুন করে জীবনটাকে শুরু করব। এখন নিজেকে অপরাধী মনে হয়। আর ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখি না। মনে হয় যেন আমার স্বপ্নই কেড়ে নিয়েছে এতগুলো প্রাণ। সাত মাস আগে জুনায়েদকে নিজের হাতেই প্রসব করিয়েছিলাম। সবাই আমাকে ছেড়ে চলে গেল।’ বলছিলেন খাদিজা। শরীয়তপুর ভেদরগঞ্জে বাড়ি কামাল চোকদারের। খাদিজা বেগম কামাল চোকদারেরই বড় মেয়ে। কামাল চোকদারের তিন মেয়ে দুই ছেলের মধ্যে সবার বড় খাদিজা। সতেরো বছর বয়সে সখিপুরের নুর মোহাম্মদ প্রধানিয়ার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের দুই বছর পরে একটি কন্যাসন্তানের জননী হন; কিন্তু স্বামীর সঙ্গে বনাবনি না হওয়া এক বছরের শিশুকন্যা রিয়া মনিকে নিয়ে বাবার বাড়ি চলে আসেন খাদিজা। এর পর থেকে বাবার সংসারেই মেয়েকে নিয়ে ছিলেন। প্রায় দশ বছর পরে পরিবারের সদস্যরা আবার দ্বিতীয় বিয়ে ঠিক করে সখিপুরের আনন্দবাজার গ্রামের বাবুল বেপারীর সঙ্গে। গেল ৮ মার্চ শুক্রবার বিয়ের দিন ঠিক হয়। বিয়ের অনুষ্ঠান ঘিরে প্রায় তিন শ লোকের খাওয়ার আয়োজন করেছিলেন কামাল চোকদার।

বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা থেকে বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে খাদিজার পরিবারের ছয় সদস্য রওনা হয়; কিন্তু ট্রলারে ওঠার পর তাদের বহনকারী ট্রলার ডুবে যায়। শুধু চাচাতো ভাই শাহজালালকে উদ্ধার করা গেছে, যদিও লঞ্চের পাখার আঘাতে তাঁর দুই পা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। দলে খাদিজার ছোট বোন জামশেদাও ছিলেন। ছিলেন তাঁর স্বামী দেলোয়ার ও সাত মাস বয়সী ছেলে জুনায়েদ। একই সঙ্গে পরিবারের ছয় সদস্যের এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না খাদিজা। উদ্ধার হওয়া চারটি মরদেহ শনিবার সকালে দাফন করা হয়।

কাঁদছে খাদিজা (মাঝখানে)

সোমবার শোক বাড়িতে

কামাল চোকদারের স্ত্রী ইয়ারুন বেগম ঘরের মেঝেতে গড়াগড়ি করে কাঁদছিলেন। শিশু জুনায়েদের জামা তাঁর বুকে আঁকড়ে ধরা। কেঁদে কেঁদে বলছেন, ‘আমার জুনায়েদ কই গেলা? কই গেলা জামশেদা? দেলোয়ার কি আর আইবো না? আমি অহন কী করুম? আমার বুকের মানিকরা আমারে রাইখা গেল কই?’

খাটের কোণে নির্বাক বসে আছেন খাদিজা বেগম। খাদিজা বলেন, ‘জুনায়েদের কান্নার শব্দ এখনো আমার কানে ভাসে। জামশেদা আর আমি দুই বোন অল্প দিনের বড়-ছোট ছিলাম। সারা দিন মাঠে-ঘাটে ঘুরে বেড়াতাম।’ ছোট বোনের স্মৃতি মনে করে কেঁদেও ফেললেন। কিছুক্ষণ থমকে গিয়ে আবার বলতে শুরু করেন—‘আমি আর স্বপ্ন দেখতে চাই না। আমার সব স্বপ্ন মাটি হয়ে গেছে। জামশেদার মেয়ে জাকিয়া (বয়স আট। আগে থেকেই সে গ্রামের বাড়িতে ছিল) আর আমার মেয়ে রিয়ামনিকে নিয়েই আমি বাঁচতে চাই। আর কোনো নতুন সংসার নয়।’

 

চেয়ারে বসা শাহজালালের বাবা

বাড়ির উঠানে একটি চেয়ারে বসে আছেন মহসিন চোকদার। তিনি খাদিজার চাচাতো ভাই লঞ্চের পাখার আঘাতে দুই পা হারানো শাহজালালের বাবা। চোখের জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। বলছিলেন, ‘আমার তো সব শেষ হয়ে গেল। আমার বউমা, আমার নাতনি মিম কই? আমার মাহি কই? ছোটবেলা থেকেই শাহজালাল আমার সঙ্গে কাজ করে সংসারে অর্থের জোগান দিত। শিশু বয়সেই ছেলেটা আমার সংসারের হাল ধরেছিল। বড় হয়ে ঢাকার কামরাঙ্গীর চরে দর্জি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করত শাহজালাল। তিন বছর আগে আমার স্ত্রী মারা যায়। দুই নাতনিকে নিয়ে হেসে-খেলে আমার দিন কাটত। আমার তো সব শেষ হয়ে গেল। আমার ছেলেটাও পঙ্গু হয়ে গেল।’ পরে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১২ মার্চ শাহজালালও মারা যান। শাহাজালালের স্ত্রী সাহিদা বেগম ও তাঁর দুই কন্যাশিশু মিম আক্তার (৮), মাহি আক্তার (৫) ট্রলার ডুবে মারা গেছে।



মন্তব্য