kalerkantho

সুপ্রভাত বাংলাদেশ

তিনি জঞ্জাল সাফ করেন

মো. বজলুল কবির ভূঞা একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গড়েছেন, নাম—রিপেয়ার বাংলাদেশ। জঞ্জাল সাফ করার কাজ করে তাঁর এ সংগঠন। দেখা করে এসেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

৯ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



তিনি জঞ্জাল সাফ করেন

শুক্রবার ছিল সেদিন। বিকেল ৪টা। মৌচাক-শান্তিনগর-মালিবাগ উড়াল সেতু। একটি ট্রাক থেমে আছে এক জায়গায়। তাতে আবর্জনা রাখছে এক দল শ্রমিক। ট্রাকের পাশে একটি সাইনবোর্ড। ইংরেজিতে লেখা—রিপেয়ার বাংলাদেশ। বোর্ডটির পাশেই লাল পতাকা হাতে এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে। তিনি বজলুল কবির ভূঞা। ওই দিনই সকাল ১১টায় ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আমার স্ত্রী চেয়েছিল আজ শুক্রবার ছুটির সকালে কোনো রেস্টুরেন্টে আমার সঙ্গে নাশতা করবে। কিন্তু যখন বললাম, আজ তো মৌচাক-শান্তিনগর-মালিবাগ উড়াল সেতু পরিষ্কার করব। তখন তিনি বাদ দিলেন নাশতার বিষয়টি। ১০ জন শ্রমিক, তিনজন ড্রাইভার আর আমি মিলে সকাল থেকে অভিযান চালাচ্ছি। আশা করছি বিকেলের মধ্যে তিন কিলোমিটার জায়গা পরিষ্কার করা সম্ভব হবে। কয়েক টন আবর্জনা আজ সরানো হবে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী অফিসার মেজবাহ সাহেব (মেসবাহুল ইসলাম) একটি ট্রাক প্রদান করে পাশে আছেন আমাদের।... আশা করি মেয়র মহোদয়রা আমাদের এ কাজ করা থেকে অচিরেই অব্যাহতি দেবেন।’

বজলুল কবির ভূঞা কর অঞ্চল-১৩, ঢাকার কর কমিশনার। তরুণদের সঙ্গে নিয়ে সব জঞ্জাল সরিয়ে দেশের চেহারা বদলে দিতে চান তিনি। বছর তিনেক আগে যাত্রা করে সংগঠনটি। স্লোগান, ‘উই আর ওয়ার্কিং ফর এ বিউটিফুল বাংলাদেশ।’

বজলুল কবির বললেন, এ উড়াল সেতুটি কখনো কেউ পরিষ্কার করেনি। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়রকে তিন মাস আগে বিষয়টি জানিয়েছিলাম। তিনি বললেন, ‘উড়াল সেতুটি এখনো এলজিআরডির নিয়ন্ত্রণে। সিটি করপোরেশন এর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব এখনো পায়নি। হাত গুটিয়ে বসে না থেকে আমরাই শুরু করলাম।’

২৭ টন আবর্জনা

তিন বছর আগে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত কর কমিশনার ছিলেন বজলুল কবির। কী একটা কাজে ঢাকায় এসেছিলেন। এক সকালে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে কুড়িল উড়াল সেতু দিয়ে যাচ্ছিলেন। দেখলেন, একটা কুকুর মরে পড়ে আছে। বজলুল ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বললেন। স্ত্রী বললেন, ‘দেখো, উড়াল সেতুটির এদিক-ওদিক ঘাসও জন্মেছে।’

বজলুল কবির ড্রাইভারকে বললেন, ‘এগুলো পরিষ্কার করতে হবে। দেখো কোথায় লেবার পাওয়া যায়।’ কিছুক্ষণ পরে ৯ জন শ্রমিক নিয়ে এলো ড্রাইভার। এক পাশ থেকে পরিষ্কার করা শুরু হলো। কিছুদূর কাজ করার পর ময়লা-আবর্জনার স্তূপ জমে গেল। ‘প্রথমে ভেবেছিলাম ভ্যান দিয়ে সরাব। পরে একটি ট্রাক ভাড়া করলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম পুরো উড়াল সেতুটি আমরা পরিষ্কার করব’—বললেন বজলুল কবির। কিন্তু দিনভর কাজের পর দেখলেন উড়াল সেতুর ৫ ভাগের মাত্র ১ ভাগ পরিষ্কার হয়েছে। তাই ঠিক করলেন, যত দিন লাগুক পুরোটা পরিষ্কার করেই ছাড়বেন। ৯ জন শ্রমিক পাঁচ দিনে উড়াল সেতুটি পরিষ্কার করেছিল। প্রায় ২৭ টনের মতো আবর্জনা সরানো হয়েছিল কুড়িল উড়াল সেতুটি থেকে!

তিন বছরে কম কাজ হয়নি

কুড়িল উড়াল সেতুটি পরিষ্কারের সময় এক দিন রাজউকের একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী সেখানে যান। বললেন, ‘আপনারা কারা, কেন এটা পরিষ্কার করছেন?’ শ্রমিকরা বজলুল কবিরের নাম বলল। তাদের কাছ থেকে নম্বর নিয়ে প্রকৌশলী ফোন করলেন বজলুল কবিরকে। বললেন, ‘স্যার, এটা তো আমাদের দায়িত্ব। কিন্তু বাজেট বরাদ্দ হয়নি বলে এখনো কাজ শুরু হয়নি। আপনাকে ধন্যবাদ। আগামী দিনে আমরাই এটা করব।’ পরে বজলুল কবির ভাবলেন, একটা সংগঠন করবেন। শুধু ময়লা-আবর্জনা নয়, তরুণদের সঙ্গে নিয়ে সমাজের নানা অসংগতি দূর করবেন। ২০১৬ সালের ২২ জানুয়ারি রিপেয়ার বাংলাদেশ যাত্রা শুরু করল। সংগঠনটি গেল তিন বছরে একে একে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, সিডিএ আবাসিক এলাকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ফেনী ও নরসিংদীতে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালিয়েছে। গাড়ির চালক ও মালিকদের মধ্যে সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ করেছে। চট্টগ্রামের রহমানবাগ ও কাশেম বস্তিতে গিয়ে বস্তিবাসীকে মাদক, বাল্যবিয়ে, অধিক সন্তান নেওয়ার কুফলসহ নানা বিষয়ে সচেতন করেছে। হাটহাজারীর কাটাখালী গ্রামে পাঁচজন চিকিৎসক নিয়ে মেডিক্যাল ক্যাম্পও পরিচালনা করেছে। ২০১৭ সালে বন্যার সময় দিনাজপুরে বন্যার্তদের মধ্যে ত্রাণসামগ্রীও বিতরণ করেছে। একই বছরের আগস্টে কক্সবাজারের শিবিরে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে পলিথিন শিট, মশারি, ফিডার, মশার কয়েল, সাবান ও বালতি বিতরণ করেছে তারা। বজলুল কবির বলেন, ‘কোনো একটা কাজের প্ল্যান করলে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিই। বন্ধুবান্ধব থেকে শুরু করে বিত্তবানরা এগিয়ে আসেন। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণরা স্বেচ্ছাশ্রম দেন। কাজটা হয়ে যায়।’

 

টয়লেটও নির্মাণ করে দিলেন

২০১৭ সালে একবার কক্সবাজারে রামকোট বৌদ্ধ বিহারে গিয়েছিলেন। দেখলেন, সেখানে দর্শনার্থীদের জন্য কোনো টয়লেট নেই। পাশে একটা এতিমখানা আছে। সবাই এতিমখানার টয়লেট ব্যবহার করে। তখন বজলুল কবির এতিমখানা কর্তৃপক্ষকে প্রস্তাব দিলেন, ‘আপনারা জায়গা দিলে আমরা একটা টয়লেট করে দিতে পারি।’ পরে সেখানে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন একটা টয়লেট করে দিল রিপেয়ার বাংলাদেশ। বজলুল যে স্কুলে পড়েছেন নরসিংদীর সেই প্রাথমিক বিদ্যালয়েও একটা টয়লেট গড়ে দিয়েছেন তিন লাখ ২৫ হাজার টাকায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাক্রোবায়োলজি বিভাগের দুটি টয়লেটও সংস্কার করেছেন। এখন নরসিংদীর আরেকটি হাই স্কুলে ছাত্রীদের জন্য চারটি আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন টয়লেট করে দিচ্ছেন। বজলুল কবির বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য স্বাস্থ্যকর টয়লেট বিষয়ে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা। মানুষের মধ্যে যেন ভালো কাজের আগ্রহ তৈরি হয় সে জন্য কাজ করে যাচ্ছি আমরা।’

 

একজন বজলুল কবির ভূঞা

জন্ম নরসিংদীতে। নটর ডেম কলেজের ছাত্র ছিলেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন। এরপর দশম বিসিএসে সহকারী পোস্ট-মাস্টার জেনারেল হিসেবে পেশাজীবন শুরু করেন। সেখানে আড়াই বছর চাকরির পর ১৩তম বিসিএসে সহকারী কর কমিশনার হিসেবে কাজ শুরু করেন। এখন কর অঞ্চল-১৩, ঢাকার কর কমিশনার হিসেবে কর্মরত আছেন। জাতীয় আয়কর দিবসের প্রস্তাবক তিনি। ব্যক্তিজীবনে দুই সন্তানের জনক। স্ত্রী শারমিন রহমান রাজধানীর একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে শিক্ষকতা করেন। বড় মেয়ে আনিসা কবির ওয়াশিংটনে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ইকোনমিক অ্যানালিস্টে হিসেবে কর্মরত আর ছেলে আরিয়ান কবির কানাডায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে।

ছবি: মোহাম্মদ আসাদ

মন্তব্য