kalerkantho

শখের তোলা

আবুল কালামের খবর

একটি চায়ের দোকান ছিল আবুল কালামের আর দোকানে ছিল একটি রেডিও। নিয়মিত বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা শুনতেন। কিছু নিয়মিত কাস্টমারও জুটে গিয়েছিল সে সুবাদে। তার পর থেকেই শুরু গল্পটা। সাব্বিরুল ইসলাম সাবুর কাছে আরো খবর

৯ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



আবুল কালামের খবর

খবর নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ, তর্কাতর্কি চলত আবুল কালামের চায়ের আখড়ায়। অনেক সময় খবরে কী বলা হয়েছে এ নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হতো। বুদ্ধি করে ছোট্ট একটি টেপ রেকর্ডারে রেকর্ড করতে শুরু করেন কালাম। তর্কাতর্কির সময় প্রয়োজনে তিনি রেকর্ড করা খবর চালিয়ে দিতেন। এ থেকেই আবুল কালাম গড়ে তোলেন রেডিওতে পঠিত প্রায় দুই হাজার খবরের আর্কাইভ।

 

বাবা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন

মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার শান্তিপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালামের ছেলে আবুল কালাম। আবদুস সালাম পেশায় ছিলেন কৃষক। ১৯৭৮ সালের দিকে দিন ফেরানোর আশায় গ্রাম ছেড়ে চলে আসেন ঢাকায়। মিরপুর এলাকায় দিনমজুরের কাজ নিয়েছিলেন। তখন আবুল কালাম ১০-১২ বছরের। কাজ করতেন একটি ওয়েল্ডিং (ঢালাই) কারখানায়। এখানেই একটি দুর্ঘটনা ঘটে। কাজ করার সময় ইলেকট্রিক শক খেয়ে অনেকটা উঁচু থেকে নিচে পড়ে যান। মাথায় আঘাত পান। প্রাণে বেঁচে গেলেও বাঁ হাত ও পা অবশ হয়ে যায়। দুই বোন তখন অনেক ছোট। চরম আর্থিক কষ্টে পড়ে তাঁর পরিবার। এর কয়েক বছর পর বাবাও চলে যান না ফেরার দেশে। ১৯৮৮ সালের দিকে মিরপুর-১-এর ওয়াসা কলোনির গেটে ছোট্ট একটা চায়ের দোকান দেন কালাম। আর এখানেই আর্কাইভ গড়ার কাজ শুরু করেন। পরের দিকে শুধু খবরই নয়, রেডিওতে প্রচারিত বিশ্বের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার, ভাষণ, তাঁদের নিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠানও রেকর্ড করতে থাকেন।

 

রত্নভাণ্ডার

বিভিন্ন সময়ে বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা বা বাংলাদেশ বেতারে প্রচারিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যা, জিয়াউর রহমানের ক্ষমতায় আরোহণ, এরশাদের সামরিক শাসন, ৯০-এর গণ-অভ্যুত্থান, ২৪ আগস্টের গ্রেনেড হামলাসহ বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে প্রচারিত খবর তাঁর সংগ্রহে রয়েছে। আছে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ। মাওলানা ভাসানীর ভাষণও আছে তাঁর কাছে। এ ছাড়া জর্জ বুশ, রোনাল্ড রিগ্যান, মার্গারেট থেচার, টনি ব্লেয়ার, কফি আনান, ইয়াসির আরাফাত, নেলসন মেন্ডেলা, ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধী, কোরাজন একুইনো, ফিদেল কাস্ত্রো, জেনারেল জিয়াউল হক, বেনজির ভুট্টোসহ আরো অনেক বিশ্ব নেতার বক্তব্য ও সাক্ষাৎকার আছে।

আবুল কালাম জানান, এই সংগ্রহের কথা জানতে পেরে ২০০০ সালে তখনকার সেনাপ্রধান জেনারেল মুস্তাফিজুর রহমান তাঁর কাছ থেকে বেশ কিছু অডিও ক্যাসেট সংগ্রহ করেন। তাঁকে ১০ হাজার টাকা পুরস্কারও পাঠিয়েছিলেন। ওই টাকা দিয়ে বাবার নামে ‘আবদুস সালাম ফাউন্ডেশন’ গঠন করেছেন কালাম। পথশিশুদের জন্য গণশিক্ষা কার্যক্রম হাতে নিয়েছিলেন।

 

ফিরেছেন মাটির টানে

২০০৫ সালে ঢাকা থেকে সিংগাইরে ফিরে আসেন। ভূমিহীন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁর বাবার নামে বরাদ্দ পাওয়া সিংগাইরের ফোর্ডনগরে ৫ শতাংশ জমির ওপর বাড়ি করেছেন। বাড়ির সামনে ছোট ছোট চারটি দোকান ভাড়া দিয়ে কোনো রকমে সংসার চালাচ্ছেন। একটি অংশে গড়ে তুলেছেন আর্কাইভ। আর্কাইভের সামনে নিজ হাতে গড়ে তুলেছেন পদ্মফুল আর পাখির ভাস্কর্য। আর্কাইভে রয়েছে তাঁর ব্যবহার করা ছয়টি টেপ রেকর্ডার আর কয়েক শ ক্যাসেট। রেকর্ডারগুলো এখন আর ব্যবহার করার মতো অবস্থায় নেই। ক্যাসেটগুলোও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাই ক্যাসেট থেকে সব কিছু সিডি আর পেনড্রাইভে সংরক্ষণ করে রেখেছেন। তিনি চান তাঁর সংগ্রহগুলো আরো ভালোভাবে সংরক্ষণে কেউ এগিয়ে আসুক। সেই সঙ্গে গণশিক্ষা কার্যক্রমও আবার চালু করতে চান।

ছবি: লেখক

মন্তব্য