kalerkantho


সুখী হও বাংলাদেশ

এক দিনও লেট হয়নি

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



এক দিনও লেট হয়নি

সত্যজিৎ বিশ্বাস ও আরতীরানী বিশ্বাস

বত্রিশ বছর ধরে শিক্ষকতা করছেন সত্যজিৎ বিশ্বাস। এর মধ্যে এক দিনও তাঁর স্কুলে পৌঁছতে দেরি হয়নি। বাবুল আকতার অবাক বনেছেন। জেনেছেন মানুষটিকে

 

যশোরের মণিরামপুর উপজেলার কুচলিয়া গ্রাম। প্রয়াত মাধবচন্দ্র বিশ্বাস ও ত্রিবেণী বিশ্বাসের একমাত্র ছেলে সত্যজিৎ বিশ্বাস। অভয়নগর উপজেলার ধোপাদী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক তিনি।

 

আরো সত্যজিৎ

১৯৬১ সালে সত্যজিতের জন্ম। ১৯৭৬ সালে দিগঙ্গা-কুচলিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। এইচএসসি দিয়েছেন ১৯৭৮ সালে মশিয়াহাটি কলেজ থেকে। তারপর বিএসসি পাস করেছেন যশোর সিটি কলেজ থেকে ১৯৮৬ সালে। ওই বছরই ধোপাদী স্কুলে যোগ দেন সহকারী শিক্ষক হিসেবে। 

 

তখনো লেট করেননি

নিজে যখন স্কুলের ছাত্র ছিলেন, তখনো ক্লাসে নিয়মিত ছিলেন সত্যজিৎ। সব দিনই সবার আগে ক্লাসে হাজির হওয়াটা তাঁর অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। পরে যখন শিক্ষক হলেন, তখনো তিনি নিয়মিত। সময়ের আগেই পৌঁছে যান স্কুলে। এত বছরে ছুটিও নেননি কোনো দিন। ১৯৮৯ সালের জুলাই মাসের ২৬ তারিখ রাতে নড়াইলের আরতীরানী বিশ্বাসের সঙ্গে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন সত্যজিৎ। পরের দিনই কিন্তু যথাসময়ে স্কুলে হাজির হয়েছিলেন। তাঁর বাবা মারা যাওয়ার পরদিনও যথারীতি স্কুলে গিয়েছিলেন।

 

সাইকেলে চেপেই স্কুলে যাওয়া-আসা করেন সত্যজিৎ বিশ্বাস

তাঁর একটি সাইকেল আছে

বাড়ি থেকে তাঁর স্কুল সাত কিলোমিটার। হেঁটেও গেছেন অনেক দিন। তবে সাইকেলে চেপেই স্কুলে যান বেশি। ঝড়-বৃষ্টি তাঁর পথ রোধ করতে পারেনি। ১০টায় স্কুল শুরু হয়। তিনি সাড়ে ৯টায়ই পৌঁছে যান। বই পড়া, কবিতা লেখার নেশা আছে তাঁর। ফুলের গাছও লাগান। কমপক্ষে তিন হাজার ফুলের গাছ লাগিয়েছেন আজ পর্যন্ত। সত্যজিৎ বিশ্বাসের এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলে অভিজিৎ বিশ্বাস কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যান বিভাগে পড়ছে। মেয়ে প্রিয়াংকা পড়ে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পশু পালন বিভাগে।

 

তাঁকে নিয়ে

ধোপাদী স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. নজরুল ইসলাম। তিনি বললেন, ১৯৯০ সাল থেকে এই স্কুলে আছি।  সত্যজিৎ স্যার এক দিনের জন্যও স্কুলে অনুপস্থিত থাকেননি। ছাত্ররা তাঁকে ভালোবাসে। স্কুলের প্রতি তাঁরও খুব দরদ।

স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি তপনকুমার বসু। বললেন, সত্যজিত্বাবু একজন আদর্শ শিক্ষক।

প্রতিবেশী ডা. বাবলুকিশোর বিশ্বাস বললেন, সৎ ও নিষ্ঠাবান মানুষ তিনি। শুধু আদর্শ শিক্ষক নন, ভালো মানুষও বটে। স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী রাকিবুল হাসান বলল, স্যার খুব ভালো। তিনি আমাদের গণিতের ক্লাস নেন। আমরা আনন্দের সঙ্গে তাঁর ক্লাস করি।

 

মন থেকেই পেশাটিকে গ্রহণ করেছি

সত্যজিৎ বিশ্বাস

 

ছাত্রদের পড়াচ্ছেন

স্কুলকে আপনি খুব ভালোবাসেন, তাই না?

শিক্ষকতা এক মহান পেশা। আমি মন থেকেই পেশাটি গ্রহণ করেছি। আমার মেধা, মনন, সৃজনশীলতা—সবই স্কুল ঘিরে। আমি বিশ্বাস করি, পরিবার, সমাজ, দেশ গঠনের কারিগর হবে একজন শিক্ষক। তাই শিক্ষককে আদর্শবান হতে হবে। আমি নিজেকে একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবেই গড়ে তুলছি। স্কুলই আমার সব। শিক্ষার্থী, শিক্ষকদের মধ্যে থাকতে আমার ভালো লাগে। স্কুলের পরিবেশেই আমি বেশি সময় কাটাই।

 

তাহলে বলতে পারি শিক্ষকতাই আপনার প্রেম?

আমি জনতা ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকে চাকরি করার সুযোগ পেয়েছিলাম; কিন্তু পেশা হিসেবে শিক্ষকতাই আমার পছন্দ। ছাত্রজীবন থেকেই আমি শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখেছি। চেয়েছি নিজেকে মানুষ গড়ার কারিগর বানাতে। তাই বলতেই পারেন, শিক্ষকতা আমার প্রেম।

 

এমন কোনো দিনের কথা মনে পড়ে, যেদিন স্কুলে পৌঁছাতে খুব কষ্ট হয়েছিল।

আমার বাড়িটি অপেক্ষাকৃত নিম্নাঞ্চলে। স্কুলে যাওয়ার পথে অনেক দিনই কষ্ট হয়। পাঁচ-ছয় বছর আগের কথা। বন্যা হয়েছিল। মণিরামপুর-নওয়াপাড়া সড়কের  ধোপাদী বটতলা থেকে সোড়াডাঙ্গা পর্যন্ত পানিতে ডুবে গিয়েছিল। আমি জায়গাটা সাঁতরে পার হয়েছিলাম। সেদিন কষ্ট বেশিই হয়েছিল। তার পরও ঠিক সময় স্কুলে পৌঁছাতে পেরেছিলাম। আরেক দিন জ্বর নিয়ে স্কুলে গিয়েছিলাম। সেদিন আমার সহকর্মী ও শিক্ষার্থীরা আমার যত্ন নিয়েছিল। ভালো লেগেছিল খুব।

 

বাড়ির লোক আপনাকে কিছু বলে না?

ঘণ্টা দেওয়ার আগে স্কুলে পৌঁছানোর মধ্যে আমি আনন্দ পাই। আগে আমার স্ত্রী বকাঝকা করেছে। একসময় বন্ধুরাও ব্যঙ্গ করত। এখন কিন্তু সবাই আমাকে সহযোগিতা করে আর সম্মানও করে।

 

আপনি গণিতের শিক্ষক। অনেক ছাত্রই গণিত ভয় পায়। আপনার ছাত্ররা মনোযোগী থাকে?

এটা ঠিক, গণিত অপেক্ষাকৃত কঠিন বিষয়। তাই গণিতকে আকর্ষণীয় করতে শিক্ষককে নিজস্ব পদ্ধতি ব্যবহার করতে হয়। আমি ছাত্রদের সঙ্গে মিশে যাই বন্ধুর মতো। তাদের চেনা বিষয়গুলোর উদাহরণ দিয়ে গণিত বোঝাই। তাই ছাত্ররা মনোযোগী থাকে।

     ছবি : লেখক

 

 



মন্তব্য