kalerkantho


ফেসবুক থেকে পাওয়া

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



ফেসবুক থেকে পাওয়া

প্রেম একবার এসেছিল নীরবে

আমি তখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। একই ক্লাসে পড়ত আমাদের সামনের ফ্ল্যাটেরই আরেকটি মেয়ে। অল্প দিনেই তার সঙ্গে ভালো বন্ধুত্ব হলো। একদিন হঠাৎ দেখলাম তাদের বাড়ির ছাদে একটি ছেলে হাঁ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। পরপর কয়েক দিন একই ঘটনা ঘটল। একদিন বান্ধবীকে জিজ্ঞেস করলাম, ছেলেটি কে? বলল, ওর জ্যাঠতুতো দাদা। নাইনে পড়ে। বান্ধবীকে বললাম, তাকিয়ে থাকে কেন, জিজ্ঞেস করে জানাবি। দুদিন পর ক্লাসে এসে আমার বইয়ের ভাঁজে একটি চিঠি রেখে বান্ধবী বলল, চিঠিটা দাদা লিখেছে। ওর নাকি তোকে খুব ভালো লাগে। কৈশোর আর যৌবনের মাঝামাঝি এ সময়টা হয়তো এমন। তাই আমাকে ভালো লাগে—কথাটা মনের মধ্যে কেমন যেন একটা অন্য রকম অনুভূতি তৈরি করল। অপেক্ষার তর সইছিল না। টিফিনের সময় চিঠিটা পড়ে ফেললাম। শুরুতে লেখা ছিল ‘প্রিয় লাভ, কেমন আছেন? আপনাকে আমার খুব ভালো লাগে।’ আর শেষটায় লেখা ‘আমরা দুজনই ছোট। এখন এসব নিয়ে না ভেবে পড়ালেখা শেষ করি। তারপর ভাবা যাবে। চিঠিটা ময়লা-আবর্জনা ভেবে ফেলে দেবেন না, প্লিজ।’

চিঠিটা যত্ন করেই রেখেছিলাম। আমিও চিঠি লিখতাম, সে-ও লিখত। আদান-প্রদান চলত সেই বান্ধবীর মাধ্যমে। স্কুল থেকে এসে রোজ ছেলেটি ছাদে উঠত। বাস্কেট বল খেলত, ঘুড়ি ওড়াত আর আড়ালে থেকে আমায় দেখত। ভীষণ মিষ্টি ছিল দেখতে। তার বাস্কেট বলের শব্দ শুনলে আমি রেলিংয়ের ধারে গিয়ে দাঁড়াতাম। এভাবে একটি বছর কেটে গেল। সে ক্লাস টেইনে উঠল। স্কুল থেকে পিকনিকে যাবে রাঙামাটি। আগের দিন সন্ধ্যায় ছাদে উঠে টর্চ জ্বালিয়ে কিছু খুঁজছিল। বারবার টর্চের আলো আমার পড়ার টেবিলে এসে পড়ছিল; কিন্তু টিউটর আসায় বের হতে পারলাম না। পরদিন বিকেলে তাকে ছাদে দেখতে না পেয়ে কেন যেন খুব মন খারাপ লেগেছিল। সন্ধ্যায় বান্ধবীর ফোন—তার দাদা লেকে পড়ে গেছে। খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ওদের বাসা থেকে কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছিল। আমিও কেঁদেছিলাম; কিন্তু আড়ালে। কেউ জিজ্ঞেস করলে কী বলব এই ভয়ে। মনে একটা বিশ্বাস ছিল, ঠিকই একটা ভালো খবর আসবে; কিন্তু এলো না। পরদিন তার লাশ ফিরল বাড়িতে। সাদা কাপড়ে জড়ানো, ফুলের বিছানায় নিষ্পাপ মানুষটি ঘুমিয়ে আছে সারা জীবনের মতো। আর কখনো ছাদে আসবে না, কখনো আমায় দেখবে না, কখনো চিঠিও লিখবে না—এসব মনে হলে লুকিয়ে কাঁদতাম। ভালোবাসতে পেরেছিলাম কি না জানি না। ভালোবাসা কী সেটাও বুঝতাম না তখন; কিন্তু আজও রাতের আকাশে তারাদের মাঝে একবার হলেও সেই মুখটি ভেসে ওঠে। হয়তো এটাই ভালোবাসা, প্রথম প্রেম।

—অদিতি চক্রবর্তী তৃণা

চট্টগ্রাম কলেজ

 

 

আম্মু আমাদের সুপার হিরো

ছোটবেলা থেকেই আমাদের সব আবদারের ভাণ্ডার আম্মু। আমাদের মধ্যেই নিজের জীবনের সব সুখ খুঁজে পান তিনি। অসুস্থ শরীর নিয়ে আমাদের সুস্থ রাখতে উঠে-পড়ে লেগে যান। একবার তরকারি কাটতে গিয়ে আঙুল সামান্য কেটে গিয়েছিল আমার। এটা দেখে অস্থির আম্মু। বললেন, ‘যাহ, ওঠ। তোর আর কাজ করতে হবে না।’ মরিচ কাটতে হাত জ্বলে জানতে পারার পর থেকে মরিচ কাটতে বারণ করলেন। ছোটবেলায় বাথরুমে গেলে সেখানে মশার কয়েল জ্বালিয়ে দিতেন। বয়স ১৮ পার হলেও মনে হয় না আম্মুর চোখে বড় হয়েছি। এখনো পর্যন্ত আমার কাপড় একটু ময়লা হলেই ধুয়ে দেওয়া, জামার কোথাও ছেঁড়া দেখলেই সেলাই করে দেওয়াটা রীতিমতো আম্মুর অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। আর আব্বুর কড়া শাসন থেকে বাঁচতে সেই আম্মুই ভরসা।

আগে যেখানে এক মুহূর্তও থাকতাম না, এখন সেখানে ৯ দিন হলো তোমাকে ছাড়া থাকছি আম্মু। বড় মেয়ে বলে সংসারের দায়িত্বগুলো এখন আমাকে পালন করতে হচ্ছে। আচ্ছা আম্মু, এত নিখুঁতভাবে সব কাজ কেমনে সামলাতে তুমি? এমন পরিস্থিতির সামনাসামনি না হলে হয়তো অনুভব করতাম না এসব কিছু। যা একটু তোমার কাজে হাত লাগাতাম, কিছুই ছিল না ওটা। সব কাজ তুমিই তো করতে। অনেকবার রান্না শেখাতে চেয়েছিলে। পাত্তাই দিইনি। কিন্তু এখন দেখো, নিজেই এটা-ওটা রান্না করছি। সবাই জানতে চায়, তুমি কোথায়। বলি, তোমার ব্রেস্ট ক্যান্সার হয়েছে। প্রতিটি মুহূর্ত তোমাকে মিস করছি। সব কিছুতে তোমার ছোঁয়া, তোমার প্রতিচ্ছবি। তুমি বারবার বলার পরও করতাম না কাজগুলো। এখন নিজ দায়িত্বে করছি। ছোট বোন তানজিলাও এখন আমাকে সাহায্য করে। আম্মু, তোমাকে ছাড়া সংসার এত বেশি অগোছালো, ভাবতে পারি না। এখন কত দিন, রাত তোমাকে ছাড়া থাকতে হচ্ছে। আম্মু, তুমি আমাদের সুপার হিরো। সামনে তোমার অপারেশন হবে। তারপর কেমোথেরাপি দেবে। আম্মু, খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ফিরে আসো।

—নূরজাহান লিজা

পটিয়া, চট্টগ্রাম

 

 

ছুটি শেষ হলো কেন?

ব্যাগপত্র গোছাতে গোছাতে ছেলে মাকে বলে, ‘মা, আমার ছুটি শেষ। আজ রাতেই ঢাকা চলে যাব।’ রান্নাঘরের ধোঁয়ার আড়াল থেকে চোখ মুছতে মুছতে মা জবাব দেয়, ‘বাজান, আর কটা দিন কী থাকা যায় না? সবে তো ঈদ গেল?’

বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছেলেটি মাথা ঝাঁকিয়ে মায়ের অনুরোধ ফিরিয়ে দেয়। মায়ের মুখটি যেন তখনই ছোট হয়ে আসে। অন্তরটাও ছোট হয়ে আসে। ছেলে ঢাকা চলে যাবে! আবার কত দিন যে দেখা হবে না, সেসব চিন্তা করতে থাকে মা।

ছেলে তার বন্ধুদের ফোন করে। ‘কিরে, তোরা কি ঢাকায় আসছিস?’ এসব শুনে মা আরো ভারাক্রান্ত হয়। এবার বুঝতে পারে ছেলে সত্যিই আজ রাতেই ঢাকায় চলে যাবে।

কোরবানি ঈদ উপলক্ষে বাড়িঘর মাংসে ভরপুর। ছেলের এসব পছন্দ না। তাই তার বাবা বাজার থেকে স্বাদু পানির মাছ এনেছে। মা ছেলের জন্য ওসব রান্না করে খাওয়ায় দুপুরে। কিন্তু এখন তো বিকেল। ছেলে বলে কি না সন্ধ্যায় রওনা করব। রাতের ট্রেনে উঠব।

মা ছেলেকে বলে, ‘আমি আবার ভাত রান্না করি বাজান? তুমি খেয়ে বের হও।’ ছেলে বলে, ‘না মা, থাক। আমি রাতে হোটেলে খেয়ে নেব।’ ছেলের কথায় যেন মায়ের বুকটা ফেটে যায়। এত দিন আমার হাতের রান্না খেল, আর আজ বলছে হোটেল থেকে খাবে। এই তো বুঝি ছেলে আমার ধীরে ধীরে দূরে চলে যাচ্ছে।

ঢাকায় ছেলে পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। মোবাইলে কথা বলে মা শান্তি পায় না। এক-দুই মিনিট বলতেই ছেলে ফোন রেখে দেয়। তাই ছেলের বিদায়ের সময় মা বলে, ‘বাজান, আমার সঙ্গে একটু কথা বল।’ ছেলে মায়ের সঙ্গে কথা বলতে থাকে। মা লোভ সামলাতে না পেরে ছেলের সঙ্গে কথা বলতে বলতে বাজারের কাছেই চলে আসে। মা ছেলেকে ভ্যানে উঠিয়ে দিয়ে আঁচলে মুখ ঢেকে কাঁদে আর বলতে থাকে, ‘আমার ছেলের ছুটি শেষ হলো কেন?’

মোহাম্মদ অংকন

শিক্ষার্থী, সিএসই

বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি

 



মন্তব্য