kalerkantho


বিশাল বাংলা

স্বপ্না ও তাঁর অটোরিকশা

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



স্বপ্না ও তাঁর অটোরিকশা

‘এই নাগেশ্বরী ৩০ টাকা। একের পালি (একজন বাকি)। ওঠেন সাটাম (দ্রুত) চলি যামো’—কুড়িগ্রামের ঘোষপাড়ার স্বপ্নারানীকে এ কথা বলতে শোনেন দিনের অনেক সময়। এক দিন তাঁর অটোরিকশায় চেপে নাগেশ্বরী গিয়েছিলেন আব্দুল খালেক ফারুক

 

কুড়িগ্রাম শহর ছেড়ে নাগেশ্বরী উপজেলা সদর পর্যন্ত যাত্রী পরিবহন করেন স্বপ্নারানী। তিন বছর ধরে অটোরিকশা চালাচ্ছেন তিনি। তাঁর স্বামী নিখোঁজ ১১ বছর হয়। সংসারের হাল তুলে নিয়েছেন নিজের কাঁধে। চালাচ্ছেন অটোরিকশা।

 

নতুন দিনের শুরু

নাগেশ্বরী উপজেলার ভিতরবন্দ ইউনিয়নের দিকদারি গ্রামে বাড়ি স্বপ্নারানী বর্মণের। পঞ্চম শ্রেণিতে ওঠার পর লেখাপড়া আর করতে পারেননি। বিয়ে হয়ে গিয়েছিল পাশের ফুলবাড়ী উপজেলার নগরাজপুর গ্রামে। স্বামী রতনচন্দ্র বর্মণ ছিলেন রাজমিস্ত্রি। প্রায়ই যৌতুকের জন্য নির্যাতন করত স্বামী রতন। শেষে অভিযোগ করেন একটি বেসরকারি সংস্থায় গিয়ে। তাতেই দুর্যোগ নামে। মেয়ে রাধারানী আর তিন দিন বয়সী সন্তান হৃদয়চন্দ্রকে রেখে রতন হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। শ্বশুরবাড়িতে থাকারও সুযোগ হয়নি আর। দরিদ্র বাবার বাড়িতে চলে এসেছিলেন। স্বামী পালিয়ে যাওয়ার পরের দুই বছর খুব কষ্ট গেছে। তখন তিনি দিনমজুরি করতেন। মেয়ের লেখাপড়াও বন্ধ করে দিতে হয়। তবে মনোবল হারাননি স্বপ্না। সব সময় ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেছেন। বলছিলেন, ওই দিনগুলোতে নানা রকম কাজ করেছি। রাস্তায় মাটি কাটার কাজও করেছি। নারীদের ভাগ্যোন্নয়ন বিষয়ক একটা প্রশিক্ষণ কর্মশালায় গিয়ে শেষে পথ খুঁজে পেলাম। ডিসি স্যার এসেছিলেন একদিন। জানতে চেয়েছিলেন, তোমাদের মধ্যে কে আছ সাহসী, যে অটো চালাতে পারবে? আমিই শুধু হাত তুলেছিলাম। আমাকে প্রথম একটি সাইকেল দেওয়া হয়েছিল। সাইকেল চালানো শেখার পর অটো চালাতে দেওয়া হলো। ভিতরবন্দ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম নিজে আমাকে অটো চালাতে শিখিয়েছেন। সেই থেকে এই রাস্তায় আছি তিন বছর ধরে।’

স্বপ্নার সারা দিন

সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অটোরিকশা চালান স্বপ্না। নাগেশ্বরী, ভূরুঙ্গামারী, বঙ্গসোনাহাট, ভিতরন্দের পথে ছুটে চলেন স্বপ্না। রোগী নিয়ে রংপুর শহরে ছুটতে দেখা যায় তাঁকে। জানালেন, দৈনিক ৮০০-১০০০ টাকা আয় হয়। তাঁর ১৪ বছরের মেয়ে রাধারানী এখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। ১১ বছর বয়সের ছেলে হৃদয় পড়ে প্রথম শ্রেণিতে। রাধারানী বললেন, মা সকালে উঠেই খাবার তৈরিতে লেগে যান। নিজে ৮টার মধ্যে খেয়েই বেরিয়ে পড়েন। ফিরতে ফিরতে সেই রাত ৮টা।’

কেউ বাদ যায় না

নারী-পুরুষ, জোয়ান-বুড়ো সবাই তাঁর অটোয় চড়ে। কেউ সংকোচ বা দ্বিধা করে না। পাটেশ্বরীর যাত্রী মফিদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রথমে একটু অবাক হয়েছিলাম তাঁর (স্বপ্নার) অটো চালানো দেখে। ভয়ে ভয়ে উঠতাম না। কিন্তু যখন দেখলাম সে অন্যদের মতোই স্বচ্ছন্দ, তখন বলতে গেলে নিয়মিত যাত্রী হয়ে গেলাম।’ স্বপ্না বললেন, ‘শুরুতে কেউ কেউ খারাপভাবে দেখেছে। দু-চারটি মন্দ কথাও বলেছে; কিন্তু বড় কোনো সমস্যা কখনোই হয়নি।’ এখনো টাকা জমানোর সুযোগ পাচ্ছেন না স্বপ্না। তবে একটি পিকআপ কেনার স্বপ্ন তিনি দেখেন। সেটি ভাড়া দেবেন। তাতে আশা করেন সংসারে কিছু সচ্ছলতা আসবে।

 

তাঁরা বললেন

স্বপ্নার বড় ভাই নারায়ণচন্দ্র। বললেন, ‘শত বিপদেও মনোবল হারায়নি আমার বোন। সংগ্রামী মানুষ সে। তাই সবাই তাকে পছন্দ করে। নাগেশ্বরীর ইউএনও তাকে একটি ঘর করে দেয় আমার দেওয়া তিন শতক জমিতে। ওখানেই স্বপ্না ছেলে-মেয়েদের নিয়ে থাকছে। প্রতিবেশী কৃষ্ণচন্দ্র বললেন, ভিতরবন্দ ইউনিয়ন এখন স্বপ্নার নামেই পরিচিতি পাচ্ছে বেশি। স্বপ্না গ্রাম থেকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ কিংবা বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে রোগী নিয়ে যান। তাতে রোগীদের অনেক সুবিধা হয়েছে।

ভিতরবন্দ ইউপি চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম বললেন, ‘আমি নিজে স্বপ্নাকে অটো চালানো শিখিয়েছি। সে প্রমাণ করেছে নারীরাও পারে।’

 

 



মন্তব্য