kalerkantho


লোকনায়ক

আকবর স্যার

বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৭ ফুটবলে দেশের ২৭২টি স্কুলের মধ্যে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল রাজশাহীর গোদাগাড়ীর সোনাদিঘি হাই স্কুল। একজন আকবর স্যার ছিলেন তাদের প্রেরণা হয়ে। তাঁর সঙ্গে দেখা করে এসেছেন নাসির উদ্দিন হুমায়ূন

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



আকবর স্যার

১২ মে। কমলাপুর স্টেডিয়ামে চলছিল ক্লিয়ারমেন বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৭ ফুটবলের ফাইনাল খেলা। ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজের প্রতিপক্ষ রাজশাহীর সোনাদিঘি স্কুল। দর্শক গ্যালারিতে সোনাদিঘি গ্রামের প্রধান শিক্ষক মাইনুল ইসলামের পাশের লোকটির উত্তেজনা চোখে পড়ার মতো। আমার পাশে বসা একজন বললেন, ‘দেখেন, এই রকম উদ্যমী শিক্ষক আছেন বলেই আজ এই স্কুলটা ফাইনাল খেলতে পারছে।’

নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা গোলশূন্য ড্র। হেড স্যারের পাশের শিক্ষকের মুখে যেন রাজ্যের অন্ধকার। হারলে বুঝি বেচারার মাথা খারাপ হয়ে যাবে! অতিরিক্ত সময়ে কর্নার থেকে গোল পেয়ে গেল সোনাদিঘি স্কুল। এক গোলেই শিরোপা। বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৭ ফুটবল পেল নতুন চ্যাম্পিয়ন। আনন্দে আত্মহারা দর্শক। মাইনুল স্যারের পাশের লোকটিও তখন মাঠে বাচ্চাদের মতো লাফাচ্ছেন। ভাবছিলাম, এ রকম একজন ক্রীড়া শিক্ষকই তো সোনাদিঘি স্কুলের বড় অনুপ্রেরণা, যিনি সারাক্ষণ উত্সাহ দিতে পারেন, ভুল শোধরাতে পারেন, আর খেলোয়াড়দের সঙ্গে খুশিতে নাচতেও পারেন। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের পর লোকটির কাছে যাওয়ার সুযোগ পেলাম। কথায় কথায় জানলাম, তিনি সোনাদিঘি স্কুলের শিক্ষক নন। এমনকি ক্রীড়া শিক্ষকও নন! সোনাদিঘি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরের মাটিকাটা আদর্শ ডিগ্রি কলেজের সাচিবিক বিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। নাম আলী আকবর। এলাকায় সবার প্রিয় আকবর স্যার। সোনাদিঘি স্কুলের খুদে ফুটবলারদের দেশজয়ের নেপথ্যের নায়ক।

রাজশাহী শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে গোদাগাড়ী উপজেলায় সোনাদিঘি হাই স্কুল। এ অঞ্চলে নিম্ন আয়ের আদিবাসী সম্প্রদায়ের বসবাস। স্কুলের প্রধান শিক্ষক মাইনুল ইসলাম জানালেন, ‘টুর্নামেন্ট যখন শুরু হবে তখন এখানে ধান কাটার মৌসুম। স্কুলের ছেলেরা এই কয়দিন মাঠে ধান কাটতে পারলে বছরের বাকি দিনগুলোতে দুমুঠো খোরাকি হয়। তাই কেউ খেলতে রাজি ছিল না। আকবর স্যার আর আমি বাড়ি বাড়ি গিয়ে বুঝিয়ে মাঠে এনেছি। কিন্তু একটু ভয়ও ছিল। যদি জিততে না পারি তাহলে তো সময়ও নষ্ট হলো, ছেলেদের পরিবারের আয়েও ব্যাঘাত ঘটল। আকবর স্যার আমাদের মুখ রেখেছেন।’

আকবর স্যার ছোটবেলা থেকেই ক্রীড়া-পাগল মানুষ। জানালেন, ‘গোদাগাড়ীতে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৫ বছর ১০০০ ও ১৫০০ মিটার দৌড়ে কখনো দ্বিতীয় হইনি।’ মানুষের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শক্তি-সামর্থ্য কমে আসে, আর অভিজ্ঞতা বাড়তে থাকে। একসময় আকবর স্যারেরও খেলার মাঠে দৌড়ানোর সামর্থ্য কমে আসে। তখন তিনি ছোট শিশুদের নিয়ে ফুটবল প্রশিক্ষণ ক্যাম্প করা শুরু করলেন। বছরে দুই মাস উপজেলার বিভিন্ন স্কুলের ছেলে-মেয়েকে নিয়ে বয়সভিত্তিক দল গড়ে প্রশিক্ষণ দেন। অভাবী ঘরের ছেলে-মেয়েকে নিয়ে আকবর স্যারের এই মাতামাতি অনেকেরই সন্দেহের কারণ হয়েছে। কেউ বললেন, টাকা কামানোর ধান্ধা, কেউ বললেন, নিজেকে প্রচার করার জন্য এসব করছেন। কোনো কিছুতেই কান না দিয়ে আকবর স্যার ছেলে-মেয়েকে নিয়ে তপস্যা করেই গেছেন।

২০১৩ সাল থেকে শুরু করেন একাডেমিক প্রশিক্ষণ। গ্রামের খুদে ফুটবলারদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি মাঠের রীতিনীতিও শেখান। তাঁর কাছে ফুটবল ও অন্যান্য খেলার নিয়মকানুন-সংবলিত অনেক বই রয়েছে। ক্রীড়াজগৎসহ খেলাধুলাসংক্রান্ত বিভিন্ন ম্যাগাজিন আছে প্রায় দুই হাজারের মতো। গোদাগাড়ীর বিভিন্ন স্কুলের ছেলে-মেয়েকে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছেন ফুলবল মাঠে। পরিশ্রমের ফল পেতে শুরু করেন কয়েক বছরের মধ্যে। মেয়েদের অনূর্ধ্ব-১৪ ফুটবলে রাজশাহী জেলা চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় তাক লেগে যায় সবার। গত বছর সোনাদিঘি স্কুলের মেয়েরা বিভাগীয় পর্যায়ে খেলার সুযোগ পায়। ছেলেরাও বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় সাফল্য নিয়ে আসে। সবচেয়ে বড় অর্জনটি ধরা দেয় এ বছরের ১২ মে। দেশের ২৭২টি স্কুল দলের মধ্যে সেরা হওয়ার গৌরব অর্জন করে সোনাদিঘি হাই স্কুল। পাশাপাশি সেরা খেলোয়াড় আর সেরা গোলদাতার তকমাটাও লুফে নেয় সোনাদিঘির জগেন লাকড়া ও পরবিত কুমার।

সোনাদিঘি স্কুলের ছেলে-মেয়ের খেলার উপযুক্ত মাঠ নেই। তিনি একটু দূরের মাটিকাটা আদর্শ ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষকে রাজি করিয়ে বড় মাঠে প্র্যাকটিস করার সুযোগ করে দিলেন। এই কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুল আউয়াল বলেন, ‘আকবর এখানে শুধু আমাদের শিক্ষার্থী নয়, আশপাশের অনেক স্কুলের শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণ দেয়, উদ্বুদ্ধ করে। সোনাদিঘির ছেলেরা তো প্রশিক্ষণ ছাড়া এতদূর যেতে পারত না।’

আকবর স্যারের জন্ম সম্ভ্রান্ত পরিবারে। তাঁর বাবা আলতাফ হোসেন ভালো ফুটবল খেলতেন, লাঠি খেলায় বেশ সুনাম কুড়িয়েছেন। খেলাধুলা আকবর স্যারের রক্তে মিশে আছে। ছোটবেলায় আবাহনীর খেলা দেখতে চাচার সঙ্গে ঢাকা গেলেন। আবাহনী গোল করা মাত্রই ছোট্ট আকবর তখন চিত্কার করে লাফিয়ে উঠলেন। তারপর তাঁর মাথায় পানির বোতল পড়তে থাকল। পরে জানতে পেরেছেন তিনি মোহামেডান সমর্থকদের গ্যালারিতে ঢুকে পড়েছেন। নিজের এলাকায় খেলে নাম কুড়িয়েছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা দলেও খেলেছেন। এখন তিনি উপজেলা ক্রীড়া সমিতির সাধারণ সম্পাদক।

১৯৯১-৯২ সালে ঢাকায় ফার্স্ট ডিভিশনে খেলার সুযোগ পেয়েও বাবার অসুস্থতার কারণে যেতে পারেননি। বড় ভাই চার ছেলেমেয়ে রেখে মারা যান। তাদের পিতৃস্নেহে বড় করে তোলেন আকবর স্যার ও তাঁর মেজো ভাই। বাড়ির সামনের খালি জায়গায় নিজ হাতে লাগিয়েছেন পেয়ারা, আমড়া, কমলা, মাল্টা, নারিকেলসহ বিভিন্ন রকমের ফল। তাঁর স্ত্রী মাকসুদা নেসতারি স্থানীয় একটি স্কুলের শিক্ষক। একমাত্র মেয়ে মুসকান এখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। আকবর স্যার নিজের পরিবার দেখে রাখেন পরম মমতায় আর এলাকার হতদরিদ্র শিক্ষার্থীদের বুকে স্বপ্নের বীজ বুনে চলেন।

খেলা নিয়ে এত ভাবেন কেন? এই প্রশ্নে তাঁর মুখ একটু মলিন হয়ে ওঠে। বলেন, ‘সীমান্তবর্তী হওয়ায় আমাদের এলাকা মাদকের জন্য বেশি পরিচিত। এটাকে অনেকে আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের রুট বলে। কোথাও গেলে অনেকে আমাদের দিকে একটু অবিশ্বাসের চোখে তাকায়। খুব খারাপ লাগে। আমি এই অপবাদ ঘোচাতে চাই।’

 

 



মন্তব্য