kalerkantho


জুতাগুলো এখন কোথায় যাবে?

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



জুতাগুলো এখন কোথায় যাবে?

একসময় জুতাগুলো অফিসে গেছে, স্কুলে গেছে বা দাপিয়ে বেড়িয়েছে মাঠ। কিন্তু এখন কোথায় যাবে—এমন প্রশ্ন সামনে রেখে ১২ জোড়া জুতা নিয়ে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল উদীচী। সেই সঙ্গে ছিল সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো ৪৭ জনের ছবি ও মৃত্যুর করুণ কাহিনি। উদীচীর কেন্দ্রীয় কমিটির সহসাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দের সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

 

যাদের জুতা পাওয়া গেছে

♦ আব্দুল করিম রাজীব (ছাত্র, ঢাকা/নোয়াখালী)

♦ অ্যাডভোকেট হাবিবুর রহমান (আইনজীবী, বরগুনা)

♦ নীপা সাহা (ছাত্রী, জামালপুর)

♦ জাহেদুল হক মিলু (রাজনীতিবিদ, কুড়িগ্রাম)

♦ আশফাক মুনীর মিশুক (শিক্ষক, সাংবাদিক, ঢাকা)

♦ বিধান দে রানা (ক্রিকেটার, জামালপুর)

♦ আম্বিয়া বেগম (গৃহবধূ, টাঙ্গাইল)

♦ উত্তম কুমার দেবনাথ (চাকরিজীবী, পরিবেশ আন্দোলনকর্মী, মানিকগঞ্জ)

♦ এস এম শাহরিয়ার সৌরভ সেজান (চাকরিজীবী, ঢাকা)

♦ আমিরুল ইসলাম (ছাত্র, নাটোর)

♦ মোজাম্মেল (ছাত্র, নাটোর)

♦ লিথি মণ্ডল (নৃত্যশিল্পী, যশোর)

 

‘নিরাপদ সড়কের দাবিতে যখন ছাত্র আন্দোলন চলছিল, সে সময় ভাবছিলাম কিছু একটা করার কথা। এমন কিছু করতে চেয়েছিলাম, যেটা মানুষের বিবেককে নাড়া দেবে। জুতার ভাবনাটি মূলত আশরাফুল আলম রতনের। সে পেশায় স্থপতি। একসঙ্গে একসময় আমরা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছি। রতনকেই ফোন দিয়েছিলাম আর সে-ই জুতাগুলোর কথা বলেছিল। এরপর উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার তপন, প্রদীপ ঘোষ, মারুফ রহমান, জিয়াউর রহমান লিটুসহ আরো কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ করলাম। তাঁরা বললেন, উদ্যোগ নিন। আমরা আছি। আগস্টের ৫ তারিখের কথা।’ 

 

পরের দিন লিখলেন

৬ আগস্ট খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠলেন অমিত। সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত প্রায় ৮০০ জনকে মেসেঞ্জারে এসএমএস পাঠালেন। মতামত চেয়েছিলেন এই লিখে—তোপখানা রোডে উদীচী অফিসের সামনে যে ফাঁকা জায়গাটা আছে, সেখানে আগামী শুক্র বা শনিবার সড়ক দুর্ঘটনায় যারা মারা গেছে তাদের জুতা, ছবি এবং সংক্ষিপ্ত জীবনী নিয়ে একটা প্রদর্শনীর আয়োজন করতে পারি?

ভালো সাড়া মিলল। পরে উদীচীর ফেসবুক পেজ এবং গ্রুপে আরেকটা পোস্ট দিলেন। তাতে লিখলেন, ‘আগামী বৃহস্পতি, শুক্র অথবা শনিবার উদীচী সড়ক দুর্ঘটনায় যারা মৃত্যুবরণ করেছে তাদের জুতা, ছবি ও সংক্ষিপ্ত জীবনী নিয়ে একটা প্রদর্শনীর আয়োজন করতে যাচ্ছে। আপনার নিকটজন কেউ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হলে তার ওপরের তিনটি উপকরণ সংগ্রহ করে দিয়ে সহায়তা করুন।’ অমিতের কাছে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের একটা তালিকা ছিল। সে তালিকা ধরে টাঙ্গাইল, বরগুনা, রাজশাহীসহ বিভিন্ন জায়গায় ফোন করলেন। ১২ তারিখে উদীচীর একটি নাটকের শো ছিল শিল্পকলা একাডেমিতে। সেখানেও দর্শকদের বলেছেন।

মীম ও রাজীব। এই দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পরই দেশব্যাপী শুরু হয় নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন

পাওয়া না-পাওয়ার গল্প

চট্টগ্রামের মিরসরাই আবু তোরাব স্কুলের ৪৫ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছিল সড়ক দুর্ঘটনায়। সেখানকার চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলো। চেয়ারম্যান বললেন, জোগাড় করে পাঠাবেন। তবে শেষ পর্যন্ত আর পাঠাননি। নির্মাতা তারেক মাসুদের জুতা জোড়ার জন্য চেষ্টা করেছেন। ক্যাথরিন মাসুদ তখন ঢাকার বাইরে ছিলেন। তাই তারেক মাসুদের জুতা পেতে পেতে প্রদর্শনীর সময় পার হয়ে যায়। কারওয়ান বাজারে দুই বাসের টক্করে প্রথমে হাত ও পরে প্রাণ হারানো সরকারি তিতুমীর কলেজের ছাত্র রাজীবের জুতাও সংগ্রহ করতে পারেননি। অমিত জানালেন, প্রথমে রাজীবের পরিবার জুতা দিতে রাজি হয়েছিল। কিন্তু নানা কারণে পরে পিছিয়ে যায় তারা।

বিপরীতে অনেকের কাছ থেকে আশাতীত সাড়া পেয়েছিলেন। যেমন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী সেজানের স্ত্রী মুনিয়ার কথা বলতে হয়। ফোনে আলাপ হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি ই-মেইলে সেজান সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য পাঠিয়ে দিলেন। পরে জুতা জোড়াও দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, আমি চাই বারবার সেজানের নামটি উচ্চারিত হোক। মিশুক মুনীরের বাসায় গিয়ে জুতা নিয়ে এসেছিলেন অমিত নিজেই। মিশুক মুনীরের স্ত্রী মঞ্জুলী কাজী জানিয়েছেন, জুতা নিয়ে এক ধরনের ভালোলাগা ছিল তাঁর স্বামীর। বেশ কয়েক জোড়া জুতা ছিল তাঁর। শেষ পর্যন্ত তিনি অমিতকে সেটাই দিলেন, যেটা পরে মিশুক মুনীর সচরাচর ক্যামেরার পেছনে দাঁড়াতেন।

 

১২ জোড়া জুতা

১৩ তারিখে প্রথম দুই জোড়া হাতে পেলেন অমিত। জামালপুর থেকে উদীচীর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সেগুলো নিয়ে এসেছিলেন। এরপর কুরিয়ারে একজোড়া জুতা এলো টাঙ্গাইল থেকে। এভাবে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে একে একে ১২ জোড়া জুতা এলো। দুর্ঘটনায় স্বজন হারানো অনেকে জুতা দিতে না পারলে চিঠি বা ই-মেইলে তথ্য দিয়েছেন। এভাবে দেশের নানা প্রান্তে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৪৭ জন সম্পর্কে তথ্যও পেলেন তাদের পরিবার এবং বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে। ১৯৯৯ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তির জুতা যেমন পেলেন, তেমনি সর্বশেষ জুলাই মাসে নিহত রমিজ উদ্দিন স্কুলের শিক্ষার্থী রাজীবের জুতাও ছিল প্রদর্শনীতে। অমিত বললেন, ‘পরিবারগুলোর কাছে জুতাগুলো স্মারক, সম্পদ। স্বাভাবিকভাবেই এগুলো তারা আগলে রাখতে চাইবে। তাই সবার কাছে দিতেও চাইবে না। আমাদের ওপর বিশ্বাস রাখায় কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।’ 

কেঁদে ফেরে শূন্য পাদুকা

প্রথমে ভেবেছিলেন উদীচী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের খোলা জায়গাটায় প্রদর্শনী হবে। পরে সে ভাবনা থেকে সরে আসতে হলো। কারণ সামনের রাস্তায় খোঁড়াখুঁড়ি চলছিল। রাস্তার ওপর ইট-বালু রাখার কারণে এমনিতেই মানুষের চলাচলে কষ্ট হয়। পরে শাহবাগ বা টিএসসির কথাই ভাবলেন। শেষে টিএসসির স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বর ব্যবহারের অনুমতি পেলেন। অমিত বললেন, ১৭ আগস্ট প্রদর্শনীর দিন। আগের দিন উদীচীর চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা বিভাগের সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ ঘোষ বললেন, শুধু জুতা নয়, গাড়ির চাকা, গ্লাস, হেলমেট, ভ্যানিটি ব্যাগ, চশমাসহ মানুষের ব্যবহৃত সামগ্রী থাকলে কেমন হয়?’ পরে প্রদীপ ইনস্টলেশনের মাধ্যমে পুরো চত্বরে সড়ক দুর্ঘটনার আবহ ফুটিয়ে তুললেন। কালো কাপড়ের ওপর ছিল জুতা জোড়া। পেছনে নিহত ব্যক্তির ছবিসহ দুর্ঘটনার বিবরণ। দিনব্যাপী প্রদর্শনী চলল। শিরোনাম, ‘কেঁদে ফেরে শূন্য পাদুকা’। মিশুক মুনীরের স্ত্রী মঞ্জুলী কাজী, সেজানের স্ত্রী মুনিয়াসহ অনেকেই এসেছিলেন। প্রদর্শনী দেখে ডা. চন্দন দাস নামে একজন মন্তব্যের খাতায় লিখেছেন, মর্মন্তুদ স্মৃতি জাগানিয়া, দুঃখ জাগানিয়া প্রদর্শনী। সব পক্ষের প্রতি ঘৃণার, ক্ষোভের একটি স্বাক্ষর।’

প্রশ্ন রেখে গেলেন

অমিত বললেন, যে হারে প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে, আমরা সে রকম বড় ধাক্কা দিতে পারিনি। তবে চেয়েছিলাম নীতিনির্ধারক ও সাধারণ মানুষকে নাড়া দিতে। এই জুতাগুলো একসময় অফিসে গেছে, স্কুলে গেছে, মাঠে গেছে। এই প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে সবার কাছে প্রশ্ন করতে চেয়েছি, এই জুতাগুলো এখন কোথায় যাবে?

ভবিষ্যতে ধানমণ্ডি, মিরপুর, গেণ্ডারিয়াসহ শহরের বিভিন্ন জায়গায় আরো প্রদর্শনী করবেন বলে জানালেন অমিত। তিনি আরো বলেন, এই প্রদর্শনীর পর সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত অনেকের আত্মীয়-স্বজন যোগাযোগ করেছেন। জুতা সংগ্রহ কার্যক্রমও চলবে। ইচ্ছা আছে জুতা জোড়া দেশের বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যাওয়ার।

 

হারিয়ে যাওয়া কয়েকজন

♦ এস এম শাহরিয়ার সৌরভ সেজান। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন। ভালো গিটার বাজাতেন। শখ ছিল রান্না করা। মজার মজার রান্না করে মাঝেমধ্যেই তাক লাগিয়ে দিতেন। একটা রেস্টুরেন্ট দেওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। ১ জুলাই সকালে মায়ের হাতে খিচুড়ি খেয়েছিলেন। তারপর হেলমেটটা তুলে নিয়েছিলেন হাতে। স্ত্রী মুনিয়া এগিয়ে দিয়েছিলেন লিফট পর্যন্ত। মিনিট বিশেক পর ফোনে মুনিয়া জানতে পারেন সেজান দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। মুনিয়া প্রথমে ভেবেছিলেন, হাতে বা পায়ে আঘাত পেয়েছেন।  হাসপাতালে গিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, জরুরি বিভাগ কোন দিকে? এর মধ্যে একজন এগিয়ে এসে সান্ত্বনা দিতে থাকে আর বলে, সবই ওপরওয়ালার ইচ্ছা। মেনে নাও। মুনিয়া বুঝতে পারেন না কী মেনে নিতে বলছে। বিয়ের বছরও গড়ায়নি। তাঁকে ধরে ধরে একটা হিমশীতল ঘরে নিয়ে গেল কয়েকজন। দেখলেন সাদা কাপড়ে পুরোটা ঢাকা সেজান আরাম করে ঘুমাচ্ছেন। এখনো মুনিয়া প্রতিদিন কলিংবেলের অপেক্ষা করেন। ভাবেন সেজান ফিরলে একসঙ্গে খাবেন। একসঙ্গে অনেক পথ পাড়ি দেবেন বলেছিলেন সেজান। কিন্তু রাত গভীর হয়, সেজান ফেরেন না।

♦ ক্রিকেট রানাকে টানত ছোটবেলা থেকেই। ভালো ক্রিকেটারও হয়ে উঠেছিলেন। জামালপুরের ছেলে। ঢাকায়ও খেলেছেন। দ্বিতীয় বিভাগে শেখ রাসেল ক্রিকেট ক্লাবের অধিনায়ক হয়েছিলেন। ব্যবসাতেও উন্নতি করেছিলেন। মোটরসাইকেল চালাতে পছন্দ করতেন। নতুন মডেলের মোটরবাইক বাজারে এলে রানার কেনা চাই। ২০১৭ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সকালে বাইক চালিয়ে ব্যবসার কাজে যাচ্ছিলেন ইসলামপুর। নসিমনের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান।

♦ খুলনা মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ৮ম শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন লিথি মণ্ডল। নাচের প্রতি ঝোঁক ছিল। পাশাপাশি গল্প-কবিতা লিখতেন, আবৃত্তিও করতেন। ২০১০ সালের মার্কস অলরাউন্ডার প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য মায়ের সঙ্গে রওনা হয়েছিল।  নওয়াপাড়ার তালতলায় একটা ট্রাকের মুখোমুখি হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান লিথি।

♦ সিরাজগঞ্জের শাহজাহান আলম। ছোট মেয়েকে নিয়ে খুলনায় বড় মেয়েকে দেখতে যাচ্ছিলেন। তাদের বাস ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর নামের এক জায়গায় পৌঁছলে উল্টো দিক থেকে আসা অপর একটি বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ বাধে। শাহজাহান মেয়েকে জানালা দিয়ে বাইরে ঠেলে দেন কিন্তু নিজে মারাত্মকভাবে আহত হন। স্থানীয় একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শাহজাহান মারা যান। এটা ১৯৯০ সালের ঘটনা।

♦ জাহেদুল হক মিলু ছিলেন চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সভাপতি ছিলেন। গত ১২ মে রাতে সাংগঠনিক কাজে ঢাকা থেকে কুড়িগ্রাম যান মিলু। ১৩ মে সকালে উলিপুর থেকে জেলা সদরে ফেরার পথে দুর্ঘটনার শিকার হন। কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতাল থেকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজে নেওয়া হয় তাঁকে। সেখান থেকে নিয়ে আসা হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। ১৭ মে উন্নত চিকিৎসার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ৩২ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ১৩ জুন ২০১৮ তিনি মৃত্যুবরণ করেন।



মন্তব্য