kalerkantho


আসতে আজ্ঞা হয়, আসুন
তুমি কাদের কুলে বৌ

ইকবাল মতিনের কলের গান

৯ জুন, ২০১৮ ০০:০০



ইকবাল মতিনের কলের গান

ইকবাল মতিনের সংগ্রহে আছে প্রায় আট হাজার গ্রামোফোন রেকর্ড। এর মধ্যে গান তো আছেই, ভাষণও আছে, নাটকও আছে। উদয় শংকর বিশ্বাস দেখে অবাক বনেছেন 

 

ইকবাল মতিন রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক। জানালেন, উনিশ শতকের শেষ ভাগ থেকে বিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত গান শোনার জন্য কলের গান ছাড়া উপায় ছিল না কিছু। ১৯০২ সালে প্রথম ৭৮ আরপিএম (প্রতি মিনিটে ৭৮ ঘূর্ণন, পঞ্চাশের দশক পর্যন্ত চালু ছিল বেশি) রেকর্ড প্রচলনের মাধ্যমে ভারতবর্ষে কলের গানের যাত্রা শুরু হয়। আর তার চল ছিল আশির দশক পর্যন্তও। 

 

জমিদারের উৎসাহ পেয়েছিলেন

নওগাঁর কাশিমপুরের জমিদার ছিলেন শরত্কুমার মৈত্র। ইকবাল মতিন তাঁর সাহচর্য পেয়েছিলেন। তাঁরই উৎসাহে কলের গান সংগ্রহ করা শুরু করেছিলেন ইকবাল মতিন। তখন তাঁর বয়স ১৩ মোটে। তিরিশের দশক পর্যন্ত প্রকাশিত রেকর্ড সংগ্রহ করতেই বেশি পছন্দ করেন। চল্লিশের দশকেরও আছে কিছু। তবে ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে এমন রেকর্ড তা যে সময়েরই হোক সংগ্রহে রাখতে চান ইকবাল মতিন। রাজশাহী শহরের সাগরপাড়ায় থাকেন তিনি। একটি পুরো ঘর তাঁর রেকর্ডঘর।    

একজন ইকবাল মতিন

 ১৯৫৬ সালে তাঁর রাজশাহীতে জন্ম। কলেজিয়েট স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেছেন। এইচএসসি পাসের পর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ রাজশাহীতে ভর্তি হন। এখন এটি রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট)। ১৯৭৯ সালে তিনি পুরকৌশলে বিএসসি প্রকৌশলী হন। ওই বছরই প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পানিসম্পদ কৌশল বিষয়ে স্নাতকোত্তর হন। তিনি একজন জনপ্রিয় বেহালা বাদকও। প্রখ্যাত বেহালাবাদক পণ্ডিত রঘুনাথ দাসের শিষ্য তিনি। 

বিভিন্ন আকারের রেকর্ড 

বেশি প্রচলিত ১০ ইঞ্চি রেকর্ড তো আছেই; তিন, চার, পাঁচ, ছয়, সাত, আট ও ৯ ইঞ্চি মাপের রেকর্ডও সংগ্রহে রেখেছেন ইকবাল মতিন। দুষ্প্রাপ্য ১১, ১২ আর ১৬ ইঞ্চি মাপের রেকর্ডও আছে তাঁর সংগ্রহে। আছে জাদুমনি বাইজি, মিস ফুলকুমারী, লালচাঁদ বড়াল, গোবিন্দ গোস্বামীর রেকর্ড। নিকোল কম্পানির পিচবোর্ড রেকর্ড যেমন আছে, ভোগ কম্পানির প্লাস্টিক রেকর্ডও আছে। ভোগ কম্পানির রেকর্ডগুলোকে পিকচার রেকর্ড বলা হতো। কারণ বিষয়ের সঙ্গে মিল রেখে সেগুলোর ওপর ছবি থাকত। 

 

দুর্লভ সংগ্রহ

লালচাঁদ বড়ালের খেয়ালের কথাই ধরা যাক। ১৯০২ সালের রেকর্ড। শশীমুখী ও ফণীবালার বাংলা গানও ওই বছরই ধারণ করা। তারপর ওস্তাদ এমদাদ খাঁর সেতার বাদনের রেকর্ড। ১৯০৪ সালে প্রকাশিত। ইকবাল মতিনের সংগ্রহে আছে এগুলো। তারপর ওস্তাদ তালিম হুসেনের সানাই এবং বীণকার ওস্তাদ আব্দুল আজিজ খাঁর রেকর্ডের প্রথম কপিও আছে ইকবাল মতিনের সংগ্রহে। কিরানা ঘরানার ওস্তাদ আব্দুল করিম খাঁ সাহেবের বীণা বাদনের রেকর্ডও আছে ইকবাল মতিনের কাছে। জার্মানির Odeon কম্পানি বের করেছিল রেকর্ডটি। করিম খাঁ সাহেবের স্ত্রী সরস্বতী বাই মিরাজকারের রেকর্ডটিও আছে ইকবাল মতিনের সংগ্রহে।

 

কণ্ঠসংগীতের সংগ্রহ

গ্রামোফোন রেকর্ড কম্পানি প্রথম বাজারে আনে গহরজানের রেকর্ড ১৯০৩ সালে। শশীমুখী ও ফণীবালার কণ্ঠ ধারণ করা হয়েছে আগে, কিন্তু বাজারে এসেছে গহরজানের পরে।  মিস গহরজান নামে পরিচিত এই শিল্পীর ২৮টি রেকর্ড আছে ইকবাল মতিনের সংগ্রহে। উল্লেখ করার মতো ব্যাপার অমলা দাস, কুমারী সরোজ, বেদানা দাসী, মিস বরদাসুন্দরী, সত্যবালা দেবী, রমা বাই, যমুনা দাসী, বিনোদিনী দাসী, মানদাসুন্দরী দাসী, নীহারবালা, কোহিনূরবালা, আঙ্গুরবালা, ইন্দুবালা, চারুবালা, রেনুবালা, বিন্দুবালা, কাননবালা, ফিরোজা বেগম প্রমুখ নারী কণ্ঠশিল্পীর হাজারের বেশি রেকর্ড আছে তাঁর সংগ্রহে। আর পুরুষ কণ্ঠশিল্পীদের তালিকায় আছেন বিজয় গোপাল লাহিড়ী, হেমচন্দ্র সেন, নিকুঞ্জ বিহারী দত্ত, লালচাঁদ বড়াল, পান্নালাল সরকার, নারায়ণচন্দ্র মুখার্জি, দ্বিজেন্দ্রনাথ বাগচী, তিনকড়ি চক্রবর্তী, কৃষ্ণচন্দ্র দে, অঘোরনাথ চক্রবর্তী, রাধিকাপ্রসাদ গোস্বামী, বলাই দাস শীল, চিত্তরঞ্জন গোস্বামী, রামকৃষ্ণ লাহিড়ী, ধীরেন দাস, কে মল্লিক, পাহাড়ী স্যানাল, ভবানীচন্দ্র দাস, কে এল সায়গল, রাধাগোবিন্দ গোস্বামী, এ এন মল্লিক, জে এন দাস, এ গফুর, পুলিন বিহারী, নলিনীকান্ত সরকার, আবদুল লতিফ প্রমুখ। 

যন্ত্রসংগীতের সংগ্রহ

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, ওস্তাদ উজির খাঁ, ওস্তাদ চুন্নু খাঁ, ওস্তাদ দবীর খাঁ, ওস্তাদ আমির খাঁ, ওস্তাদ হুসেন খাঁ প্রমুখ সরোদ শিল্পীর রেকর্ড আছে ইকবাল মতিনের কাছে। সানাইশিল্পী আলী বিসমিল্লাহ খাঁর গুরু আলী বখশের রেকর্ডও আছে। সেতার বাদকদের তালিকায় আছেন ওস্তাদ এনায়েত খাঁ, ওস্তাদ বরকতুল্লাহ খাঁ প্রমুখ। হারমোনিয়াম, তবলা, বীণা, সারেঙ্গী, বেহালা, সানাই, বাঁশি, এসরাজ, জলতরঙ্গ, সুর শৃঙ্গার ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্রের প্রায় সব শিল্পীর রেকর্ড আছে।

পালা, নাটক, গান

বিশ শতকের শুরুতেই কলকাতায় গড়ে উঠেছিল বেশ কয়েকটি থিয়েটার। যেমন স্টার থিয়েটার, ন্যাশনাল থিয়েটার, ক্লাসিক থিয়েটার, মিনার্ভা থিয়েটার ইত্যাদি। তখন হরিশ্চন্দ্র, চন্দ্রগুপ্ত, আলিবাবা, সীতার বনবাস, অন্নদামঙ্গল, সাবিত্রী, নিমাই সন্ন্যাস, বিদ্যাপতি, মীরাবাই, বেহুলা, দাতা কর্ণ, দক্ষযজ্ঞ, রামের বিবাহ, ভক্ত হরিদাস, জয়দেব ইত্যাদি পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক পালাগুলো খুব জনপ্রিয় ছিল। এমনতরো ৬৪টি রেকর্ড আছে ইকবাল মতিনের কাছে। অর্ধেন্দু শেখর মুস্তাফী, তিনকড়ি চক্রবর্তী, শিশিরকুমার ভাদুড়ী, নির্মলেন্দু লাহিড়ী, দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠ ধরে রেখেছেন ইকবাল মতিন। তাঁর কাছে তারাসুন্দরী, কোহিনূরবালা, কঙ্কাবতী, সুশীলা দাসী, প্রকাশমনি প্রমুখ অভিনেত্রীর গান ও নাটকের অংশবিশেষের রেকর্ডও আছে।

 

কলের গান ও রবীন্দ্রনাথ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্বকণ্ঠে ধারণ করা আটটি গান, ১০টি কবিতা ও গীতাঞ্জলির দুটি ইংরেজি কবিতার রেকর্ড আছে ইকবাল মতিনের কাছে। এর মধ্যে সোনারতরী কবিতার রেকর্ডটি খুবই মূল্যবান। Pathe H. Bose  এটি প্রকাশ করেছিল। প্রথমদিকে রবীন্দ্রসংগীতকে রবিবাবুর গান বা রবিঠাকুরের গান বলে প্রচার করত কম্পানিগুলো। অনেক শিল্পীকে দিয়ে রবীন্দ্রনাথের গান গাইয়েছে কম্পানিগুলো। শুরুটা ১৯০৪ সালে। দ্বিজেন্দ্রনাথ বাগচীর গাওয়া ‘কেন যামিনী না যেতে জাগালে না’ গানটির মধ্য দিয়ে।  আরো অনেকের নাম করা যায় মানদাসুন্দরী দাসী, কৃষ্ণাভামিনী, পূর্ণকুমারী দাসী, ব্রজেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলী, রাধিকাপ্রসাদ গোস্বামী, জিতেন্দ্রনাথ দত্ত, হরেন্দ্রনাথ দত্ত, সাহানা দেবী, মিস নীহারবালা, কানন দেবী, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় প্রমুখ। কানন দেবী, পঙ্কজ মল্লিক, কে এল সায়গল আর শচীন গুপ্তের চলচ্চিত্রে গাওয়া রবীন্দ্রসংগীতের রেকর্ড ইকবাল মতিন সংগ্রহ করেছেন বিভিন্ন সূত্রে। উল্লেখ্য, রবীন্দ্রসংগীত প্রথম চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত হয় ১৯৩৭ সালে, মুক্তি চলচ্চিত্রে। গেয়েছেন কানন দেবী।

 

রাজনৈতিক নেতাদের বক্তৃতা

মহাত্মা গান্ধীর বক্তৃতার এক দুর্লভ রেকর্ড আছে ইকবাল মতিনের সংগ্রহে। ১৯৩১ সালে ইংল্যান্ডের কলম্বিয়া রেকর্ড কম্পানি এটি প্রকাশ করেছিল। নাম—Spiritual Speech of Mahatma Gandhi । এতে গান্ধীজির  স্বাক্ষরও আছে। নেতাজি সুভাষ বসুর ১৯৪৩ সালের ২৫ জুন টোকিও রেডিওতে দেওয়া বক্তৃতার অংশবিশেষ গ্রামোফোন রেকর্ড কম্পানি রেকর্ড করেছিল। সেটিও তাঁর সংগ্রহে আছে। জওয়াহেরলাল নেহরু ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবসে দিল্লির লালকেল্লায় বক্তব্য দিয়েছিলেন। সে বক্তৃতা তিনটি রেকর্ডে প্রকাশ করা হয়েছিল। তিনটিই তাঁর সংগ্রহে আছে। ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি ড. রাজেন্দ্র প্রসাদের ঐতিহাসিক বক্তৃতাটিও আছে। আছে রাজা পঞ্চম জর্জ, রাজা অষ্টম জর্জ, লর্ড মাউন্টব্যাটেন, সরোজিনী নাইডু প্রমুখের ভাষণ।

 

শেষ হইয়াও হয় না শেষ

রেকর্ডগুলো বাজানোর জন্য সাতটি গ্রামোফোন যন্ত্র আছে ইকবাল মতিনের। এগুলো হলো—মধ্যম মাপের চোঙা বা হর্ন মডেল, বড় মাপের দুটি চোঙা বা হর্ন মডেল, কেবিনেট সিস্টেম, ব্রিফকেস সিস্টেম, প্যাথে মেশিন ও পাঁচ-ছয় ইঞ্চি রেকর্ড বাজানোর জন্য ছোট্ট মাপের করফফু ঢ়যড়হব। শেষেরটি ১৯২০ সালের তৈরি। প্রতিটি যন্ত্রই সচল আছে। কানন দেবীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল ইকবাল মতিনের। যখনই কলকাতায় যেতেন, দেখা করে আসতেন। তাঁর গাওয়া গানের ৫০-৬০টি রেকর্ড আছে তাঁর কাছে। কাজী নজরুল ইসলামের  ১৯২৮ সালে আবৃত্তি করা নারী কবিতাটির রেকর্ড যেমন আছে, অতুলপ্রসাদ সেনের একমাত্র এবং রজনীকান্ত সেনের বক্তৃতার রেকর্ডও আছে ইকবাল মতিনের ঘরে। বিশেষ উল্লেখ্য, হিন্দুস্তান রেকর্ড কম্পানি ১৯৩২ সালে যে রেকর্ডটি দিয়ে তাদের যাত্রা শুরু করেছিল, সে রেকর্ডখানাও তাঁর সংগ্রহে রয়েছে।

কানন দেবীর সঙ্গে ইকবাল মতিন     

 



মন্তব্য