kalerkantho


এখানে জীবন যেমন

মাহাতোদের গ্রাম বেতগাড়ী

আলমগীর চৌধুরী গিয়েছিলেন বেতগাড়ী। জয়পুরহাটের পাঁচবিবিতে এ গ্রাম। আদিবাসীদের গ্রাম নামে বেশি চেনা। জীবন এখানে কষ্ট করেই চলে

১২ মে, ২০১৮ ০০:০০



মাহাতোদের গ্রাম বেতগাড়ী

পাঁচবিবি উপজেলা সদর থেকে চার কিলোমিটার দূরে পাঁচবিবি-কামদিয়া সড়কের উত্তর পাশে বেতগাড়ী। অল্প দু-এক ঘর ছাড়া এখানকার সবাই মাহাতো, নয়তো সিং, নয়তো মালো, কেউ বা মাহালি। মোট ৬০০ ভোটারের গ্রাম। লোকসংখ্যা প্রায় এক হাজার। এখানকার প্রায় সবাই কৃষিজীবী। গাঁয়ের দক্ষিণ দিক দিয়ে বয়ে গেছে ছোট্ট একটি খাল। গাঁয়ের ভেতর দিয়ে মেঠোপথ। দুই ধারে বাড়ি। বেশির ভাগ মাটির তৈরি।

 

দিন বদলেছে

একসময় বন্য প্রাণী শিকার করেই দিন কাটাত তারা। কিন্তু সময় বদলাল। কৃষিকাজ হয়ে উঠল প্রধান পেশা। মাঠ থেকে ফিরছিলেন সরস্বতী পাহান। বললেন, ‘এখানে আমরা সবাই কৃষিকাজ করি। আমাদের সে রকম জমি নেই। আসলে মজুরি দিই। শুনেছি দাদারা শিকার করত। আমরা এখন কৃষিই করি।’ সরস্বতীর কাছেই জানলাম, গ্রামে দু-একজন শিক্ষক আছেন। আছেন ভ্যানচালক, দোকান কর্মচারীও আছেন কয়েকজন। এখন তাঁরা ছেলে-মেয়েদের স্কুলে দিচ্ছেন। আগে স্কুলেও যেত না বেশি কেউ।

রুপা মাহাতোকে পেলাম কিছুদূর গিয়ে। নীলফামারী সরকারি কলেজ থেকে মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়ে এখন বাড়িতে আছেন। বাবা কার্তিক মাহাতোর তিন সন্তানের মধ্যে রুপা সবার বড়। ছোট বোন ববিতা কাছের উঁচাই বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজের ছাত্রী। একমাত্র ভাই অনীক মাহাতো অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। কৃষিকাজ করেই বাবা তাদের পড়ার খরচ জোগাচ্ছেন।

যুবক সুদেপ সিংয়ের সঙ্গেও দেখা হলো ঘুরতে ঘুরতেই। তিনি পাঁচবিবির হাজী মুহসীন সরকারি কলেজের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। বললেন, আমাদের ধারে-কাছে বেশি স্কুল-কলেজ নেই। তবু এখন গাঁয়ের কম করেও ২০-২৫ জন ছেলে-মেয়ে  উচ্চশিক্ষা নিচ্ছে।  

ভ্যানচালক ধীরেন সিং বললেন, ‘পড়ালেখা না করে আমরা ভুল করেছি। আমাদের সন্তানরা সেই ভুল যেন না করে, তাই কষ্ট স্বীকার করেই তাদের পড়ালেখার খরচ চালাচ্ছি।’

বাতি সব ঘরে জ্বলে না

মোট আড়াই শ পরিবার বেতগাড়ীতে। তার মধ্যে ৭০টি পরিবার বিদ্যুতের আলো পায় না। এর মধ্যে ৪০টি পরিবারে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার জন্য খুঁটিও গাড়া হয়েছে, কিন্তু সংযোগ মেলেনি। শিক্ষক ধীরেন্দ্র পাহানের এ নিয়ে রাগ রয়েছে। বললেন, ‘আমরা গরিব বলে আমাদের নিয়ে কারুর মাথাব্যথা নেই। সবাই উল্টো আমাদের নিয়ে রাজনীতি করে। কিন্তু আমাদেরও খাওয়া-পরা লাগে। বাচ্চাদের পড়াশোনা আছে। এই দেখুন এক কিলোমিটার এই পথের মাত্র ২০০ মিটারে ইট বিছানো। বৃষ্টিতে কাদায় মাখামাখি হয়। তাহলে বলুন কিভাবে বাঁচি?’

এই গাঁয়ের একমাত্র জনপ্রতিনিধি (ইউপি সদস্য) সহদেব সিং। জানালেন, তিনবারের চেষ্টায় এবারই প্রথম আটাপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য নির্বাচিত হতে পেরেছেন। নির্বাচিত হয়েই দুই দফায় গাঁয়ের ভেতরের মেঠোপথের ২০০ মিটারে ইট বিছিয়েছেন।

 

গরু আছে বাড়িতে

মনিকা মাহাতো বাড়ির এক ধারে বেঁধে রাখা গরুকে ঘাস খাওয়াচ্ছিলেন। বললেন, ‘আমরা সবাই খেটে খাই। কৃষিকাজের পাশাপাশি সবাই কমবেশি গরু-বাছুর, ছাগল বা হাঁস-মুরগি পালি।’ কয়েকজন নারী শ্রমিককে গাঁয়ের ভাঙা রাস্তায় মাটি ফেলতে দেখে এগিয়ে যাই। সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত কাজ করলে মাথাপিছু ২০০ টাকা করে মজুরি পান। শ্রমিকদের একজন কমলা মাহাতো বললেন, ‘আমাদের নির্দিষ্ট পেশা নেই। সামনে বোরো মৌসুম। তখন ধান কাটব। কাজ না থাকলে অনেক সময় বসেও থাকি। তখন খুব অভাব হয়।’

ভাষাটাও থাকছে না

বেতগাড়ীর ভাষা সাদরি ভাষা। আগে ব্র্যাক যে স্কুল চালাত সেখানে ছেলে-মেয়েদের সাদরি ভাষায় পড়ানো হতো। পরে সে প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যায়। তাই ছেলে-মেয়েরা সাদরি ভাষায় পড়ার সুযোগ পাচ্ছে না আর। সরস্বতী যেমন বলছিলেন, ‘চর্চা না থাকায় তাঁর দুই বাচ্চার কেউ-ই সাদরি ভাষা ঠিকমতো বুঝতে পারে না।’ ঘড়ির কাঁটা তখন ১টার ঘর ধরতে দৌড়াচ্ছিল। সূর্য মাথায় চড়েছে বেশ অনেকক্ষণ হলো। ফেরার পথ ধরতে হয় এবার। সাইকেল চালিয়ে দিলাম মেঠোপথ ধরে। শেষে গিয়ে উঠলাম পাকা সড়কে। বেতগাড়ী পিছিয়ে পড়তে থাকল। কিন্তু মানুষগুলো চলছিল বুঝি সঙ্গে সঙ্গে।

 

ছবি : লেখক



মন্তব্য