kalerkantho


মা তোমায় সালাম

মা গরিব হয় না

মাটিকাটা শ্রমিক মমতাজ বেগম স্বামী পরিত্যক্তা। মেয়েকে নিয়ে কোনোভাবে দিন পার করেন। হঠাৎ একদিন একটি প্রতিবন্ধী ছেলের দায়িত্ব নিতে হয় তাঁকে। সেটি সাত বছর আগের কথা। হাবিবুর এখনো আছে তার সঙ্গে। দেখে এসেছেন মাসুম সায়ীদ

১২ মে, ২০১৮ ০০:০০



মা গরিব হয় না

মমতাজের মাথায় কোদাল আর টুকরি। সারা দিন মাটি কেটে গাঁয়ে ফিরছিলেন মমতাজ বেগম। ধামরাই উপজেলার সুতিপাড়া ইউনিয়নের বালিথা দক্ষিণপাড়ায় তাঁর বাড়ি। পাড়ার মুখেই রাস্তার পাশে মসজিদ। মসজিদের সামনে লোকের ভিড়। ভিড় দেখে যত না কৌতূহল, তার চেয়েও বেশি উদ্বেগ জাগে তাঁর মনে। ত্রস্ত পায়ে তিনি এগিয়ে যান ভিড়ের কাছে। এক-দেড় বছরের একটি শিশুকে ঘিরে ভিড়। লোকের মুখে শোনা যায় ঘটনা—কে বা কারা ফেলে গেছে শিশুটি। সেই সকাল থেকে মসজিদের মাইকে প্রচার করা হয় প্রাপ্তি সংবাদ। কিন্তু মা-বাবা অথবা আত্মীয় পরিচয়ে এগিয়ে আসেনি কেউ। এখন খোঁজা হচ্ছে একজন পালক পিতা বা মাতা। প্রথম প্রথম দু-একজন উৎসাহ দেখিয়েছিল। কিন্তু প্রতিবন্ধী শিশু দেখে একে একে পিছিয়ে যায়। মুশকিলে পড়েন মসজিদের ইমাম আর কয়েকজন মাতবর। অনাথ, অসহায় শিশুটি এভাবে ফেলে যেতে পারছিলেন না তাঁরা। এমন সময়ই মাটিকাটা শ্রমিক মমতাজ অকুস্থলে হাজির হন। ঘটনা প্রায় সাত বছর আগের।

 

গাঁয়ের লোকের স্বস্তি

মমতাজের বাবাও ছিলেন মাটিকাটা শ্রমিক। ভিটা ছাড়া আর কিছু ছিল না তাঁর। মমতাজের বিয়ে হয়েছিল মহিশাষী গ্রামে। আর একটি বিয়ে করে স্বামী তাঁকে তালাক দেয়। তত দিনে জন্ম হয়েছে দুই মেয়ের। মমতাজ খালি হাতে দুই মেয়ে নিয়ে ফিরে আসেন বাপের বাড়ি। বাবার মৃত্যুর পর একমাত্র ভাই তাঁর বাড়ির অংশ বিক্রি করে চলে যান অন্যত্র। আর খোঁজ-খবর রাখেননি বোনের। অগত্যা মমতাজকে বেছে নিতে হয় বাবার পেশা। পুরুষের মতোই মাটির টুকরি তিনি নেন মাথায়। বেঁচে থাকার সংগ্রামে তাঁর শরীর রূপ নেয় পুরুষের কাঠিন্যে। কিন্তু বুকের তলায় মনটা তখনো নরম। মাতৃত্বের মমতায় বেশি কোমল। শিশুটির জলভরা চোখ আর অসহায় মুখ দেখে তিনি থাকতে পারেন না। বাড়িয়ে দেন হাত। আশ্চর্য! ছেলেটিও মমতাজের কোল পেয়ে শান্ত হয়ে যায়। মিলিয়ে যায় বুকের মধ্যে। মসজিদের ইমাম আর গাঁয়ের মাতবররা স্বস্তি পান। এরই মধ্যে শিশুটিও শান্ত হয়ে গেছে। মমতাজকে ভেবেছে মা। মমতাজের নিজের ছেলে নেই। বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। ছোটটির বিয়ে হলে সে একা হয়ে যাবে। ছেলেটি রইল তাঁর অন্ধের নড়ি হয়ে। হোক না প্রতিবন্ধী। আল্লাহর দান ভেবে ছেলেটির লালন-পালনের ভার নেন মমতাজ। ইমাম সাহেব ছেলেটির নাম দেন হাবিবুর রহমান—দয়াময়ের বন্ধু।

 

বোনও পেল হাবিবুর

মা-বাবা পরিত্যক্ত হাবিবুর পেল মা। আর মমতাজ পেলেন ছেলে। মা-ছেলে বাড়ি ফিরল। বাড়িতে ছিল ছোট মেয়ে পারুল। ভাই পেয়ে পারুলও খুশি। পরদিন কাজে যাওয়ার সময় হয়ে গেল। ভাতের বাটি আর টুকরি-কোদাল নিয়ে মমতাজকে বেরিয়ে পড়তে হলো। সেদিন স্কুলে যেতে পারল না পারুল। ওইটুকুন একটা ছেলে! না পারে কথা বলতে আর ভালো করে বসতে। মুখ দিয়ে লালা পড়ে অবিরত। ঘাড়টাও সোজা রাখতে পারে না ঠিকমতো। সে বাড়িতে একা থাকবে কী করে! তার পরের দিনও স্কুলে যাওয়া হলো না পারুলের। তার পরের দিনও না। সপ্তাহ ও মাস পার হয়ে গেল এভাবেই। একসময় স্কুলই ছেড়ে দিল পারুল। পারুল আছে বলেই মমতাজ নিশ্চিন্তে কাজে যান হাবিবুরকে রেখে। মা না ফেরা পর্যন্ত পারুলই হাবিবুরের বোন ও মা। যত্ন করে। খাওয়ায়। গোসল করায়। ঘুম পাড়ায়। এমনকি কেঁদেকেটে অস্থির হলে তাকে কোলে নিয়ে বেড়ায়। দিন শেষে মমতাজ ফিরে এলে পারুল অবসর পায়।

 

পারুলের বিয়ে হয়ে যায়

পারুলের স্কুল ছেড়ে দেওয়ায় মমতাজ একটু কষ্ট পেলেও মেনে নেন অসহায় হাবিবুরের মুখের দিকে চেয়ে। এভাবে একসময় বছরও গড়ায়। একসময় মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব আসে। পাকাপাকিও হয়ে যায় সম্পর্ক। বিয়ে হয় পারুলের। পারুল চলে যায় শ্বশুরবাড়ি। হাবিবুরকে নিয়ে মমতাজ হয়ে পড়েন একা। হাবিবুর তত দিনে বেড়ে উঠেছে খানিকটা। বারান্দার খুঁটির সঙ্গে আড়াআড়ি করে বাঁধা বাঁশটা ধরে দাঁড়াতে পারে। দু-এক পা হাঁটতেও পারে। তবু তাকে একা ফেলে সারা দিনের জন্য কাজে যাওয়া সম্ভব নয়। মাটির কাজ ছেড়ে দেন মমতাজ।

 

সুস্থ করার প্রচেষ্টা

মাটিকাটার কাজ ছেড়ে দিয়ে টিকে থাকার তাগিদে মমতাজ বেছে নেন ঝিয়ের কাজ। এ বাড়ি ও বাড়ি টুকটাক কাজ করে যা পান তাই দিয়ে কায়ক্লেশে চালাতে থাকেন জীবন। এরই মধ্যে উদ্যোগ নেন হাবিবুরের চিকিৎসার। হাবিবুরকে নিয়ে যান ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত সিআরপি (সেন্টার ফর দ্য রিহ্যাবিলিটেশন অব দ্য প্যারালাইজড) হাসপাতালে। দেখেশুনে ডাক্তাররা আশ্বাস দেন—হাবিবুর ঠিক হয়ে যাবে, বড় হতে হতে। আশায় বুক বাঁধেন মমতাজ। গ্রামের পাশেই বাথুলী বাসস্ট্যান্ড। সেখানে একটি সংস্থার উদ্যোগে পরিচালিত হয় কল্যাণী প্রতিবন্ধী স্কুল। মমতাজ সেখানে ভর্তি করিয়ে দেন হাবিবুরকে। সকালে নিয়ে যেতে হয় স্কুলে। বিভিন্ন কার্যক্রম চলে দুপুর পর্যন্ত। মমতাজকেও স্কুলে থাকতে হয় পুরোটা সময়। মাস তিনেক পর থেমে যেতে হয় মমতাজকে। অর্ধেক দিন এভাবে পাড় করলে সংসার চলবে কেমন করে? হাবিবুরের স্থান হয় মমতাজের ছোট্ট ঘরের বাঁশ বাঁধা একচিলতে দাওয়ায়।

 

মা-ছেলে চলে এক রকম

বয়স হয়ে গেছে মমতাজের। আগের মতো পরিশ্রম করতে পারেন না। মেয়েরাও দরিদ্র। ইচ্ছা থাকলেও টানতে পারে না মাকে। মা-ছেলের জীবন এখন পরনির্ভর। পাড়া-প্রতিবেশীরা টুকটাক সাহায্য করে। এলাকার মেম্বর একটি ভিজিএফ (ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং) কার্ড দিয়েছেন। আর ঈদের মাঠে মসজিদ-মাদরাসার জন্য সংগৃহীত চাঁদা থেকে মসজিদ কমিটি দেয় কিছু। আর দান-সদকা জাকাত-ফেতরার টাকা লোকেরা ইচ্ছা করে যা দেয় তাই দিয়ে চলছে হাবিবুরকে নিয়ে মমতাজের সংসার।

 

যত দিন বেঁচে আছেন তত দিন

নিজের পেটে ধরেননি। তবু কবে যে হাবিবুরের সত্যিকারের মা হয়ে উঠেছেন মমতাজ তা তিনি নিজেও জানেন না। হাবিবুরকে ছেড়ে থাকার প্রশ্নই ওঠে না। হোক প্রতিবন্ধী। হাবিবুর এখন তাঁরই সন্তান। মাতৃত্বের মমতা দিয়েই তিনি আগলে রাখতে চান হাবিবুরকে। অন্তত যত দিন সে বেঁচে আছে তত দিন। তারপর কী হবে তিনি জানেন না।

 

ছবি : লেখক



মন্তব্য