kalerkantho


আরো জীবন

বাবুল গানওয়ালা

ঠোঁটে লিপস্টিক। পুরো মুখ পাউডারে ঢাকা। মাঝেমধ্যে জরির চিকমিকি। গায়ের পাঞ্জাবি কমলা রঙের। পায়জামাও তাই। কোমরে রুমাল, পায়ে কেডসের ওপর ঘুঙুর বাঁধা। কাঁধে আছে একটি হারমোনিয়াম। পাওয়া গেল সান্তাহার রেলওয়ে স্টেশন জংশনের টিকিট কাউন্টের পাশে। অনেক গল্পই করেছেন মাসুদ রানা আশিক

৭ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



বাবুল গানওয়ালা

তাঁর নাম বাবুল হোসেন বাবু। বাড়ি নওগাঁ সদরের ভুতলা কাঠখড় হাটে। আসল বয়স তাঁর জানা নেই। জাতীয় পরিচয়পত্রে ৫২ বছর লেখা আছে। গান গেয়ে বেড়াচ্ছেন ৩৫ বছর ধরে। গান গেয়েই জীবন চালান। কখনো শহরের রাস্তায়, কখনো দূরের গাঁয়ে, কখনো মজমায় গান গেয়ে বেড়ান বাবুল। তিনি যে গান করেন তার নাম ছাইদুলের কিস্সা।

 

ছাইদুলের বাড়ি জানা নেই

ছাইদুলের কিস্সা কেন? প্রশ্ন করি বাবুলকে।

বলেন, ‘ছাইদুল নামের এক লোক এই গান গাইত। তাই নাম ছাইদুলের কিস্সা।’

ছাইদুল কোথাকার মানুষ?

‘বাড়ি ঠিক বলতে পারব না। আমার সঙ্গে পরিচয় মান্দা ফেরিঘাটের সুটকা ফকিরের মাজারে। ছাইদুলের গান শুনে আমার ভালো লেগে যায়। তাঁকে আমি বলি, ওস্তাদ আপনার সঙ্গে থাকতে চাই। গান গাইতে চাই।’

অনুমতি দিয়েছিলেন ছাইদুল। তারপর থেকে ছাইদুলের সঙ্গেই ছিলেন। বিয়ের গান বেশি গাইতেন ছাইদুল। বিয়ের অনুষ্ঠানে দাওয়াত পেতেন। তাঁর শিষ্যও কম নয়। আরো অনেকেই ছাইদুলের গান গেয়ে বেড়ান।

 

গানের সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই

ছাইদুলের কাছে গান শিখলেও গানের প্রতি বাবুলের আকর্ষণ ছোটবেলা থেকেই। বাবার সঙ্গে ছোটবেলায় মাছ ধরতে যেত বাবুল। বাবা বড়শি ফেলতেন বিলে আর গুনগুন করে গাইতেন। বাবার দেখাদেখি বাবুলও গাইত। এভাবেই শুরু। বাবা মারা যাওয়ার পর বাবুলও মাছ ধরার কাজ করেছে অনেক দিন। সংসারে এখন আছে তাঁর মা ও তিন মেয়ে। স্ত্রী মারা গেছে অনেক দিন হয়। বাবুলই পুরো সংসার চালান।

 

বাবুল কিন্তু আরো গান জানেন

লোকে তাঁর কাছে বেশি শুনতে চায় ছাইদুলের কিস্সা। কিন্তু বাবুল আরো অনেক গান জানেন। যেমন  মমতাজের গান, ভাটিয়ালি গান, রূপবানের গান, মুর্শিদি গান প্রভৃতি। কিছুদিন একটা গানের দলের সঙ্গেও ছিলেন, তবে এখন একা একাই ঘুরে ঘুরে গান করেন। সব দিন এক জায়গায় যান না। কোনো দিন মান্দা তো কোনো দিন নজিপুর। তারপর আছে ধামুইরহাট, জয়পুরহাট, সান্তাহার, বগুড়া, তানোর, আত্রাই বা ঈশ্বরদী। আশপাশে মেলা হলেও যান। মেলায় লোক বেশি হয়। উপার্জনও হয় বেশি।

 

আর সাজতে ভালো লাগে না

‘বাবা আমি গণ্ডমূর্খ।’

পড়তে তো পারতেন? প্রশ্ন করি।

‘তখন তো বুঝি নাই, পড়াশোনার এত দাম। বাপের সঙ্গে মাছ ধরতে গেছি। গান গাইছি। ছাইদুল ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে। তাঁর সঙ্গে গান গাইছি। অনেক সময় যাত্রাপালা করেছি। পড়াশোনার কথা মনেই আসেনি।’

এখন আর সাজগোজ ভালো লাগে না বাবুলের। কিন্তু উপায় নেই। একদিন শুধু পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে বেড়িয়েছিলেন। কিন্তু উপার্জন হয়নি। কেউ কেউ বলেছে, ‘বাবুল, তোমাকে না সাজলে ভালো লাগে না।’ গানের তালে তালে বাবুল ভালো নাচতেও পারেন।

 

আয় মন্দ নয়

পুরনো জায়গায় আয় বেশি হয় না, তবে নতুন কোনো জায়গায় গেলে ভালো মজমা হয়। এমনো হয়েছে মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাঁর গান শুনেছে। অনেকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে খাওয়ায়। নতুন জায়গায় দিনে হাজার, ১২০০ টাকাও রোজগার হয়। প্রতিদিন অবশ্য বের হন না। সপ্তাহে তিন না হলে চার দিন। অন্য দিনগুলোতে সংসারের কাজ করেন।

আপনার স্বজনরা পেশাটাকে ভালো মনে করে? জানতে চাইলাম। এমন প্রশ্নে কিছুক্ষণ চুপ থাকেন। তারপর বলেন, ‘সঙ সেজে মানুষ ডাকতে এখন আর আমারও ভালো লাগে না। প্রথম প্রথম মা বলতেন অন্য কাজ করতে। কিন্তু আসলে এখন সয়ে নিয়েছি। আমার তিনটি মেয়ে। খরচ কম নয়। তাদের কথা ভেবেই সঙ সেজে গান করে যাই। তবে গান গাইতে কিন্তু আমি ভালোবাসি। এটা আমার আত্মার খোরাক, মনের শান্তি।’ 

ছবি : লেখক



মন্তব্য