kalerkantho


সেকাল-একাল

ফিরিঙ্গিবাজার

নতুন ব্রিজের পর প্রথমে বাঁয়ে তারপর ডানে মোড় নিয়েছে কর্নফুলী। এই মোড়েই ফিরিঙ্গিবাজার। ফিরিঙ্গি শব্দে ইতিহাস আছে। মো. রেয়াজুল হক আবার গিয়েছিলেন

৭ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



ফিরিঙ্গিবাজার

সন্ধ্যার পর ভাসমান জাহাজে বাতি জ্বলে ওঠে। পানিতে পড়ে তার ছায়া

ফারসি শব্দ ফারাঙ্গ। সাদা মানুষ বোঝায়। ফারাঙ্গ থেকে ফিরিঙ্গি এসেছে। আমরা ফিরিঙ্গি বলতে ইউরোপীয় বিশেষ পর্তুগিজদের বুঝে থাকি। এককালে ফিরিঙ্গিবাজারে পর্তুগিজরা ব্যবসা করত, থাকতও অনেকে।

 

ফিরিঙ্গিবাজার এলাকা

কোতোয়ালি থানার মোড় থেকে কর্ণফুলী দক্ষিণে। নদীর উত্তর পার ঘেঁষে সড়কটি। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামে নাম। সড়কের বাম ধারে একটি খ্রিস্টীয় উপাসনালয়। চার্চের গা ঘেঁষে একটি গলি। গলির মুখেই এয়াকুব আলী দোভাষ ফ্রাইডে ফ্রি-ক্লিনিক। আরেকটু এগোলে জে এম সেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ। এরপর পাওয়া যায় আবু সাইদ দোভাষ জুমা মসজিদ। আরেকটু পরে দোভাষ মাঠ। দোভাষ মাঠে আছে কিছু ফলের আড়ত। তারপর কাঁচাবাজার। কাজী নজরুল ইসলাম সড়কটি ফিরিঙ্গি বাজার মোড়ে গিয়ে মিশেছে মেরিনার্স ড্রাইভ রোডের সঙ্গে। ওয়ার্ড কমিশনার কার্যালয় কাছেই। কমিশনার কার্যালয়ের উল্টোদিকে ডা. জাকির হোসেন হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল। ফিরিঙ্গিবাজার এসব কিছু নিয়েই।

 

এবার ইতিহাস

পর্তুগিজ নাবিক ও পর্যটক ভাস্কো দা গামা ভারতে এসেছিলেন ১৪৯৮ সালে। ভারত আগমনের পর ১৫১১ সালে পর্তুগিজরা মালাক্কা দখল করে নেয়। পরে তারা চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে একটি কারখানা ও কাস্টমঘর স্থাপন করে। এর ফলে খুব দ্রুত প্রায় পাঁচ হাজার পর্তুগিজ বা ইউরোপীয় লোকের বসতি গড়ে ওঠে। পরে এরা কর্ণফুলীর দুই পারে এবং আরো পরে সন্দ্বীপের বিশাল এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় তারা দেয়াঙে বিশাল নৌ ও সামরিক দুর্গ স্থাপন করে। একসময় মোগল নৌবাহিনী পর্তুগিজদের সহায়তায় আরকানিদের কাছ থেকে চট্টগ্রাম বন্দর উদ্ধার করে। উল্লেখ্য, শায়েস্তা খান চট্টগ্রাম দখলে আনেন ১৬৬৬ সালে। এর ফলে চট্টগ্রামে পর্তুগিজদের আধিপত্য ক্ষুণ্ন হয়। ঢাকার দিকে সরে যেতে থাকে তারা। রেখে যায় ফিরিঙ্গিবাজার। ফিরিঙ্গিবাজার ওয়ার্ডটির প্রতিষ্ঠা ১৯৩৭ সালে। এটি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড। শহর চট্টগ্রামের আর দশটি এলাকার মতোই এখনকার ফিরিঙ্গিবাজার। কয়েকটি জায়গায় লোক বেশি ভিড় করে। সেগুলোর কথা একটু বেশি করে বলা যায়।

 

ব্রিজঘাট

মেরিনার্স ড্রাইভ রোডের ফলের আড়তগুলো ফেলে এগোলেই কর্ণফুলী নদীর একটি ঘাট। এটি ব্রিজঘাট হিসেবে পরিচিত। ওপারে দক্ষিণকূল বা চরপাথরঘাটা। এই ঘাট দিয়েই সাম্পানে করে মানুষের যাতায়াত। মালামালও যায়। সারা দিনই পারাপার চলে। সকালে শহরমুখী মানুষের ভিড় বেশি থাকে। তারাই আবার কাজ শেষে বিকেলে ফেরত যায়। নদীর পারেই আছে বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়নকেন্দ্র, বরফ বিক্রয়কেন্দ ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের চট্টগ্রাম আঞ্চলিক অফিস।

 

কাঁচাবাজার

ফিরিঙ্গিবাজার মোড়ের একটু আগেই কাঁচাবাজার। দেশি ফলের আড়ত অনেক। কলা, জাম্বুরা, আখ, ডাব, নারিকেল কেনাবেচা চলে। কলার বিকিকিনি সবচেয়ে বেশি। ভাই ভাই ফার্মের মাঝি মোবারক হোসেনের সঙ্গে কথা হলো। বললেন, ‘বাংলা এবং চাঁপাকলা আসে খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, চন্দনাইশ থেকে। সাগরকলা আসে দিনাজপুর, মেহেরপুর ও মধুপুর থেকে। খুচরা বিক্রেতারা সারা শহর থেকেই আসে এখানে। কলার কাঁদি নিয়ে গিয়ে শহরের বিভিন্ন বাজারে খুচরা বিক্রি করে।’

 

অভয়মিত্র ঘাট

ফিরিঙ্গিবাজার মোড় থেকে ডানদিকে চলে যাওয়া রাস্তা ধরে সিটি করপোরেশনের কসাইখানার সামনে দিয়ে নদীর দিকে কিছুদূর গেলে অভয়মিত্র ঘাট। বেশ কিছু কাঠের আড়ত আছে এখানে। এরপর বন্দরের কর্মকর্তাদের আবাসিক এলাকা। বন্দর অফিসার্স কলোনি ফেলে সারদা শঙ্খমার্কা খাঁটি সরিষার তেল কারখানা, বন্দর ইলেকট্রিক সার্ভিস সেন্টার এবং বন কর্মকর্তার কার্যালয়। অভয়মিত্র ঘাট বেশি পরিচিত বেড়ানোর জায়গা হিসেবে। প্রতিদিন বিকেলেই অনেক মানুষ ভিড় করে। এখানকার নদীতে ছোট ছোট জাহাজ, ট্রলার নোঙর করা। সন্ধ্যার পর  ভাসমান জাহাজে বাতি জ্বলে ওঠে। পানিতে পড়ে তার ছায়া। ঢেউয়ে যায় ছড়িয়ে। শেষে মিলিয়ে যায়।



মন্তব্য