kalerkantho


অদম্য মানুষ

অন্ধ কবি

৩ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



অন্ধ কবি

কোহিনূর আক্তার জুঁই

বইমেলায় একদিন। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ছিল আলোয় ভরা। বন্ধুদের সঙ্গে রায়হান রাশেদ দাঁড়িয়েছিলেন মেলা প্রাঙ্গণে। ‘ভাই, আমি অন্ধ। এটা আমার কবিতার বই। একটু পড়ে দেখুন। ভালো লাগলে কিনুন।’ মাঝবয়সী মহিলার দিকে তাকিয়ে অবাক হলেন—

 

হাতে তাঁর সাদা-কালো একটি ছড়ি। সেটায় ভর দিয়ে জায়গা মেপে চলেন। চোখে মোটা ফ্রেমের কালো চশমা। কাঁধে মোটামুটি মাপের একটি ব্যাগ। হাতে বই। নিজের বই নিজেই বিক্রি করছেন। কথা বলছেন নরম গলায়। ধীরে ধীরে। হেসে হেসে। নাম কোহিনূর আক্তার জুঁই।

জুঁইয়ের কথা

১৯৬২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মাদারীপুর জেলার শিবচর থানার ভদ্রাসন গ্রামে তাঁর জন্ম। ভাই-বোনদের মধ্যে তিনি বড়। সাত বছর বয়সে বসন্তরোগে আক্রান্ত হয়ে দৃষ্টিশক্তি হারান। জুঁইয়ের চিকিৎসা করাতেই মাতা-পিতা ঢাকার আজিমপুরে এসে থাকতে শুরু করেন। চিকিৎসায় অবশ্য ফল হয়নি। একদিন বাড়ির সামনে ছোট বোনের সঙ্গে খেলছিল জুঁই। দূর থেকে তাঁকে দেখছিল একজন। নাম তাঁর মিস ভ্যালুলিকা ক্যামবেল। মিস ক্যামবেল পরে পিতা শেখ সাদীর সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন। জুঁইকে নিয়ে গিয়েছিলেন অন্ধদের কাজ শেখানোর এক প্রতিষ্ঠানে। সেখানে সেলাইয়ের কাজ শেখানো হতো। অল্পদিনেই জুঁই সড়গড় হয়ে যায়। প্রতি মাসে মাইনে ছিল ২০ টাকা। চার মাস কাজ করে পায় ৮০ টাকা। তারপর ১৯৭৭ সালে ভর্তি হয় মিরপুরের ব্যাপ্টিস্টসংঘ অন্ধ বালিকা বিদ্যালয়ে। সেখানে পড়াশোনা শিখতে থাকে জুঁই। সেখান থেকেই ১৯৮৬ সালে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। পরে বাংলা কলেজ থেকে ১৯৯৮ সালে এমএ পাস করেন।

তাঁর কবিতা লেখা

পাঠ্য বই দিয়েই শুরু। পাঠ্য বইয়ের কবিতা আর ছড়াগুলো তাঁকে টানত। তারপর ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় কবিতা লেখা শুরু করেন। তখন অবশ্য লিখতেন আর লেখার পর পরই ছিঁড়তেন। ছন্দটা ঠিকমতো ধরা দিচ্ছিল না। এভাবে অনেক দিন যায়। এইচএসসি পড়ার সময় এক বন্ধুকে দেখান তাঁর কবিতা। বন্ধুটি কবিতা পড়ে খুশি হয়। উৎসাহ দেয় অনেক। বলে, তুমি একদিন বড় কবি হবে।’

বিয়ে হয়ে যায় হঠাৎ

তখনো তাঁর পড়াশোনা শেষ হয়নি। ১৯৯৪ সাল ছিল সেটি। ছেলেটার নাম ছিল মাহফুজ। ১৩ আগস্ট তাঁদের বিয়ে হয়। বিয়ের আগে মাহফুজ তাঁর সব দায়িত্ব নেবে বলে কথা দিয়েছিল। জুঁইও স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, তিন দিনের বেশি টেকেনি তাঁদের সংসার। তিন দিনের দিন স্বামী বাইরে যাওয়ার কথা বলে আর ফিরে আসেনি। এখন জুঁইয়ের আপন বলতে আর কেউ নেই।

সুখ জুঁইয়ের দ্বিতীয় বই। ২১টি কবিতা নিয়ে এ বই। সাভারের এক প্রেস থেকে ছেপেছেন। পুরোটাই নিজের খরচে। এ পর্যন্ত ৫০টি বিক্রি করেছেন। জুঁই বললেন, এবারই প্রথম মেলায় এসেছি। খুব ভালো লাগছে এখানে এসে। অনেক লেখক ও পাঠকের মাঝে নিজেকে প্রাণবন্ত লাগছে। নিজে বই বিক্রি করছি। কেউ নিচ্ছে আবার কেউ দেখে ফেরত দিয়ে দিচ্ছে। তবে স্টলের লোকেরা বই নিচ্ছে না।’

প্রথম বই ২০০৫ সালে

বাংলাবাজারের একতা প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছিল জুঁইয়ের প্রথম কবিতার বই। নাম উপহার। ২৭টি কবিতা ছিল উপহারে। বিক্রিও হয়েছিল ভালো। টাকাও কিছু পেয়েছিলেন জুঁই। বললেন, আমার বই বিক্রির সব টাকা হাসপাতালে দিয়ে দিই। হাসপাতালটিই আমার সব কিছু।

সাভারে জুঁইয়ের হাসপাতাল

হাসপাতাল সরেজমিন

পলেস্তারাহীন দেয়ালের মাথায় টিন। ভেতরে একটা বেঞ্চ ও কয়েকটি কাঠের চেয়ার। মেঝেতে চাটাই বিছানো। সাভারের রাজ ফুলবাড়িয়ার তেঁতুলঝোড়ার জোড়পুলে হাসপাতালটি। ২০০৩ সালে কোহিনূর চক্ষু হাসপাতাল ও অন্ধ মহিলা সংস্থা গড়ে তোলেন জুঁই। নিজেই দেখভাল করেন। মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে হাসপাতালের জন্য টাকা তোলেন। বই বিক্রির টাকাও ব্যয় করেন হাসপাতালের পেছনে। একজন চোখের ডাক্তার আছেন হাসপাতালে। ডাক্তার নিয়মিত রোগী দেখেন। পাঁচ বছর আগে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কিছু সরঞ্জাম দিয়েছিল হাসপাতালে। গরিব মানুষরাই আসে বেশি।

এ ছাড়া জুঁই অসহায় মানুষের খোঁজখবর রাখেন নিয়মিত। মেয়েদের কাজে এগিয়ে আসতে বলেন। বাল্যবিয়ে বন্ধে সামাজিক প্রচারণাও চালাচ্ছেন। পুরস্কারও পেয়েছেন জুঁই। ২০১৬ সালে। ঢাকা বিভাগের তিনি জয়িতা। বলছিলেন, আমি অন্ধ। তাই বলে চুপ করে থাকি না। আমি কাজ করতে পছন্দ করি। মানুষের সেবা করতে পারলে ভালো লাগে। পুরস্কার পেয়ে ভালো লেগেছে।’ 

জুঁইয়ের কবিতা

মাটি-মানুষ, বৃক্ষ আর দেশের কথা থাকে জুঁইয়ের কবিতায়। আর্ত-পীড়িতের কথাও থাকে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়েও কবিতা লিখেছেন জুঁই। সুখ বইয়েরই একটি কবিতার নাম ‘বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ নাম’। কবিতাটি এমন—

শেখ মুজিবুর রহমান

খোদার অপার দান

বাংলাদেশের প্রাণ তিনি

বাংলাদেশের মান

বাংলাদেশের জন্য তিনি

দিয়ে গেলেন জান

বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ নাম শেখ মুজিবুর রহমান।

জুঁই গানও খুব ভালোবাসেন। স্কুলের অনুষ্ঠানে গেয়েছেনও। লিখেছেন বেশ কিছু গান। আরো লিখেছেন গল্প। ভাবছেন, সমাজসচেতনতামূলক নাটক লিখতে বসবেন শিগগির।



মন্তব্য