kalerkantho


এবার তাঁদের যুদ্ধের কথা বলি

৩ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



এবার তাঁদের যুদ্ধের কথা বলি

জাহানপুরের মুক্তিমাঝিরা

শামস শামীমের একটি বই এসেছে। নাম, ১৯৭১: চোরের গাঁওয়ের অশ্রুত আখ্যান। নামেই অনেক কথা বলা হয়ে গেছে। আরো বলছেন বইটি লেখার দিনগুলোর কথা

হাওরের ডুবে যাওয়া ফসলের গন্ধ নাকে এসে ধাক্কা মারছে। গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টিও থেমে নেই। ছোট একটা ইঞ্জিন নৌকায় চলেছি। শাল্লা উপজেলা সদরের গুঙ্গিয়ারগাঁও থেকে। যাচ্ছি কামারগাঁওয়ে। হাওরের ফসলহানিতে কৃষকের দুর্ভোগ নিয়ে প্রতিবেদন করাই এ যাত্রার উদ্দেশ্য। গ্রামটি হতদরিদ্র। ১৯৯৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে কামারগাঁও, আশপাশের আরো চারটি গ্রাম এবং পাশের উপজেলা দিরাইয়ের একটি গ্রামের লোকেরা পেশার জায়গায় চোর উল্লেখ করে সারা দেশে হৈচৈ ফেলে দিয়েছিল। উল্লেখ করার মতো ব্যাপার, গ্রামগুলোয় বিয়েশাদি হয় চেনা-জানার মধ্যেই। বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক কম। ২০১১ আর ২০১৩ সালেও গিয়েছিলাম কামারগাঁও। কিন্তু এবারের যাত্রা আমার ভাবনার মোড় ঘুরিয়ে দিল। চোরেরগাঁও যে অনেক বড় ইতিহাস লুকিয়ে রেখেছে! সে ইতিহাস আত্মত্যাগের। মুক্তিযুদ্ধের।

 

কামারগাঁওয়ে এখনো চুলার দাগ রয়ে গেছে। এই সারি সারি চুলায় মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রান্না করতেন নারীরা

যেভাবে যুদ্ধের কথা জানলাম

গ্রামটিতে ৩২টির মতো ঘর। সবই খুপরি। কোনোটায় ধানের খড়ের বেড়া, কোনোটায় সস্তা টিনের। ১০ বাই ১২ বা ১৫ ফুটের ঘর। এমন ঘরেই গাদাগাদি করে স্ত্রী, সন্তান, পুত্র ও পুত্রবধূ থাকে। গ্রামে গাছপালা নেই। রাস্তাঘাটও নেই বলা ভালো। নেত্রকোনার খালিয়াজুড়ি আর কিশোরগঞ্জের মিঠামইনের সঙ্গে বরং কামারগাঁওয়ের যোগাযোগ ভালো। নৌকা থেকে নামার পর পরই অনেক ছবি তুলে ফেলেছি। একপর্যায়ে সাদেক মিয়ার ঘরের বারান্দায় গিয়ে বসি। এমন সময় কাছাকাছি কোথাও থেকে একজন বয়স্ক লোকের গলা শুনতে পেলাম। লোকটি আক্ষেপ করে কিছু একটা বলছিলেন। ভালো করে শোনার জন্য আমি তাঁর ঘরে গেলাম। বৃদ্ধের খুপরিঘরের চালে তখন দুটি কাক কা কা রব তুলেছিল। নারিকেলগাছের পাতায় ছিল হাওয়ার কাঁপন। বৃদ্ধ একটা বাঁশের চাটাইয়ের ওপর বসেছিলেন। তাঁর পাশে আমি গিয়ে পানি চাইলাম। এতে তাঁর রাগ কিছুটা কমল বলে মনে হলো। একটি বাঁশের চাটাইয়ের ওপর বসে আছেন। তাঁর পাশে স্ত্রীও ছিলেন। নিচে মাটির পিঁড়িতে বসে আছে ছেলে হাবিবুর ও হাবিবুরের সন্তানরা। বৃদ্ধ চাটাইয়ের কিছু অংশ ছেড়ে দিয়ে আমাকে পাশে বসতে বললেন। বৃদ্ধ আসলে রেগেছিলেন আমাদের ওপরই। কয়েকবার ক্যামেরা নিয়ে আসি, কথাবার্তা বলি, কাগজে লেখা ছাপাই, কিন্তু কামারগাঁও বদলায় না। তাই কালু মিয়া রেগে গেছেন। আমি খুব দরদ করে পিঠে হাত রাখি। তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। বলতে থাকেন, ‘কেউ আসল খবর বলে না। একাত্তর সালে এই গ্রামে গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ কোনোটাই বাদ যায়নি। এলাকার মানুষও আমাদের অবদানের কথা স্বীকার করে না। আমরা যে চোর! কী করব, আমরা তো অন্য কাজ জানতাম না। বাপ-দাদারাও এই কাজ করেছে। আমাদেরও সিঁধকাটা শিখাইছে। এখানে খুব অভাব গো। ক্ষিধার জ্বালা বড় জ্বালা।’ এবার আমার কেঁদে ফেলার পালা। ভাবলাম একটা কিছু করি। অন্তত একটা বই লিখি।

ছিকাডুপি গ্রামের কয়েকটি ঘর

কালু মিয়ার যুদ্ধ

এখন ৬৫ বছর বয়স কালু মিয়ার। হাড় আর চামড়ার মাঝে গোশত নেই বেশি। তবে চোখ ধারালো। কথা বলেন পরিষ্কার গলায়। তাঁদের চার ভাইয়ের তিনজনই মুক্তিযোদ্ধাদের ডাকে ঘর ছেড়ে বেরিয়েছিলেন। বড় ভাই আলমাছ আলী ছিলেন চোরদলের সর্দার। আলমাছ আলী মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নৌকা দিয়ে দিয়েছিলেন। সে নৌকায় করে তাঁরা রাতবিরাতে বিশেষ অভিযানে বের হতেন। পরে গ্রামের ১০-১২ জন তরুণ একাত্তরের আষাঢ় থেকে অগ্রহায়ণ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝির কাজ করেছেন। উত্তাল হাওরে পথ দেখিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের রসদ বহন করেছেন। শাল্লা, আজমিরিগঞ্জ, দিরাইসহ কয়েকটি থানা লুট করার যুদ্ধে তাঁরাও ছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে। সম্মুখযুদ্ধেও যোগ দিয়েছিলেন। দাসপার্টির কমান্ডার জগেজ্যাতি দাস ও তাঁর দলের মুক্তিযোদ্ধাদের নৌকা চালাতেন তাঁরা। কালু মিয়া জানালেন, এ কারণে গ্রামবাসীর ওপর নেমে এসেছিল নিদারুণ অত্যাচার। দিনটি ছিল ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর। কামারগাঁওসহ আরো চারটি গ্রামে একযোগে ঐক্যবদ্ধ হামলা চালায় রাজাকার বাহিনী। কম করেও ২০ জন নারীকে রাজাকাররা ক্যাম্পে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। কামারগাঁওয়ের পাঁচজন শহীদ হন। আলমাছ আলী, কালু মিয়া আর সবচেয়ে সাহসী মাঝি জনাব আলীসহ মোট পাঁচজন মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি চেয়ে আবেদন করেছিলেন। কিন্তু সবাই প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। তাই মুক্তিমাঝি কালু মিয়া খুব কষ্ট পেয়েছেন। মুক্তিবাহিনী গাঁয়ে ঘাঁটিও করেছিল। গাঁয়ের মেয়েরা তখন তাঁদের রান্নাবান্না করে খাইয়েছে। মুক্তিমাঝি কালু মিয়া ও মজর আলীর ঘরের মাঝখানে সেই চুলার আলামত আছে এখনো। এসব কথার মাঝেই পাশের ঘরের মুক্তিমাঝি মজর আলী ও তাঁর স্ত্রী  ললিতা এগিয়ে আসেন।

ঘোরাঘুরি অনেক

কিশোরবেলা তখন আলী হোসেনের। মজর আলী ও ললিতা দম্পতির ছেলে। রাজাকাররা আলী হোসেনকে শহীদ করে। কিছু পরে মুক্তিমাঝি গিয়াস উদ্দিন আর নির্যাতিতা নারীদের স্বজনদের সঙ্গেও কথা বলি। সন্ধ্যা ৭টা বেজে যায়। আরো সব মুক্তিমাঝির নাম ও ঠিকানা জেনে নিয়ে খাতায় টুকে রাখি। সেদিনের পর নারকিলা, ছিকাডুপি, বল্লভপুর, উজানগাঁও, জাহানপুর নামের গ্রামগুলোতে আমার ঘোরাঘুরি শুরু হয়। কখনো নৌকায় করে, কখনো হেঁটে, কখনো বা মোটরসাইকেলে। পরে খুঁজতে গিয়েছিলাম  সে মুক্তিযোদ্ধাদের যাঁরা মুক্তিমাঝিদের যুদ্ধে যুক্ত করেছিলেন। দুই পক্ষেরই জবানি মিলিয়ে সত্য যাচাই করতে চেয়েছি।

অনেকেই বেঁচে নেই

সমস্যা ওইখানেই—মুক্তিযোদ্ধাদের বেশির ভাগই মারা গেছেন। যে কয়জন বেঁচে আছেন তাঁদেরও অনেকে এলাকায় থাকেন না। কেউ ঢাকায়, কেউ সিলেটে বা অন্য কোথাও। আমি ফোন নম্বর জোগাড় করি। নোট নিই। পরে দেখাও করি। মুক্তিমাঝিরা যা যা বলেছেন, হুবহু সেগুলোই আবার বলেন তাঁরা। যেমন মুক্তিযোদ্ধা প্রীতিকুসুম চৌধুরী। কামারগাঁওয়ের পাশে  সাউদেরশ্রী গ্রামে বাড়ি তাঁর। এখন স্থায়ীভাবে থাকেন সিলেটে। সোবহানীঘাট এলাকায় আগ্রা কমিউনিটি সেন্টারে কাজ করেন। গেল জানুয়ারিতে তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ আলাপে বসেছিলাম। তিনি জনাব আলী, মুসলিম উদ্দিনসহ কয়েকজন মুক্তিমাঝির সাহসের প্রশংসা করেন। গ্রামে যে গণহত্যা, নারী নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ হয়েছিল, তা টেকেরঘাট হেডকোয়ার্টারে থেকে জানতে পেরেছিলেন। মুক্তিমাঝিদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের কথা মিলে যাওয়ায় আমি নিশ্চিন্ত বোধ করি। 

যুদ্ধ করেছেন যুদ্ধের পরেও

যুদ্ধশেষে ফিরে এসে বীরের মতোই বীরাঙ্গনাদের বিয়েও করেছেন ওই মুক্তিমাঝিরাই। একপর্যায়ে কামারগাঁওয়ে এক যুদ্ধশিশুর খবর পাই। তাঁর মা মুক্তাবান বিবিকে উজানগাঁও ও শ্যামারচর ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়েছিল। যুদ্ধের পরে তিনি এক কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। মুক্তাবানকে বিয়ে করেন দাসপার্টির সাহসী মুক্তিমাঝি বল্লভপুরের বাবুল মিয়া। ৬ ডিসেম্বর শ্যামারচর যুদ্ধে বাবুল মিয়ার বাম উরুতে গুলি লেগেছিল। সেই ক্ষতচিহ্ন আর দারিদ্র্য নিয়ে দিনাতিপাত করেন এখন।

একাত্তরের জুলাই মাস

সাব সেক্টর টেকেরঘাট প্রতিষ্ঠা করেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত একাত্তরের জুলাইয়ে।  এর যোদ্ধারা কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা আর হবিগঞ্জেও যুদ্ধ করেছেন। তরুণ যোদ্ধারা হাওরের পথ-ঘাট ভালো চিনত না। তখন যোদ্ধারা কামারগাঁও, ছিকাডুপি বা বল্লভপুরের মানুষদের সাহায্য নিত। ওই মানুষগুলো হাওর চেনেন বাড়ির উঠানের মতো। মুক্তিযোদ্ধারা দিনে গ্রামগুলোয় বিশ্রাম নিতেন, রাতে বের হতেন অভিযানে। কখনো থানা দখল করে অস্ত্র লুট, কখনো বা রাজাকারদের ঘাঁটিতে আক্রমণ। দাসপার্টি নৌপথে পাকিস্তান বাহিনীকে নাস্তানাবুদ করে ছাড়ে। জুন থেকে ডিসেম্বর আমি তথ্য সংগ্রহ করে ফিরেছি। কখনো মাঝির কাছে, কখনো বীরাঙ্গনাদের কাছে, রাঁধুনিদের কাছেও গেছি। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে গেছি দফায় দফায়। নতুন কোনো তথ্য পেলেই মিলিয়ে নিতে চেয়েছি। লিখেও চলেছিলাম পাশাপাশি। শেষদিকে এসে হাওরের মধ্যবর্তী এই গ্রামগুলোর চেহারা-সুরত বর্ণনা করতে চেয়েছি। এখানে বর্ষায় হাওরের আফাল খুপরিঘর ভেঙে দেয়। হেমন্তে আবার ঘর ছাইতে হয়। এখানে মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিদিন যুদ্ধ করে। গাছপালাহীন বিরান এ প্রান্তর। নিষিদ্ধ পেশা তাঁরা ছেড়ে দিয়েছেন। এখন কেউ হাওরে মাছ ধরেন, কেউ পাথর কোয়ারিতে মজুর।

আফজল বিবির ছেলে শহীদ মিয়া

কামারগাঁওয়ের নির্যাতিতা নারী আফজল বিবি। তাঁর ছেলে শহীদ মিয়া ছিলেন মুক্তিমাঝি। আফজল বিবি বেঁচে আছেন তবে কথা বলতে পারেন না। তাঁর স্মৃতিশক্তি লোপ পেয়েছে। গুঙ্গিয়ারগাঁওয়ে গিয়ে শহীদ মিয়ার সঙ্গে দেখা করি। মুক্তিযুদ্ধের কথা কিছু শুনি—মুক্তিমাঝিরা জলসুখা, কানকলা-যাত্রাপুর সংলগ্ন স্থান, রৌয়ারূপা এলাকা ও মারকুলি এলাকায় সম্মুখযুদ্ধ এবং দাসপার্টির কমান্ডার জগেজ্যাতির শেষযুদ্ধ পিতরাকান্দায়ও ছিলেন। তা ছাড়া তাহিরপুর, দিরাই, জামালগঞ্জ, জগন্নাথপুরসহ আরো অনেক জায়গায় অভিযান চালিয়েছেন।

নারকিলা গিয়েছিলাম ডিসেম্বরে

সেপ্টেম্বর মাসে আরো একবার কামারগাঁও গিয়েছিলাম। জনাব আলীর সঙ্গে দেখা করেছি। তারপর ডিসেম্বরে গিয়েছিলাম নারকিলা। মোটরসাইকেল, নৌকা ও পায়ে হেঁটে পৌঁছেছিলাম। ২০০৯ সালেও একবার নারকিলা গিয়েছিলাম। গ্রামের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর প্রতিবেদন তৈরি করেছিলাম। বেতাউকা যুদ্ধে এই গ্রামের মাঝি কুটি মিয়া শহীদ হয়েছিলেন। এক সম্মুখযুদ্ধে আহত হয়েছিলেন আব্দুল খালেক, শফিক মিয়া সাধু। কুটি মিয়ার মা মুক্তিযোদ্ধাদের রান্নাবান্না করে খাওয়াতেন। দিরাই উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার আতাউর রহমানের কাছে যাই মুক্তিমাঝিদের থেকে পাওয়া খবর নিয়ে। তিনি তাঁদের অবদানের কথা একবাক্যে স্বীকার করেন। বলেন, ওদের স্বীকৃতি পাওয়া উচিত।

কুলসুম বিবি গাইড হয়েছিলেন

উজানগাঁও গিয়েছিলাম ওই ডিসেম্বরেই। বীরাঙ্গনা কুলসুম বিবি আমার সঙ্গী হয়েছিলেন। তাঁর বাড়ি অবশ্য পাশের দাউদপুর গ্রামে। হিন্দু মেয়েদের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলেন বলে কুলসুমকে পাকিরা চরম নির্যাতন করেছিল। তিনি গাঁয়ের নির্যাতিত নারীদের বাড়িগুলো চিনিয়ে দিচ্ছিলেন। ২০১৪ সালে তাঁর কথা নিয়ে কালের কণ্ঠে ‘৪৩ বছর পর মুখ খুললেন বীরাঙ্গনার পরিবার’ শিরোনামে একটি লেখা ছাপা হয়েছিল। সেই সূত্রে তিনি এবার বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি পেয়েছেন। এই নারী সাহসীকার এলাকার সব রাজাকার-দালালদের নাম মুখস্থ। উজানগাঁও এখানকার সবচেয়ে বড় গণহত্যা আর নারী নির্যাতনের শিকার। ঘটনা ঘটেছিল ওই ৬ ডিসেম্বরেই। হাওরের শীর্ষ রাজাকার আলী রেজা, আব্দুল খালেক, শরাফতসহ সবাই সংঘবদ্ধ হয়ে গ্রামগুলোর ওপর আক্রমণ চালায়। ৫ ডিসেম্বর রাতে আলী আকবর, ছিরুক মিয়া, রজব আলী, আমান, ধীরেন্দ্রসহ মুক্তিযোদ্ধাদের সশস্ত্র ছোট একটি দলকে রান্না করে খাওয়ান আফতর আলীর মেয়ে পিয়ারা বেগমসহ তাঁর স্বজনরা। তাঁরা চলে যাওয়ার পরই ওই বাড়িতে আক্রমণ চালিয়ে ১১ জনকে হত্যা করে রাজাকাররা। নারীদের ধরে নিয়ে যায় ক্যাম্পে। মুক্তাবান বিবিসহ এই গ্রামের চারজন নারী এবার বীরাঙ্গনার স্বীকৃতির আবেদন করেছেন।

পুরো ডিসেম্বর ঘুরেছি

২২ ডিসেম্বর গিয়েছিলাম শাল্লার ছিকাডুপি ও বল্লভপুর। মুক্তিমাঝি মতিন মিয়া ছিলেন সঙ্গী। মুক্তিমাঝি, মুক্তিযোদ্ধা ও রাঁধুনিদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। সারা দিন ছিলাম। ওই দিন ছিকাডুপির  ছিরুক মিয়া, কালা মিয়ার সঙ্গেও দীর্ঘক্ষণ কথা বলি। সনজব আলী, সৈয়দ আলী ও রজব আলীকেও খুঁজে বের করি। জাহানপুরেও গিয়েছিলাম। সেটা ছিল ১৭ ডিসেম্বর। এই গ্রামে একাত্তরে ক্যাম্প করেছিলেন টেকেরঘাট সাব সেক্টরের কম্পানি কমান্ডার সুধীর দাস। রাত ৮টা পর্যন্ত ছিলাম জাহানপুরে। জীবিত মুক্তিমাঝিদের কেউ কাজ করছিলেন বোরো ক্ষেতে, কেউ বা জলাশয় পাহারা দিচ্ছিলেন। আমার আসার খবর পেয়ে তাঁরা বিকেল-বিকেল ফিরে এসেছিলেন। এই গ্রামে হিন্দু-মুসলমানের একই উঠান ভাগাভাগি। উঠানের এক মাথায় পূজাঘর তো অন্যদিকে নামাজঘর। আমার বেশ অবাকই লাগে। জানতে পারি, এ নিয়ে বিবাদও হয়নি কোনো দিন। জাহানপুর থেকে ছুটে গিয়েছিলাম সিলেটে। সুধীর দাসের সঙ্গে দেখা করেছিলাম। প্রায় সব মাঝির নাম তাঁর মনে আছে। মুক্তিমাঝি আকরম আলী, নিজাম উদ্দিনসহ কয়েকজনের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

 বীরাঙ্গনা কুলসুম, মুক্তাবান ও বাবুল মাঝির সঙ্গে লেখক

এবার ল্যাপটপ নষ্ট হয়ে গেল

লেখা গুছিয়ে এনে যখন সম্পাদনার কাজ ধরেছি, তখন ল্যাপটপ আর ডেস্কটপ দুটিই একসঙ্গে নষ্ট হয়ে গেল। ব্যাকআপ ফাইল ই-মেইল বক্স ও পেনড্রাইভে থাকায় অবশ্য সমস্যা বেশি হয়নি। তারপর আবার একদিন মনিটর যায়। যন্ত্রের যন্ত্রণায় কাহিল হওয়ার দশা। এসব সামলেসুমলে ১০  জানুয়ারি প্রচ্ছদ করে দেওয়ার আবেদন নিয়ে ঢাকায় যাই ধ্রুবদার কাছে। ধ্রুব এষ আমাদের সুনামগঞ্জেরই মানুষ। শিরোনামে দেখে অনেকক্ষণ থমকে ছিলেন। প্রথমে নাম দিয়েছিলাম, ১৯৭১ : চোরাপল্লীর অশ্রুত আখ্যান’। ধ্রুবদা নামটি পাল্টে দেন ১৯৭১ : চোরেরগাঁওয়ের অশ্রুত আখ্যান। বললেন,  পল্লী শব্দটি ভদ্র ভদ্র লাগে। গাঁওই আমাদের প্রাণ। বইটি প্রকাশ করেছে নাগরী। কবি মালেকুল হক ও নাট্যকার সুফি সুফিয়ানের অক্লান্ত পরিশ্রমে শেষমেশ ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে মেলায় এসেছে বইটি।

ছবি : লেখক


মন্তব্য