kalerkantho


বই বাড়ি

রামমালা গ্রন্থাগার

পড়াশোনা বেশি করতে পারেননি মহেশ ভট্টাচার্য। কিন্তু বিদ্যানুরাগী ছিলেন। তিনিই কুমিল্লায় প্রতিষ্ঠা করেছেন রামমালা গ্রন্থাগার। কয়েক দিন আগে দেখে এসেছেন আবুল কাশেম হৃদয়

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



রামমালা গ্রন্থাগার

খুব ভালো রান্না জানতেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের বিটঘর গ্রামের ঈশ্বরচন্দ্র ভট্টাচার্যের ছেলে মহেশচন্দ্র ভট্টাচার্য। কুমিল্লা জিলা স্কুলে পড়ার সময় এক বাসায় পাচকের কাজও নিয়েছিলেন মহেশ। তবে অর্থাভাবে পড়ালেখা দশম শ্রেণিতে ওঠার পর আটকে যায়। তারপর কিছু অর্থ ধার করে ব্যবসায় নামেন তিনি। ‘এম ভট্টাচার্য অ্যান্ড কোং’ নামে একটি হোমিওপ্যাথিক ওষুধের দোকান খোলেন। দিনে দিনে মহেশ হয়ে ওঠেন কোটিপতি।   

 

রামমালা পরিচয়

মহেশ ভট্টাচার্য (১৮৫৮-১৯৪৩) বাবার নামে করেছেন কুমিল্লা ঈশ্বর পাঠশালা হাই স্কুল। মা রামমালা দেবীর নামে করেছেন রামমালা গ্রন্থাগার। ব্রাহ্মণ ছেলেদের জন্য ছাত্রাবাস রামমালা। এমন আরো অনেক কীর্তি আছে মহেশবাবুর। তবে অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি তাঁর রামমালা গ্রন্থাগার। পণ্ডিত রাসমোহন চক্রবর্তী ১৯২৬ সালে রামমালা গ্রন্থাগারের তত্ত্বাবধায়ক হন। তিনি খুব যত্নবান ছিলেন। গ্রন্থাগারটি ২০ থেকে ২৫ হাজার পুঁথির মালিক। এর মধ্যে সংস্কৃত পুঁথি ছয় হাজার, আর বাংলা পুঁথি দুই হাজার। জ্যোতির্বিদ্যা, আয়ুর্বেদ, চিকিৎসাশাস্ত্রেরও পুঁথি আছে। সাহিত্য পুঁথি তো আছেই। দুষ্প্রাপ্য বই আছে অনেক। পত্রপত্রিকার সংগ্রহও অনেক আছে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশুসাহিত্যের বই রয়েছে রামমালায়।

সরেজমিন

কুমিল্লা সদরেই মহেষাঙ্গন। সদর দরজা দিয়ে ঢোকার পর সোজাসুজি যে ভবন, তার নিচতলায় গ্রন্থাগারের পুস্তক বিভাগ। পুঁথি বিভাগটি মহেষাঙ্গনের দেবালয়ের পাশে। সেখানে এখন সাধারণের প্রবেশ নিষেধ। পুস্তক বিভাগের ১৪টি আলমারি দুষ্প্রাপ্য বইয়ে ঠাসা। রবীন্দ্রনাথের নামাঙ্কিত একটি স্মৃতিফলক আছে সেখানে। রবীন্দ্রনাথ মহেষাঙ্গনে এসেছিলেন ১৯২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। গ্রন্থাগারিক ইন্দুকুমার সিংহের সঙ্গে পুস্তক ভবনে দেখা হলো। বয়স তাঁর ৮০-র বেশি। ইন্দুবাবু বললেন, ১৯১২ সালে ঈশ্বর পাঠশালা স্কুলের প্রতিষ্ঠা। আর গ্রন্থাগারটি ১৯১৯ সালে।  শুরুতে মহেষাঙ্গনে পাকা বাড়ি ছিল না। ২৪টি টানা টিনের ঘর ছিল। দালানের কাজ ধরেছিলেন ১৯১৫ সালে। রাসমোহন চক্রবর্তী টোল চালাতেন গর্জনখোলায়। কিন্তু ছাত্রসংখ্যা বেশি হয়ে যাওয়ায় মহেশবাবু টোলটি মহেষাঙ্গনে নিয়ে আসেন। রাসমোহন বাবুর সহকারী হয়ে কাশি থেকে আসেন পণ্ডিত নবীনচন্দ্র ব্যাকরণতীর্থ। আরেকজন সহকারীও ছিলেন, নাম পণ্ডিত স্মৃতিতীর্থ। টোলের জন্য তখন বই পাঠাতেন কাশির হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অন্নদাচরণ তর্কচুড়ামণি। কলকাতার একজন অধ্যাপকও বই পাঠাতেন। বইপত্র সংরক্ষণ করতেন স্মৃতিতীর্থ মহাশয়। আস্তে আস্তে সংস্কৃত লাইব্রেরিটি গড়ে উঠল। স্থানীয়রা তখন সংস্কৃত বেশি বুঝত না। তাদের অনুরোধে বাংলা বই আর পত্রপত্রিকা সংগ্রহ করা হতে লাগল। একপর্যায়ে ভারত সংস্কৃতিবিষয়ে বই সংগ্রহ করা শুরু হয়। এ বিষয়ে যত রকম বই পাওয়া গেল কোনোটাই বাদ দেওয়া হলো না। তারপর তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের বই জোগাড় করা হলো। পৃথিবীর প্রায় সব ধর্মের বই এখানে পাবেন। আর পুঁথি এখানে আছে প্রায় ২৫ হাজার। মহেশবাবু বলতেন, পুঁথি সংগ্রহের এখনই ভালো সময়, নইলে নষ্ট হয়ে যাবে। তিনি পুঁথি কিনেও নিয়েছেন অনেক। অনেক পুঁথি ভুর্জপত্রে লেখা।’

 

দুঃখ এই

ঐতিহ্যবাহী রামমালা গ্রন্থাগারটির অবস্থা অবহেলা ও অযত্নে অনেকটা বেহাল। ইন্দুবাবু ভাবেন, সরকার যত্ন না নিলে গ্রন্থাগারটি আরো বেহাল হয়ে পড়বে।



মন্তব্য