kalerkantho


খুলনা

মেঘদের ফুড ব্যাংক

শীতের শুরু সবে। অগ্রহায়ণ মাসের রাত। কাজ সেরে বাড়ি ফিরছিলেন কৌশিক দে। গল্লামারী ব্রিজ পার হওয়ার পর সোনাডাঙ্গাগামী রাস্তায় কয়েকজন তরুণের জটলা দেখলেন। এগিয়ে গেলেন—ছেলেগুলোর সঙ্গের ভ্যানে বেশ কিছু শীতের কাপড়

৩০ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



মেঘদের ফুড ব্যাংক

কাজ শেষ করতে রাত সেদিন গভীর, মানে ১টা বেজে গিয়েছিল। সঙ্গী ছিলেন দৈনিক খুলনাঞ্চল সম্পাদক বন্ধু মিজানুর রহমান মিল্টন। ছেলেগুলোর জটলা দেখে এগিয়ে যেতেই পরিচিত মুখেরও দেখা পাই—দৈনিক খুলনাঞ্চলের ফটোসাংবাদিক কাজী ফজলে রাব্বী শান্ত। শান্তসহ ওরা ১২-১৩ জন। ওদের সঙ্গের ভ্যানে ছিল বেশ কিছু শীতের কাপড়। প্রথমে ধন্দে পড়েছিলাম। পরে শান্ত বলল, ‘কয়েক দিন ধরেই আমরা শীতের কাপড় বিলি করছি। আজকেও বের হয়েছি।’

কোথায় কোথায় যাও তোমরা?

আশপাশের গ্রামগুলোতেও যাই। এ ছাড়া শহরের অনেক জায়গায় ভাসমান লোক। তাদেরও দিই।   

শান্তর কাছেই আরো জানলাম দলটির প্রধান কাজ আসলে নিরন্ন মানুষের মুখে আহার দেওয়া। বিয়ে, জন্মদিনের মতো অনুষ্ঠানগুলোতে তো প্রায়ই খাবার বেঁচে যায়। সেগুলো পরে ফেলেও দেওয়া হয়। এই তরুণেরা সেই খাবারগুলো সংগ্রহ করে। তাতে দুটি কাজ হয়। যারা খেতে পায় না, তাদের কাছে খাবার পৌঁছানো যায়। আবার শহরকেও দূষণের হাত থেকে রক্ষা করা যায়।

 

প্রথম ভেবেছিলেন মেঘ

পুরো নাম শাহরিয়ার কবির মেঘ। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহকারী প্রকৌশলী। খাবার যোগাড় করতে গিয়ে কত মানুষ অপরাধের সঙ্গেও জড়িয়ে যায়—ভাবনাটি তাঁকে পেয়ে বসেছিল। প্রথম শেয়ার করেন পাড়ার বড় ভাই শাহরিয়ার শাওনের সঙ্গে। তাঁদের সঙ্গে দ্রুতই জুড়ে যান বেসরকারি মোবাইল ফোন  কম্পানিতে কর্মরত ইমরান হোসেন মৃধা। আর গল্পটা শুরু হয় এখান থেকেই। এখন প্রতিদিনই ৪০-৪২ জন তরুণ বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে শহরের এ মাথা-ও মাথা ছুটে বেড়ায়। সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত খাবার সংগ্রহ করে তারা, পাশাপাশি বিলিও করে। দলের নাম দিয়েছে তারা খুলনা ফুড ব্যাংক।

 

মেঘ বললেন

বড় বড় অনুষ্ঠানে খাবার নষ্ট হওয়ার ব্যাপারটি অনেকবারই দেখেছি। কিন্তু কী করব ভেবে পাচ্ছিলাম না। আইডিয়াটা প্রথম আমার মা দেন ‘বেঁচে যাওয়া খাবার দুস্থ মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারো।’ আরে সত্যিই তো! কিন্তু একার পক্ষে তো সম্ভব নয়।  শাওন ভাইয়ের সঙ্গে কথা বললাম। তারপর ইমরানের সঙ্গে। প্রথমে আমরা ফেসবুকে একটি ইভেন্ট খুললাম। ইচ্ছা ও উদ্যোগের কথা জানিয়ে ফেসবুক বন্ধুদের আমন্ত্রণ জানালাম। আরো জানালাম,  ৪ আগস্ট শান্তিধাম মোড়ের জাতিসংঘ পার্কে একটি বৈঠক হবে। প্রথম বৈঠকেই ৪১ জন জড়ো হলো। খুলনা ফুড ব্যাংক নামটা ওই বৈঠকেই ঠিক করা হয়ে যায়। একটি হটলাইনও চালু করি আমরা।

 

ক্লথ ব্যাংক, ব্লাড ব্যাংকও এলো

ফুড ব্যাংক নিরন্ন মানুষের মুখে হাসি ফোটাল। পরিচিতরা খুব উৎসাহ দিলেন। মেঘ, শাওন, ইমরান ভাবল অনেক মানুষের গরম কাপড়ও নেই। প্রয়োজনের সময় অনেকে রক্তও পায় না। তাই ক্লথ ব্যাংক আর ব্লাড ব্যাংকের কাজও শুরু হলো। তবে শিক্ষা ব্যাংক এখনো পুরোদমে চালু হয়নি।

শাওন বলেন, শিক্ষা ব্যাংক হবে অসহায় ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের আশ্রয়স্থল। আমরা সমাজের বিত্তবান মানুষদের কাছ থেকে সহযোগিতা নিয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ দেব। এ বিষয়ে অনেকের সঙ্গে কথা হয়েছে। আগামী বছর থেকে শিক্ষা ব্যাংকের কাজ পুরোদমে শুরু করা যাবে আশা করি।

 

ফুড ব্যাংকের ১০০

জানুয়ারির ৩ তারিখ। ফুড ব্যাংক উদ্‌যাপন করবে ১০০তম ইভেন্ট। ইমরান হোসেন মৃধা বললেন, ‘ফুড ব্যাংকে প্রথম সোনাডাঙ্গা আবাসিক এলাকা থেকে এক ব্যক্তি ৩০ প্যাকেট খিচুড়ি পাঠিয়েছিলেন। খুলনা রেলস্টেশনে রাত কাটানো মানুষদের মধ্যে সেগুলো আমরা বিতরণ করেছিলাম। এখন প্রতিদিনই ইভেন্ট চলছে। ৩ জানুয়ারি ১০০ হবে ফুড ব্যাংকের ইভেন্ট। আমাদের হটলাইনে এখন অনেক ফোন আসে। ভবিষ্যতে দাতাদের সঙ্গে নিয়েই  খাবার বিলি করার কথা ভাবছি আমরা। মজার ব্যাপার হলো, এখন কিন্তু রেস্টুরেন্ট থেকেও আমরা ফোন পাচ্ছি, বিশেষ করে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের কেওড়া ও নওয়াব রেস্টুরেন্ট প্রায় দিনই তাদের বেঁচে যাওয়া খাবার আমাদের দিয়ে দিচ্ছে।’ 

 

ওদের স্বপ্ন বড়

প্রত্যন্ত গ্রামেও পৌঁছাতে চায় মেঘরা। খাবার প্যাকেট কেনা, যাতায়াত ইত্যাদিতে খরচ আছে। নিরাপত্তার ব্যাপারও জড়িত। পুলিশসহ তাই সবার সহযোগিতা দরকার।

ফুড ব্যাংক হটলাইন : ০১৯৯৯-২৬০১৫০।

 

ছবি : লেখক


মন্তব্য