kalerkantho


নরসিংদী

প্রতিবেশীর আছেন হাবিব মিয়া

একজন সরল মানুষ। একজন কৃষক। তাঁর কাছে জাত-পাত নেই। তিনি মানুষ ভালোবাসেন। তিনি হাবিব মিয়া। তাঁর কথা পূর্বহরিপুরের সবাই জানে। রায়হান রাশেদও চেনেন আগে থেকেই

৩০ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



প্রতিবেশীর আছেন হাবিব মিয়া

হাবিব মিয়া

নরসিংদীর ভেলানগর থেকে বাসে চড়লাম। যাচ্ছি পূর্বহরিপুর। হাবিব আংকেলের বাড়ি। নামতে হবে ভৈরবের আগের স্টেশন নীলকুঠি। শীতের সূর্যের তেজ নেই। হালকা শীত লাগছে। বাস চলছে দ্রুত। বেশিক্ষণ লাগল না। বাস থেকে নেমে অটোরিকশায় করে গেলাম আংকেলের বাড়িতে।

 

একজন হাবিব মিয়া

বয়স তাঁর ৫৮। সকাল সকাল ক্ষেতে চলে যান। চাষবাস আর পশুপালন তাঁর পেশা। একাত্তরে তাঁর বয়স ছিল ১১। হানাদার বাহিনী গ্রামে ঢুকেছিল। মা-বাবার সঙ্গে অনেক দিন জঙ্গলে লুকিয়ে ছিলেন। গর্ত করেও থেকেছেন। একবেলা খেয়ে দিন পার করেছেন। লুকিয়ে লুকিয়ে মুক্তিবাহিনীর কাছে খবর পৌঁছাতেন। খাবারও দিয়ে আসতেন। একটি লাঠি বানিয়েছিলেন। হানাদার মারবেন বলে। যুদ্ধ করতে চাইত মন; কিন্তু বয়স সুযোগ দেয়নি।

অভাব ছিল ঘরে, হাবিব মিয়ার তাই স্কুলে যাওয়া হয়নি। বাবাকে জোগালি (সাহায্য) দিতেন। বাবার সঙ্গে কাজ থেকে ফিরে মাঠে যেতেন ফুটবল খেলতে। ভালো গোলকিপার ছিলেন। ১৭ বছর বয়সে সাপমারা বাজারে আটা-ময়দার দোকান দেন। দোকান মারফত এলাকার প্রায় সব লোকের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, বিশেষ করে মুরব্বি শ্রেণির মানুষ আসত বেশি দোকানে। তিনি সম্মান করে বসতে দিতেন। তাঁদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছেন। দিনে দিনে তাঁদের সুখ-দুঃখের সঙ্গী বনে গেলেন। দিনে দিনে দায়িত্ব বাড়ে। বিচার-আচারও নিয়ে আসতে থাকে লোকে। তিনি মনোযোগ দিয়ে অভাব-অভিযোগ শোনেন। ন্যায়ের পক্ষে থাকেন। এলাকার লোক তাঁকে ভরসা করতে থাকে। তিনি মানুষের বন্ধু হয়ে ওঠেন। কারোর মেয়ের বিয়ে, টাকা জোগাড় হচ্ছে না—হাবিব মিয়ার কথাই মনে পড়ে আগে। কেউ অসুস্থ, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার লোক নেই—হাবিব মিয়া আছেন।

 

দক্ষিণ পাশের হিন্দুপাড়া

দক্ষিণ পাড়ার সব মানুষই বিপদ-আপদে হাবিব মিয়াকে খোঁজে। পাড়ার প্রায় সবাই হিন্দু ধর্মাবলম্বী। হাবিব আংকেলের সহধর্মিণী বলছিলেন, ‘একবার এক বুড়ো মহিলা রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে (হাবিব মিয়াকে) খুঁজতে আসেন। তাঁর ছেলে আর ছেলের বউ তাঁকে মেরেছে। এ কথা শুনে তোমার আংকেল গিয়ে তাকে অনেক শাসন করেছেন। পরে ছেলেটি নিজে তো ভালো হয়েছেই, আশপাশের লোকেরাও তাকে দেখে শিখেছে।’ হাবিব মিয়া বলছিলেন, ‘অনেক বাধা-বিপত্তি এসেছে নানা সময়; কিন্তু মানুষের পাশে দাঁড়ালে ভালো লাগে। শান্তি পাই। মুরব্বিরা বলেন, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ালে সওয়াব হয়। আল্লাহ খুশি হন। আমি একজন আলেমের মুখেও এ কথা শুনেছি। ছোটবেলায় দেখেছি, অন্যায়ভাবে মানুষ মানুষকে মারছে। অত্যাচার করছে। তখন ভাবতাম, আল্লাহ তৌফিক দিলে মানুষের পাশে থাকব।’ দক্ষিণপাড়ার ছেলে পবিত্র বলল, ‘আমাকে দেখলেই দাদা (হাবিব মিয়া) ডাক দেন। তারপর কাজকর্মের খবর নেন। পিতার স্নেহ পাই তাঁর কাছ থেকে।’

 

সোহেলদের বাড়িতে ডাকাত পড়েছিল

কয়েক দিন আগের কথা। হাবিব মিয়ার বাড়ি থেকে অল্প দূরে সোহেলদের বাড়ি। ডাকাতরা সোহেলকে কুপিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে। সোহেলের মা চিৎকার করে লোক ডাকতে থাকে। সবার আগেই পৌঁছে গিয়েছিলেন হাবিব মিয়া। সোহেলকে হাসপাতালে নিয়ে যেতেও দেরি করেননি। সোহেলের মা বললেন, ‘ডাকাতদলে পাঁচ-ছয়জন ছিল। তারা উল্টোপাল্টা সোহেলকে কোপাতে থাকে। আমি চিল্লানি দিই। হাবিব মিয়া তাড়াতাড়ি ছুটে আসে। ছেলেটাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।’     

 

মনিকার বিয়ে

সন্তোষ চন্দ্র বিশ্বাস একজন দিনমজুর। মনিকা তাঁর একমাত্র মেয়ে। টাকার অভাবে বিয়ে দিতে পারছিলেন না। অথচ মেয়ের বিয়ের বয়স পার হয়ে যাচ্ছে। সন্তোষ খুব চিন্তায় পড়েছিলেন। শেষমেশ মাকে নিয়ে সন্তোষ চন্দ্র হাবিব মিয়ার কাছে গেলেন। সব শুনে হাবিব মিয়া টাকা-পয়সা জোগাড় করলেন। বেশির ভাগই নিজে দিয়েছেন। এদিক-ওদিক থেকেও কিছু জোগাড় করেছেন। সময়ও দিয়েছেন। খেয়াল রেখেছেন বিয়ের অনুষ্ঠান যেন ঠিকমতো সমাধা হয়। সন্তোষ চন্দ্রের মা বলেন, ‘ঠেকায় পড়লে আমরা তাঁর কাছেই যাই। হাবিব মিয়া না থাকলে, মনিকার বিয়ে দিতে পারতাম না।’

 

সহধর্মিণী ভালো সঙ্গী

‘উনার মন ভালো,’ বলেন হাবিব মিয়ার সহধর্মিণী। ‘মানুষটা পড়াশোনা করতে পারে নাই, কিন্তু মনটা এত সুন্দর যে আমার অনেক ভালো লাগে।’ সহধর্মিণীকে হাবিব মিয়া একজন ভালো সঙ্গী মনে করেন। রাতেও অনেকবারই স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে এ বাড়ি-ও বাড়ি গেছেন। বললেন, ‘তিনি (স্ত্রী) কখনোই বিরক্ত হন না। ঘরের বাজারের টাকাও মানুষের উপকারের জন্য হাতে তুলে দিয়েছেন।’

ছবি : লেখক


মন্তব্য