kalerkantho


পটুয়াখালী

সাগরবন্ধু

বিপদে-আপদে মানুষের পাশে থাকা তাঁর ছোটবেলার অভ্যাস। পুরস্কার হিসেবে মন্নান হাওলাদার একটি চেয়ার পেয়েছেন। সেটি পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলা ফিশিং ট্রলার মাঝি সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতির। দেখা করে এসেছেন জসীম পারভেজ

৩০ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



সাগরবন্ধু

আলীপুর মৎস্য বন্দরটি শিববাড়িয়া নদীর ওপর। ট্রলার এফ বি মরিয়ম নোঙর করেছিল। ইউসুফ কম্পানির ট্রলার এটি। দায়িত্বে আছেন মন্নান মাঝি। তাঁর বাড়ি মহিপুর থানার লতাচাপলী ইউনিয়নের নবীনপুর গ্রামে। মাঝবয়সী মানুষটি দারুণ কর্মচঞ্চল। প্রথম ঘটনাটা বললেন আরেক ট্রলারের মাঝি জাহাঙ্গীর হোসেন, ‘২০০৩ সাল। চকরিয়ার এক মালিকের একটি ট্রলার ডুবে যায়। আষাঢ় মাস তখন। ১৪ জন জেলে ছিলেন ট্রলারে। তাঁদের মধ্যে লতাচাপলীর ছিলেন পাঁচজন। মন্নান মাঝি নিজের ট্রলার নিয়ে সাগরের মোহনা, গঙ্গামতিচর, ফাতরাচর, তেঁতুলবাড়িয়া এলাকা থেকে তাঁদের লাশ উদ্ধার করে স্বজনদের কাছে পৌঁছে দেন। এ রকম কাজ মন্নান মাঝি বহুবার করেছেন। সব সময় করেন। ভালোবেসে আমরা গেলবার তাঁকে সমিতির সভাপতি করেছি।’ 

 

মন্নান মাঝি বললেন

খুব অভাব ছিল। অল্প বয়সেই মাছ ধরার কাজে লাগি। আমি কষ্ট বুঝি। সাগরে কোনো দিন কাউকে ফেলে আসিনি। মানুষের কষ্ট দেখলে ডাঙায় হোক বা পানিতে, আমি চুপ থাকতে পারি না। আমার বাবার নাম কেরামত আলী হাওলাদার। আমরা সাত ভাই-বোন। আমি মেজো। খুব অভাব ছিল আমাদের। আমি মানুষের কষ্ট বুঝি।

 

রণজিৎ মিস্ত্রির ছেলের কিডনি রোগ

গেল নভেম্বরের ঘটনা। লতাচাপলী ইউনিয়নের তুলাতলী গ্রামের রণজিৎ মিস্ত্রির ছেলে রতন মিস্ত্রি। বয়স ২৫। কিডনি রোগ। বিছানায় শোয়া। মন্নান মাঝি প্রথম গেলেন কুয়াকাটার পৌর মেয়র আব্দুল বারেক মোল্লার কাছে। চার হাজার টাকা তুললেন তাঁর কাছ থেকে। তারপর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আনসার উদ্দিন মোল্লার কাছে গেলেন। তিনি দিলেন সাড়ে চার হাজার টাকা। আলীপুরের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তুলেছেন সাড়ে ১৩ হাজার টাকা। নিজের পকেট থেকে দিয়েছেন ৫০০ টাকা। সব টাকা শেষে দিয়েছেন রণজিৎ মিস্ত্রির হাতে। সেই টাকা নিয়ে তাঁরা ভারত গেছেন চিকিৎসা করাতে।

 

আজিজের মেয়ের বিয়ে

২০১৬ সালের ঘটনা। আলীপুরের দুলাল কম্পানির একটি ট্রলার পরিচালনা করেন হানিফ মাঝি। মাছ ধরে ফেরার পথে আট হাজার ইলিশবোঝাই ট্রলারটি গভীর সমুদ্রে ডুবে যায়।  ১৭ জন জেলে ছিল। মো. আজিজ, মো. দেলোয়ার ফকির, ইউসুফ মিয়া ও পুতুল চন্দ্র মারা যান। খাজুরার ওই জেলেদের সন্ধান আজও মেলেনি। আজিজের স্ত্রী তাঁর মেয়ের বিয়ে দেওয়ার জন্য সাহায্য চাইতে আসেন। মন্নান মাঝি সঙ্গে নেন শাহ আলম মাঝিকে। আলীপুরের ব্যবসায়ীদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে জোগাড় করেন ২৮ হাজার টাকা। নিজের পকেট থেকে মন্নান মাঝি যোগ করেন আরো দুই হাজার টাকা। আজিজের মেয়ের বিয়ে শেষে ভালোমতোই হয়েছে।

 

২০১৫ সালের একটি ঘটনা

আলীপুরের কালাচান রাখাইনপাড়ার চিংচামোর ছেলে রাখাইন মুলুয়া। ২৭ বছর বয়স। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ঘরেই পড়েছিল। টাকার অভাবে চিকিৎসা হচ্ছিল না। মন্নান মাঝি জানার পর হাজির হন আলীপুর বাজারে। ৩৫ হাজার টাকা তুলে দেন চিংচামোর হাতে। ঢাকায়ও নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ছেলেটি বাঁচেনি।

 

কালু মাঝির ট্রলারডুবি

মন্নান মাঝি সাগরে যাচ্ছিলেন মাছ ধরতে। পথে দেখেন খাজুরার কালু মাঝির ট্রলার ডুবেছে। ১২ জন মাঝি ছিল সেটিতে। একটুও কালক্ষেপণ করেননি মন্নান মাঝি। নিজের ট্রলারের সবাইকে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন উদ্ধারকাজে। সবাইকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষমও হন। ফিরিয়ে নিয়ে আসেন আলীপুর। মাছ না ধরে ফিরে আসার কারণে মন্নানের ট্রলার মালিক রতন মিয়ার ৪০ হাজার টাকা লোকসান হয়। তবে তিনি রাগ করেননি বরং উৎসাহ দিয়েছেন।

 

৩০ বছর আগের এক ঘটনা

আষাঢ় মাস ছিল। ১৯৮৩-৮৪ সালের ঘটনা। সাগরে রাত গভীর ছিল। মন্নান মাঝি জাল ফেলে অপেক্ষায় ছিলেন। হঠাৎ  গোঙানি শুনতে পান। কিছুটা দূরে। তিনি টর্চের আলো ফেলেন। দ্যাখেন একটি ট্রলার। কাছে এগিয়ে যান। ট্রলারটি বিকল। ট্রলারের মাঝিদের আটজনের মধ্যে সাতজনেরই অবস্থা সঙ্গিন। উদ্ধার করার পর মাঝিরা বলেছিলেন, ২২ দিন ধরে ট্রলার বিকল হয়েছে। সাত দিন ধরে অনাহারে আছেন। মন্নান মাঝি দেরি না করে জাউ রান্না করে তাতে চিনি মিশিয়ে খাওয়ান মুমূর্ষু জেলেদের। সরিষার তেল গরম করে হাতে-পায়ে মাখিয়ে দেন। তারপর মাছ ধরা বন্ধ করে ওই রাতেই রওনা দেন আলীপুর। ১৬ ঘণ্টা লেগেছিল তীরে পৌঁছাতে। অসহায় জেলেদের ট্রলারও ঠিক করে দিয়েছিলেন মন্নান মাঝি।

 

মন্নান মাঝির পরিবার

দুই ছেলে আর তিন মেয়ে মন্নান মাঝির। বড় ছেলে মজিবর ঢাকার মিরপুর বাঙলা কলেজ থেকে অনার্স পাস করেছে। ছোট ছেলে জসিম উদ্দিন বি এম কলেজে অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। তিন মেয়েকেই বিয়ে দিয়েছেন। ঘরে অভাব আছে কিন্তু ছেলেদের মানুষ করতে সাধ্যমতো সব করেছেন মন্নান মাঝি। বলছিলেন, ‘আমার মা মোসাম্মৎ আজিমুন নেছার দোয়া আছে আমার ওপর। মানুষের সেবা করার সুযোগ কি সবার হয়?’ মন্নান মিয়ার বড় ছেলে মজিবর বলেন, ‘বাবাকে নিয়ে আমরা গর্বিত। এলাকার মানুষ আমাদের স্নেহ করে তো বাবার কারণেই।’

 

ছবি : লেখক


মন্তব্য