kalerkantho


খাগড়াছড়ি

স্কুলটি বদলে দিয়েছেন এরশাদ আলী

পাড়াগাঁয়ে এমন স্কুল বেশি দেখা যায় না। খুব পরিপাটি। আর শিক্ষার্থীরাও বেশ চনমনে। এটি খাগড়াছড়ির মাটিরাঙার গুমতি ইউনিয়নের ভবানীচরণ রোয়াজাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। পাঁচ বছর ধরে স্কুলটি উপজেলায় সেরা। স্কুলটিকে বদলে দিয়েছেন প্রধান শিক্ষক এরশাদ আলী। অভিনন্দন জানিয়ে এসেছেন আবু দাউদ

৩০ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



স্কুলটি বদলে দিয়েছেন এরশাদ আলী

এরশাদ আলী

২০০২ সালে তিনি স্কুলটিতে প্রধান শিক্ষক হয়ে আসেন। তখন স্কুলে শিক্ষক মাত্র দুজন। অথচ শিক্ষার্থী ৩০০। তখন পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি পাওয়ার কথা ছাত্র অথবা অভিভাবক কেউই ভাবতে পারত না। এরশাদ আলী এসে শিক্ষা, ক্রীড়া, সংস্কৃতি, পরিবেশ—সব দিকেই মনোযোগী হন। ওই বছরই একজন ছাত্র সাধারণ বৃত্তি লাভ করে। পরের বছর থেকে ট্যালেন্টপুলেও বৃত্তি পেয়ে চলেছে এই স্কুলের শিক্ষার্থীরা। ২০০৩ সালে যেখানে পাসের হার ছিল ৭ শতাংশ, এখন পাসের হার শতভাগ। চট্টগ্রাম বিভাগীয় পর্যায়ে এবার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হয়েছেন এরশাদ আলী। 

 

যে কারণে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক

নুরুল ইসলাম সর্দারপাড়ার বাসিন্দা ফুলমিয়া। দরিদ্র মানুষ। তাঁর সন্তান আল আমিন সরলসোজা। তাঁকে পড়ানোর কথা ভাবেনইনি ফুলমিয়া। বরং নিয়ে গিয়ে চায়ের দোকানে কাজে লাগান। এরশাদ স্যার ব্যাপারটি জানতে পারেন। ফুলমিয়ার সঙ্গে আলাপ করেন। একদিন নয়, কয়েক দিন। আল আমিনকেও আদর-স্নেহ দিয়েছেন। একপর্যায়ে স্কুলে নিয়ে আসেন আল আমিনকে। ২০১৬ সালের মার্চ মাসের ঘটনা। ছেলেটির বই-পুস্তক, খাতা-কলম—সব কিছুর দায়িত্ব নিয়েছে স্কুল কমিটি। আল আমিন এবার দ্বিতীয় শ্রেণিতে উঠেছে। এরশাদ আলী বললেন, ‘২০০৯ সাল থেকে এই এলাকায় শিশু জরিপকাজ চলছে। শিক্ষকদের নেতৃত্বে দল গঠন করে বাড়ি বাড়ি আমরা খোঁজ নিই। স্কুলবঞ্চিতদের স্কুলে আনার উদ্যোগ আমাদের তখন থেকেই। এখন এলাকার শতভাগ শিশুই স্কুলে পড়ে।’

 

ঝরে না পড়ার রেকর্ড

২০১২ সালে স্কুলটিতে যে ১০০ শিশু প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল ২০১৬ সালে সবাই পঞ্চম শ্রেণিতে উঠে। এর মধ্যে ৬৪ জন ওই বছরই সমাপনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। বাকি ৩৬ জন ২০১৭ সালে সমাপনীতে অংশ নেয়। এর মাধ্যমে একজনও ঝরে না পড়ার রেকর্ড তৈরি হয়। ২০১৫ ও ২০১৬ সালেও ঝরে পড়া রোধে জেলা পর্যায়ে প্রথম হয়েছিল স্কুলটি। আর ২০১৪ সালে জেলায় শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এরশাদ আলী বললেন, ‘কিছু পাহাড়ি শিশু, যারা জুমচাষের মৌসুমে স্কুলে আসতে পারে না, তাদের খোঁজ নিয়ে বাড়িতে গিয়ে বুঝিয়ে স্কুলে আনা হয়। এমনও হয়েছে যে চাল, ডাল কিনে দিয়ে শিশুকে স্কুলে এনেছি। গত বছর এক শিশুকে দীর্ঘ বিরতির পর আবার বিদ্যালয়মুখী করা সম্ভব হয়েছিল। স্কুল ম্যানেজিং কমিটিও (এসএমসি) এ ব্যাপারে যত্নবান।’

এসএমসি সভাপতি মনির হোসেন বললেন, ‘প্রধান শিক্ষকের প্রতি আস্থা তৈরি হওয়ায় তিনি যা বলেন আমরা তাতেই এগিয়ে আসি। ঝরে পড়া একদম বন্ধ হয়েছে।’

 

ক্রীড়ায় সাফল্য

২০০৩ সাল থেকে বিদ্যালয়ে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার প্রচলন করা হয়। ২০১৫ সালে জাতীয় পর্যায়ে অ্যাথলেটিকসে দুটি পদক পায় এই স্কুলের শিক্ষার্থীরা। জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে এখন পর্যন্ত দেড় শতাধিক পুরস্কার জিতেছে ছাত্র-ছাত্রীরা। ২০১৬ সালে বঙ্গবন্ধু-বঙ্গমাতা ফুটবলে জেলায় প্রথম স্থান অর্জন করেছে এই স্কুল। প্রথম দিকে এরশাদ আলী নিজের টাকায় বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার কিনে দিতেন। নিজেই অভিভাবকদের ডেকে এনে নানা আনন্দ-আয়োজনের ব্যবস্থা করতেন। পুরস্কার পেয়ে খুশিতে বাড়ি ফিরত অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা। পরে সেই অভিভাবকরাই টাকা তুলে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে থাকে। স্কুলে ক্রীড়া শিক্ষক নেই। এরশাদ আলী নিজে ট্রেনিং দেন। শিক্ষার্থীদের ছবি আঁকাও শেখান এরশাদ আলী। 

ভবানীচরণ রোয়াজাপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়

একদিন সরেজমিনে

সব কিছুই ছিমছাম, পরিপাটি। কোথাও ময়লা-আবর্জনা জমে নেই। প্রথম দেখায়ই ভালো লেগে যায়। ১৯৬৫ সালে স্কুলটি প্রতিষ্ঠা পায়। এখন  প্রধান শিক্ষকসহ ৯ জন শিক্ষক কর্মরত আছেন। ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ৪৬৭। এরশাদ আলী স্কুলে আসার পর এলাকার মুরব্বি, জনপ্রতিনিধি, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য ও অভিভাবকদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। এলাকার হেডম্যান-কারবারি, ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য, গণ্যমান্য ব্যক্তি ও অভিভাবকদের নিয়ে উঠান বৈঠক ও মা সমাবেশ করেন। স্কুলের ছোট্ট একটি কাজেও সবাইকে নিয়ে বসেন। আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেন। কোনো শিশু একদিন স্কুলে না এলে পরদিনই প্রধান শিক্ষক অথবা অন্য কোনো শিক্ষক শিশুর বাড়িতে যান। খাতা-কলমের সমস্যা থাকলে স্কুলের টাকায়ই কিনে দেন প্রধান শিক্ষক। এরশাদ আলী বলেন, ‘এ বছরও ১০০ ছাত্র-ছাত্রীকে খাতা-কলম কিনে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার উদ্বৃত্ত টাকাও অভাবী আর দুস্থ শিশুদের জন্য ব্যয় করা হয়। এলাকার বিত্তবানরাও স্কুলে অনুদান দিয়ে থাকেন। ২০১৬ সালে স্কুলের টাকায় গরিব ও মেধাবী ১০ শিক্ষার্থীকে স্কুল ড্রেস দেওয়া হয়েছিল। আর এ বছর এসএমসির সভাপতি মনির হোসেন পেনসিল বক্স দিয়েছেন।’

 

একজন এরশাদ আলী

গুমতি ইউনিয়নের মালেক মাস্টারপাড়ার মরহুম লাল মিয়ার সবচেয়ে ছোট ছেলে এরশাদ। মাটিরাঙা ডিগ্রি কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করেন। ১৯৮৬ সালে শিক্ষক হিসেবে চাকরি জীবন শুরু। ভবানীচরণ রোয়াজাপাড়া স্কুলে প্রথমে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন ১৯৯০ সালে। ১৯৯৫ সালে প্রধান শিক্ষক হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে মোহন্ত কারবারিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চলে যান। পরে ২০০২ সালে ফের আসেন এই স্কুলে। গৃহিণী স্ত্রী, এক ছেলে ও তিন মেয়ে নিয়ে তাঁর সংসার। খুব সাদামাটা জীবনযাপন করেন।

 

ছবি : লেখক ও সংগ্রহ


মন্তব্য