kalerkantho


বগুড়া

মুসার একটাই কাজ

মানুষের উপকার করার সুযোগ খুঁজে বেড়ান মুসা জাকারিয়া। সান্তাহার স্টেশনে তাঁর দেখা পেয়েছিলেন মাসুদ রানা আশিক

৩০ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



মুসার একটাই কাজ

শান্তাহার জংশনে বৃদ্ধদের সঙ্গে মুসা

বগুড়া জেলার আদমদীঘি উপজেলার সান্তাহার পৌরসভার ঢাকাপট্টিতে থাকেন মুসা। আদি বাড়ি নরসিংদীর শিবগঞ্জ উপজেলার খৈইনকুট। বাবার রেলের চাকরি। সেই সূত্রে সান্তাহারে জন্ম থেকেই। স্টেশনেই তাঁকে পাওয়া গেল। একটু নিরিবিলিতে কথা বলবেন বলে নিয়ে গেলেন সান্তাহার ইয়ার্ডের পশ্চিম পাশে।

মুসার বাবা মিজানুর রহমান মারা যান ২০০৭ সালে। বাবা ছিলেন রেলওয়ের বুকিং সহকারী। বেশ বড়ই মুসাদের সংসার। রোজগার বলতে মুসার টিউশনির টাকা আর বাবার গ্র্যাচুইটি। তবু মুসার নেশা কাটে না। নেশা বলতে ওই—মানুষের উপকার করা।

 

ফার্স্ট ডিভিশনে মেট্রিক পাস

মুসা জন্ম ১৯৮৪ সালের ১০ নভেম্বর। শিক্ষকতা তাঁর পেশা। তবে কোনো স্কুল-কলেজে পড়ান না। টিউশনি করেন। বিভিন্ন ব্যাচ মিলিয়ে তাঁর ছাত্র-ছাত্রী ৩৮ জন। ছাত্র-ছাত্রীদের টাকার কথা বলতেও লজ্জা পান। তবে ছাত্র-ছাত্রীরা তাঁকে ঠকায় না। ১৯৯৯ সাল থেকে পড়াচ্ছেন। তখন ছিলেন নবম শ্রেণির ছাত্র। নিজের ক্লাসের বন্ধুদের পড়িয়েই হাতেখড়ি। বেশ একটা ব্যাপার তো! বললাম, ঘটনাটা খুলে বলুন। মুসা বলতে থাকলেন, ‘আমি নিজে যতটা বুঝতাম, সহপাঠীরা ততটা বুঝত না। তাই তারা আমার কাছে পড়তে আসত। ৫০ টাকা করে দিত।’ ২০০০ সালে মুসা এসএসসি পাস করেন ফার্স্ট ডিভিশনে। এইচএসসিতে অবশ্য সেকেন্ড ডিভিশন পান। কিন্তু অঙ্কের মাথা ভালো ছিল। নওগাঁ সরকারি কলেজে স্নাতক শ্রেণিতে ভর্তি হন। বিষয় অঙ্ক। কিন্তু তৃতীয় বর্ষে গিয়ে পড়ালেখায় ইতি টানেন। কারণ বললেন, ‘পড়ালেখা তো একটা মজার বিষয়। কিন্তু চাপাচাপি করলে কি মজা থাকে? আমি কিন্তু পড়াই মজা করে। ছাত্র-ছাত্রীদের ভাবতে শেখাই। যেমন জিজ্ঞাসা করি, চেয়ারের নাম যদি টেবিল হতো তাহলে কেমন হতো?’

 

মুসার ভাবনা অনেক

টাকার অভাবে কেউ পড়তে পারছে না—জানলে মুসা আর থির থাকেন না। বাড়ি গিয়ে তাঁর পরিবারকে বুঝিয়ে আসেন। স্কুলে গিয়ে বেতন শোধ করে আসেন। বললেন, ‘আমি এটা মেনে নিতে পারি না। শিক্ষা এমন এক জিনিস, যা মানুষকে মানুষ হতে শেখায়। পড়াশোনা করেই মানুষ তাঁর স্বপ্ন ছুঁতে পারে। ভালোভাবে পড়াশোনা করলে মানুষকে বিদেশে যেতে হয় না। দেশে মা-বাবার সঙ্গে থেকেই জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারে।’ মুসা ভাবেন, ছোট্ট দেশটায় অভাবী মানুষ অনেক। কত মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে। যারা সুস্থ আছে তাদের অসুস্থ মানুষের কথা ভাবতে হবে। সবাই চোখ বুজে থাকলে চলবে কিভাবে? 

 

ভাবা শুরু

১৯৯৯ সালেরই কথা। একদিন বাজারে গেছেন। একজন মানুষ তাঁর কাছে খাবার চাইল। মুসা বেকায়দায় পড়ে যান। বাবা বাজার করার জন্য তাঁকে টাকা দিয়েছেন কিছু। এটা থেকে দেওয়া ঠিক হবে কি না ভেবে কুল করতে পারছিলেন না। শেষে ওই টাকা দিয়ে মানুষটাকে খাইয়েই দিলেন। একবার একজনকে জুতাও দিয়ে দিয়েছিলেন। সেই থেকে ব্যাপারটা নিয়মিত হয়ে দাঁড়ায়। তাই বলে কেউ তাঁকে ফাঁকিও দিতে পারে না। বললেই হয় না যে আমি গরিব, আমাকে কিছু সাহায্য করুন। মুসা দস্তুরমতো ইন্টারভিউ নেন। কথাবার্তা চালিয়ে বোঝার চেষ্টা করেন লোকটা আসলে সত্যি বলছে কি না। যদি সত্যি হয় তবে মুসা তাঁর জান দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

 

মনটা তাঁর সেবা দিতে চায়

এ পর্যন্ত অনেক মানুষকেই চিকিৎসাসহায়তা দিয়েছেন মুসা। জাকির হোসেনের বেলায় ঘটেছিল বলার মতোই ঘটনা। জাকির যশোর থেকে এসেছিল সান্তাহারে। তার শরীরে আঘাতজনিত পচন ধরেছিল। বড় ধরনের অপারেশন প্রয়োজন হয়ে পড়ে। মুসা তাঁর জন্য ২০ হাজার টাকা ব্যয় করেছিলেন। জাকির পরে সুস্থ হয়ে সান্তাহারেই ঘর তুলে থাকছে। কাজকর্ম করছে। এরপর চার বছরের এক শিশুর চিকিৎসায় মুসা ব্যয় করেন ২৫ হাজার টাকা। মোটরসাইকেলের ধাক্কায় শিশুটির পায়ের জয়েন্ট খুলে গিয়েছিল। এখন শিশুটি সুস্থ আছে। মুসা সচ্ছল মানুষের পাশেও দাঁড়ান। টাকা দিয়ে না হলেও সেবার মন নিয়ে। কেউ অসুস্থ জানতে পারলে মুসা হাজির হয়ে যান। যদি কোনো কাজে লাগতে পারেন!  

 

কমপক্ষে তিনজন

মুসার আরেকটা নেশা। দিনে কমপক্ষে তিনজনকে তিনি খাওয়ান। কাজটি  করে আসছেন ২০০৭ সালের ১৩ আগস্ট থেকে। এরপর থেকে কোনো দিনই এর ব্যতিক্রম হয়নি। মুসা বললেন, ‘বেশির ভাগ অভুক্ত মানুষ পাওয়া যায় দুপুরে। আমার বাবাও মানুষকে খাওয়াতে পছন্দ করতেন। আমার মনে হয়, ক্ষুধার্ত মানুষ সবচেয়ে অসহায়। ক্ষুধার্তকে আহার দেওয়ার মতো বড় কাজ আর নেই। খাওয়া শেষে পরিতৃপ্ত মুখ দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। মূলত স্টেশনেই এমন লোক খুঁজে বেড়াই। পেয়েও যাই সহজে। তারা সাধারণত পথশিশু বা ভিক্ষুক। স্টেশনে এমনিতেই অনেক লোক অসহায় অবস্থায় ঘুরে বেড়ায়। তাই স্টেশন একটা ভালো জায়গা।’ প্রতি বছর মুসা কম করেও ১০-১৫ জনকে শীতবস্ত্র দেন। তাঁর কাজে সহযোগী পেয়েছেন বন্ধু নাজমুল আর শামীমকে। শিক্ষার্থীরাও তাঁকে সহযোগিতা দেয়।

 

বৃদ্ধদের সময় দেন

স্টেশনে বিচিত্র সব মানুষ ঘোরাফেরা করে। মুসার ভালো লাগে তাদের দেখতে। অনেক কিছু শেখেনও এসব মানুষের কাছ থেকে। এ ছাড়া নিয়ম করে তিনি বৃদ্ধদের সঙ্গে সময় কাটান। তাঁদের কথা শোনেন। বৃদ্ধদের কথা কেউ শুনতেই চায় না। কিন্তু তাঁদেরও বলার আছে অনেক। মুসা মনোযোগী হয়ে তাঁদের কথা শোনেন। 

 

ইচ্ছা করে

যারা ঝরে পড়তে চায়নি কিন্তু পরিবার পড়ানোর দায়িত্ব নিতে পারেনি তাদের দায়িত্ব নিতে চান মুসা। তাদের ভর্তি থেকে শুরু করে সব কিছুর দেখভাল করতে চান। বৃদ্ধদের নিয়ে একটি বৃদ্ধাশ্রম করার কথাও ভাবেন তিনি। কারণ বৃদ্ধরা অনেক অসহায়। এ ব্যাপারে কয়েকজনের সঙ্গে কথাও বলেছেন। তাঁরা সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

 

ছবি : লেখক



মন্তব্য