kalerkantho


ময়মনসিংহ

সেবা আপা

বয়স তাঁর ৫৫ বছর। তার মধ্যে সেবাই দিচ্ছেন ৩৮ বছর। নিজেই একটি সেবাকেন্দ্র। ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার রহিমা খাতুন সবার কাছে সেবা আপা নামে পরিচিত। খবর পেয়েছেন আলম ফরাজী

৩০ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



সেবা আপা

পর পর তিনবার তিনি সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচিত কাউন্সিলর। প্রতিবারই পাঁচ-ছয়জন প্রতিদ্বন্দ্বী থাকেন। কিন্তু কেউ তাঁকে হারাতে পারেন না। কারণ তিনি মানুষের সেবা দিয়ে আসছেন ৩৮ বছর ধরে। আশপাশের চারটি গ্রামের প্রসূতি মা ও শিশুরা কোনো সমস্যায় পড়লে রহিমাকে পাশে পায়।

 

একজন রহিমা খাতুন

ঈশ্বরগঞ্জ পৌরসভার চরনিখলায় বাড়ি রহিমা খাতুনের। নিজের বলতে তাঁর কিছু নেই। বড় মেয়ে তাঁকে একটি চালাঘর তুলে দিয়েছে। সেখানে একাই থাকেন। স্বামী মারা গেছেন চার বছর আগে, ক্যান্সারে। স্বামীর চিকিৎসা করাতে ভিটামাটি সবই বিক্রি করেছেন। দুই মেয়ে বকুল ও রুমার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল আগেই। ধাত্রীর কাজ করেন রহিমা খাতুন। কয়েক বছর একটি বেসরকারি সংস্থায় স্বেচ্ছাসেবকের কাজও করেছেন।

 

শুরুর দিনগুলো

রহিমা খাতুনের বিয়ে হয় ১৬ কি ১৭ বছর বয়সে। প্রথম সন্তানের জন্ম হয়েছিল বছর ঘুরতেই। ওই সময় তাঁর শরীরে অনেক জটিলতা দেখা দেয়। কাছাকাছি সময়ে ভাইয়ের ছেলের স্ত্রীও ছিল অন্তঃসত্ত্বা। তখন বর্ষাকাল। বৃষ্টি হচ্ছিল কয়েক দিন ধরেই। ভাতিজার স্ত্রীর প্রসব বেদনা শুরু হলে পাশের গ্রাম থেকে একজন ধাত্রী ডেকে আনা হয়। কিন্তু তিনি অনেক চেষ্টা করেও প্রসব করাতে পারছিলেন না। একপর্যায়ে প্রসূতি সন্তানসহই মারা যায়। এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারেননি রহিমা। নিজেকে তাঁর খুব অপরাধী মনে হচ্ছিল। তারপর থেকে রহিমা খাতুন ধাত্রীর কাজ শিখতে থাকেন। পুরনো ধাত্রীদের সহকারী হিসেবে নানা জায়গায় যেতেন। তারপর তো ৩৮ বছর চলে গেল।    রহিমা বলেন,  ‘এক হাজার হয়ে যাবে। হ্যাঁ প্রায় এক হাজার শিশু আমার সহায়তায় জন্ম নিয়েছে। চরনিখলা ছাড়াও শিমরাইল, কাঁকনহাটি আর মাইজহাটির সবাই আমার নাম জানে। আমাকে ডেকে পাঠায়।’

 

যেভাবে সেবা দেন

এখন সব বাড়িতেই তাঁর মোবাইল নম্বর দেওয়া আছে। রাত-বিরাতে যখনই খবর আসে ছুটে যান। অবস্থা সে রকম বুঝলে প্রসূতিকে দ্রুত নিয়ে যান স্থানীয় হাসপাতালে। সেখানে  ব্যবস্থা না হলে জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা কার্যক্রম চালান। সুস্থ মায়ের সুস্থ সন্তান হলে তাঁর খুশির সীমা থাকে না। রহিমা বলেন, ‘দিনের একটি সময় খোঁজ করে বেড়াই কোন গ্রামে কার স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা, সন্তান আসার দিনক্ষণ কাছেই কি না। বাকি সময় ব্যয় করি পৌরসভায়।’ নির্বাচন করতে রহিমা খাতুনের টাকাপয়সা লাগে না। লোকেরাই পোস্টার করে দেয়। 

 

কারা সেবা নেন

একসময় নিম্ন-মধ্যবিত্ত ঘরের লোকেরাই বেশি রহিমার সেবা নিতেন। এখন তিনি সবারই সেবা আপা। রহিমা কাছে থাকলে অন্য কাউকে আর প্রয়োজন পড়ে না। শিমরাইল গ্রামের আছিয়া খাতুন, ছালেমা খাতুন, মনোয়ারা খাতুন ও নার্গিস বেগম জানান, রাত-বিরাতেও তাঁরা রহিমা আপাকে কাছে পান। রোগীদের নিয়ে তিনি হাসপাতালে ছুটে যান। প্রসূতি মায়েদের নিয়ে এখন আর বাড়তি চিন্তা নেই পরিবারগুলোর। তাঁরা আরো জানান, কেউ অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর থেকেই নিয়ম করে খোঁজ-খবর নেন রহিমা আপা। সুস্থ থাকার করণীয় বুঝিয়ে দেন।

 

প্রসূতি মা ও শিশুদের সঙ্গে রহিমা

রহিমা আপা বললেন

জীবনটাই পার করলাম মা ও শিশুদের নিয়ে। তাদের কিছু হলে আমার ভালো লাগে না। মাঝেমধ্যে টানা দুই-তিন রাতও জেগে থাকতে হয়। গেল সপ্তাহে সাতজন প্রসূতি মাকে নিয়ে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ছিলাম। আল্লাহর রহমতে সবাই ভালো আছে। তিনটি ছেলে ও চারটি মেয়ে হয়েছে।

 

সাগরেদ সুরুজ আলী

প্রতিদিন ভোরেই হাজির হয় সুরজ আলী। রহিমার বাড়িতে। এসে জিজ্ঞেস করে, আজ কোথায় যাওয়া লাগবে? সুরুজ বলল, ‘আপার সঙ্গে রাত-বিরাতে থাকি। এটা আমার ভালো লাগে। আপা কোনো টাকা নেন না। উল্টো খরচ করেন।’ রহিমা বললেন, আমার এখন একটাই স্বপ্ন, ছোট হলেও একটি শিশু হাসপাতাল করা। যাঁদের টাকা আছে, তাঁরা যদি সাহায্য করেন স্বপ্নটা পূরণ হয়।

 

ছবি : লেখক


মন্তব্য