kalerkantho


বাকি ইতিহাস

বাঁদি থেকে বেগম

মেয়েটি ছিল বাঁদি। যত না রূপবতী ছিল, বুদ্ধিমতী ছিল তার চেয়ে বেশি। সুলেমানের হৃদয় নিল কেড়ে। মুহিব্বি মানে লাভার, মানে প্রেমিক ছদ্মনামে কবিতা লিখলেন সুলতান সুলেমান। বাঁদিটিকে করলেন বেগম। হয়ে উঠলেন সুলতানাদের সুলতানা। পাত্তা লাগিয়েছেন তাহসিন চোকদার

২ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



বাঁদি থেকে বেগম

রূপবতী ছিলেন, বুদ্ধিমতীও ছিলেন

হুররম মানে হাসি-খুশি। মা-বাবা  নাম রেখেছিলেন আলেকজান্দ্রা। পশ্চিম ইউক্রেনের রুথেনিয়ায় তাঁর জন্ম হয়েছিল ১৫০১ সালে। জায়গাটি তখন ছিল পোল্যান্ডের অংশ। তাঁর বাবা ছিলেন একজন খ্রিস্টান যাজক। কিশোরবেলায় তাতারদের হাতে বন্দি হন আলেকজান্দ্রা। তারপর তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় ক্রিমিয়ার শহর কাফফায়। কাফফা তখন একটি বড় দাস ব্যবসাকেন্দ্র। কাফফা থেকে পরে আলেকজান্দ্রাকে ইস্তাম্বুলের তোপকাপি প্রাসাদে পাঠানো হয়। সেখানে তাঁকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।   প্রাসাদের নিয়ম-কানুন ভালোই রপ্ত করেছিলেন আলেকজান্দ্রা।

কারণ তিনি বুদ্ধিমতী ছিলেন। তাঁর নতুন নাম হয় হুররম। ভালো রসিকতা জানতেন তিনি, মুখ থাকত হাসি হাসি। রূপের চেয়ে গুণে বেশি এগিয়ে ছিলেন হুররম। যে বছর সুলেমান গদিনশিন হন, ওই বছরই হুররমের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়ে যায়। সুলেমানের মা হাফসা সুলতান হুররমকে সুলেমানের খাস দাসী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। পরের বছরই তাঁদের প্রথম সন্তান মেহমেদের জন্ম হয়। কথিত আছে, হুররম প্রথম প্রস্তাবেই রাজি হননি। বরং উল্টো সুলেমানকে বলেছিলেন, বিয়ের আগে তাঁকে মুক্তি দিতে হবে। সুলতান সুলেমান হুররমের শর্তে রাজি হন এবং তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। অটোমানদের মধ্যে এমন ঘটনা এটিই প্রথম।

আসল হুররম সুলতান। হুররম মানে হাসি-খুশি

হুররমের শেখার আগ্রহ ছিল

তোপকাপি প্রাসাদে আসার পর থেকেই হুররম যতটা পেরেছেন শিখেছেন। তিনি অটোমানদের ভাষা শিখেছেন। গণিত চর্চা করেছেন। জ্যোতির্বিদ্যায় উৎসাহী ছিলেন। ভূগোল, কূটনীতি, সাহিত্য আর ইতিহাসও অধ্যয়ন করেছেন। রসায়নশাস্ত্রেও তাঁর প্রবল আগ্রহ ছিল। এর্ডিয়ন প্রাসাদে প্রত্নতাত্ত্বিকরা খনন চালিয়ে সুগন্ধি তৈরির উপকরণ খুঁজে পেয়েছেন।  

 

হুররম বুদ্ধিমতী ছিলেন

কখনোই প্রাসাদ ছেড়ে দূরে যেতে হয়নি হুররেমকে। অথচ সুলতানের আরেক প্রিয়তমা মাহি দেব্রান সুলতানকে চলে যেতে হয়েছিল ছেলে শাহজাদা মোস্তফার সঙ্গে প্রাদেশিক রাজধানী মানিসায়। শাহজাদা মোস্তফা এবং পারগালি ইব্রাহিম পাশার হত্যা ষড়যন্ত্রে হুররমের হাত আছে বলেই লোকের ধারণা। কিন্তু হুররমকে তার জন্য বেশি গঞ্জনাও সইতে হয়নি। হুররম  কোনো কোনো সময় সুলতানের তুঘরাও (সিলমোহর) ব্যবহার করেছেন। বিশেষ করে পররাষ্ট্রবিষয়ক ঘটনাবলিতে তিনি অনেকবারই সুলতানকে পরামর্শ দিয়েছেন। গবেষকরা নিশ্চিত হয়েছেন, হুররম সুলতানের কারণেই পোলিশ-অটোমান  মৈত্রী গড়ে উঠেছিল। তিনি হয়ে উঠেছিলেন সুলতানের অন্যতম উপদেষ্টা। হুররম সুলতানকে এখনকার টিভি সিরিজে ষড়যন্ত্রকারী হিসেবেই দেখানো হয়েছে বেশি। কিন্তু ঐতিহাসিকরা এটাও বলেন, হুররমপ্রেমই সুলতান সুলেমানকে (তাঁকে বলা হয় সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট) শক্তি জুগিয়েছে। এ ক্ষেত্রেও সেই প্রবাদবাক্যটি অনেকের মনে পড়বে, প্রত্যেক শক্তিশালী পুরুষের পেছনেই আছে একজন শক্তিশালী নারী। হুররমের প্রধান অস্ত্র ছিল তাঁর বুদ্ধি আর ভুবনমোহিনী হাসি।   

টিভির হুররম ও সুলেমান

সুলেমানকে লেখা হুররমের একটি চিঠি

যে মাটিতে আপনার পা পড়েছে, তা চুম্বন করেই কাটছে আমার দিন। যদি জানতে চান কেমন আছি তবে বলি, আপনার বাঁদি আপনার বিরহ সইতে পারছে না, তাঁর হৃদয় পুড়ে যাচ্ছে। তাঁর চোখ ভেসে যাচ্ছে অশ্রুতে। সে এখন দিন-রাতের ফারাক করতে পারছে না। লাইলীরও (লাইলী-মজনু প্রেমগাথার) বুঝি এত কষ্ট হয়নি! আমার প্রিয় সুলতান, দেড় মাস পার হয়ে গেছে আমি আপনার কণ্ঠ শুনতে পাইনি। মহান সৃষ্টিকর্তা সাক্ষী, আপনার কথা ভাবতে ভাবতে আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। আপনার অপেক্ষায় আমার রাত ভোর হয়ে যায়। ভাববেন না শুধু আমি, আসলে পুরো শহরই আপনার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে আজ।  

এর্ডিয়ন প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ।

হুররম ভবন তৈরি করিয়েছিলেন

অটোমান আমলে স্থাপত্য আর শিল্পকলা বেশ প্রসার লাভ করেছিল। ধর্মীয়, জনহিতকর ও শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য শাসকগোষ্ঠী স্থপতিদের সম্মান ও সম্মানী উভয়ই দিতেন। প্রাসাদ নির্মাণেও অনেক সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন তখনকার স্থপতিরা। অটোমানদের মধ্যে আবার সুলতান সুলেমানের আমলেই বেশি জাঁকজমকপূর্ণ স্থাপনা নির্মিত হয়েছিল। তাবরিজ থেকে ভিয়েনা পর্যন্ত সাম্রাজ্য ছিল সুলেমানের। হুররম সুলতান প্রচুর সম্পদ ও সম্পত্তির মালিক ছিলেন। তিনি ইস্তাম্বুলে তো বটেই, জেরুজালেমেও স্থাপনা তৈরি করিয়েছিলেন। ১৫৩৯ সালে তিনি রয়্যাল আর্কিটেক্ট মিমর সিনানকে মসজিদসহ একটি বিল্ডিং কমপ্লেক্স নির্মাণের দায়িত্ব দেন। ১৫৫০ সালে ওই কমপ্লেক্সে নারীদের একটি হাসপাতাল ও একটি স্যুপ কিচেন যুক্ত করা হয়। এ ছাড়া হুররম যে হাম্মামখানা গড়ে তুলেছিলেন, তাতে নারী ও পুরুষের জন্য আলাদা আলাদা গোসলের ব্যবস্থা ছিল। ইস্তাম্বুলের হাম্মামগুলোর মধ্যে একে অনন্য ধরা হয়।  

 

হুররমের মৃত্যু

১৫৫৮ সালে মারা যান হুররম। হুররম ও সুলেমান দম্পতি পাঁচ ছেলে ও এক কন্যাসন্তান জন্ম দিয়েছিলেন। হুররমের ছেলেদের একজন শাহজাদা সেলিম অটোমান সুলতান (১৫৬৬-৭৪) হতে পেরেছিলেন। তাঁর সন্তানদের মধ্যে কন্যা মেহেরিমা সুলতানকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে বর্ণনা করেন ঐতিহাসিকরা। কারণ তিনি তাঁর মা হুররমের বুদ্ধি, কৌশল ও শক্তি পেয়েছিলেন। হুররমের মৃত্যুর পর সুলেমান খুব কাতর হয়ে পড়েন। হয়ে ওঠেন বিরহী কবি।


মন্তব্য