kalerkantho


আরো জীবন

পিতরাম কান পরিষ্কার করেন

নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার সাহেবগঞ্জ এলাকায় থাকেন পিতরাম বানজারা। তাঁর কাজ মানুষের কান পরিষ্কার করা। দেখা পেয়েছিলেন মাসুদ রানা আশিক

২ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



পিতরাম কান পরিষ্কার করেন

পিতরাম বানজারা

লঞ্চঘাট, বাস বা রেলস্টেশনে আগেও দু-চারজনকে দেখেছি। আর পিতরামকেও পেলাম আত্রাইয়ের আহসানগঞ্জ রেলস্টেশনে।

খুবই ছিমছাম একজন মানুষ। একজন মানুষের কান পরিষ্কারে ব্যস্ত ছিলেন তখন। গায়ে কমলা রঙের গেঞ্জি। গালভর্তি দাড়ি। মুখের নড়াচড়া দেখেই বোঝা যাচ্ছে তিনি পান চিবোচ্ছেন। পাশেই রাখা ছোট একটা ব্যাগ। তাতে কান পরিষ্কারের নানা জিনিস। কিছুক্ষণ পর কাজে ক্ষান্ত দিলেন। আমি পাশে গিয়ে বসলাম।

 

পিতরামরা বানজারা

পিতরাম মা-বাবার দ্বিতীয়  সন্তান। বাবার নাম রাম বাবু বানজারা। মা কমলা রানী। পিতরামের বাবা, দাদা ও চাচা একই কাজ করেন। মা গৃহিণী। এককথায় এটা তাঁদের আদি পেশা। তাঁরা বানজারা। কারণ তাঁরা যাযাবর। আগে বাড়িঘর ছিলই না। রাস্তায় রাস্তায়, বাস বা ট্রেনস্টেশনে ঘুরে ঘুরে কাজ করতেন। ঘুমাতেনও যেখানে-সেখানে। এখন অবশ্য সেদিন আর নেই। এখন তাঁদের নিজস্ব বাসা-বাড়ি হয়েছে। তবে কাজটা ঘুরে ঘুরেই করতে হয় এখনো। বাড়িতেও কিছু রোগী যায়। শুধু কান পরিষ্কারই নয়, অনেকের কান পাকে, কান দিয়ে পুঁজ বের হয়, কেউ  কানে কম শোনে, কান ব্যথাও করে অনেকের। এমন ব্যক্তিদেরও চিকিৎসা দিয়ে থাকেন পিতরাম ও তাঁর পরিবার। বাপ, চাচা ও দাদা কবিরাজিও করেন। দেশে এখন এত এত কানের চিকিৎসক। তার পরও পিতরাম কিংবা তাঁর পরিবারের কাছে এখনো বহু রোগী আসে।

কান পরিষ্কারে ব্যস্ত পিতরাম

১৭ বছর ধরে

কত দিন হলো এ কাজ করছেন? এমন প্রশ্নে একগাল হাসি দিলেন পিতরাম। বলেন, ‘খুব ছোট থেকেই এ পেশায় আসা। ধরেন ১৭ বছর হবে। ’  এখন পিতরামের বয়স ২৮। ‘তার মানে মাত্র ১১ বছর বয়স থেকে এই পেশায় কাজ করছেন?’ এবারও পিতরাম বেশ সরল—‘আদি পেশা তো। সেই ছোট থেকেই বাবাকে দেখছি এই কাজ করতে। তাই আমিও চলে এসেছি সেই ছোটকাল থেকেই। তবে বাবা এখন আর বাইরে ঘোরেন না। বাড়িতেই কবিরাজি করেন। ’

 

মেয়ে বানে ভেসে গেছে

পিতরাম বানজারার দুই সন্তান। একটি মারা গেছে গত বন্যায় পানিতে ডুবে। বাকি আছে একটি মেয়ে। তার বয়স সাড়ে চার বছর। মেয়েকে তিনি উচ্চশিক্ষিত করবেন বলে জানান। পিতরামের শিক্ষাগত যোগ্যতা খুব একটা নেই। পঞ্চম শ্রেণি পাস করেছেন। শুধু ছোট ভাই ছাড়া কেউই বেশিদূর পড়াশোনা করেনি। পিতরামের ছোট ভাই জিত কুমার  এসএসসি পাস করে নওগাঁর একটি কলেজে পড়াশোনা করছেন এখন।

পিতরামের ঘরপিতরামের ঘর

মজুরি ৩০ টাকা

পিতরাম দৈনিক ২০-২৫ জন রোগী পান। কান দেখে টাকার কথা হয়। তবে ৩০ টাকার নিচে মজুরি হয় না। ওই টাকা শুধু কান পরিষ্কারের জন্যই। আর কান পাকা, কানে পুঁজ হওয়া, কানে কম শোনা ইত্যাদিতে টাকার পরিমাণ বাড়ে। দিনে ৫০০, এমনকি ১০০০ টাকাও থাকে তাঁর। শুধু আহসানগঞ্জ স্টেশন নয়, পাশের সান্তাহার, নাটোর এমনকি রাজশাহীতেও তিনি যান। কান পরিষ্কারে তিনি শুধু একটি শিক, একটি চিমটা ব্যবহার করেন। কারো কোনো ক্ষতি হয়েছে কি না জানতে চাইলে বলেন, ‘না ভাই, কান পরিষ্কারে এ পর্যন্ত কারো কোনো ক্ষতি হয়নি। তবে কান পরিষ্কার করতে গেলে তীক্ষ চোখ থাকা চাই। একটু ভুল দেখার জন্য সমস্যাও হতে পারে। অভিজ্ঞতারও প্রয়োজন আছে। যে কেউ চাইল আর করে ফেলল—এমন নয়। ’

 

হিলি বর্ডার পার হন

ভারতেও তাঁর যাওয়া-আসা আছে। হিলি বর্ডার দিয়েই বেশি পার হন। সেখানেও তাঁর আত্মীয়-স্বজন আছে। নানা-নানির বাড়ি ভারতে। বিয়েও করেছেন সেখানে। ভারতের বিহার রাজ্যের কাইহারে তাঁর শ্বশুরবাড়ি। স্ত্রীর নাম চান্দিনা দেবী। পিতরাম একই কাজ করেন সেখানেও। শ্বশুরবাড়ির লোকজনও বহু বছর ধরে এই কান পরিষ্কারের পেশা বেছে নিয়েছে। যদিও আধুনিক এই যুগে এসে তাঁর শ্বশুরবাড়ির কিছু লোক কান পরিষ্কারের পেশা থেকে বেরিয়ে এসে ব্যবসা-বাণিজ্য করছে। সেখানে উপার্জন নাকি আরো বেশি। কিভাবে যান ভারতে—এমন প্রশ্নে একটু হাসেন তিনি। ‘আগে যেতে সমস্যা হতো। বিজিবি ও বিএসএফকে ফাঁকি দিয়ে অনেকটা গোপনেই যেতাম ভারতে। কিন্তু এখন যাই পাসপোর্ট-ভিসা নিয়ে। এখন আর কোনো সমস্যাই হয় না। ’ 

 

ছবি : লেখক


মন্তব্য