kalerkantho


শীত এলো

দেলদুয়ারের শাল

তাঁতের শাড়ির পর দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারের শাল-চাদর। উপজেলার আবাদপুর ও এলাসিন গ্রামের কারিগররা এখন শাল-চাদর তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। শাল-চাদর তৈরি দেখতে গিয়েছিলেন অরণ্য ইমতিয়াজ

২ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



দেলদুয়ারের শাল

একসময় সাধারণ তাঁতের শাড়ি তৈরি করতেন আবাদপুরের আব্দুস সালাম। তবে লাভবান হতে পারেননি।

সংসারের খরচ জোগাতেই হিমশিম খেয়েছেন। হতাশ হয়ে ছেড়েও দিয়েছিলেন। মাঝখানে মাছ ধরে সংসার চালাতেন। তখন এক আত্মীয় তাঁকে শাল তৈরির পরামর্শ দেন। তাঁর কথা শুনে তিনি টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার বাথুলী গ্রামের এক বাড়িতে শাল তৈরি দেখতে যান। বাড়ি এসে নিজের তাঁতেই শুরু করেন শাল তৈরির কাজ। প্রথমে বারবার ভুল হচ্ছিল। তবে হাল ছাড়েননি। ধীরে ধীরে কৌশলটা রপ্ত করে ফেলেন। এটা ১৯৯৮ সালের কথা। দেড় বছরের মধ্যে তিনি হয়ে উঠেন শাল তৈরির দক্ষ কারিগর। শাল তৈরি করে লাভবানও হন। তাঁকে দেখে একজন প্রতিবেশীও শাল তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু তাঁর পুঁজি ছিল না। তাঁকে এক মহাজনের কাছে নিয়ে গেলেন আব্দুস সালাম। মহাজন তাঁকে সুতাসহ পুঁজি দিলেন। এভাবে একে একে সাধারণ শাড়ি তৈরি বাদ দিয়ে শাল তৈরিতে ঝুঁকে পড়লেন আবাদপুরের তাঁতিরা। পাশাপাশি কারিগররা জানান, ‘শাড়ির চেয়ে শাল তৈরিতে সময় কম লাগে। একটি সাধারণ শাল তৈরি করতে প্রায় দেড় ঘণ্টা লাগে। একজন কারিগর প্রতিদিন অন্তত চার-পাঁচটি শাল তৈরি করতে পারেন। তবে টানা দীর্ঘ সময় কাজ করলে শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। ’

আবাদপুরে দুই পদ্ধতিতে শাল তৈরি হয়। মহাজনি পদ্ধতি ও নিজ উদ্যোগে। মহাজনি পদ্ধতিতে মহাজন সুতাসহ খরচ দেবেন, আর তাঁতি নিজের তাঁতে শাল তৈরি করে মহাজনের কাছে পৌঁছে দেবেন। প্রতিটি শালের জন্য মহাজন তাঁকে নির্ধারিত মজুরি দেবেন। আর নিজস্ব উদ্যোগে সব খরচ নিজেকেই বহন করতে হয়। শাল বিক্রির জন্য নিজেকেই হাঁটে নিয়ে যেতে হয়। মহাজনদের মাধ্যমেই বেশি শাল তৈরি হয় বলে জানান সেখানকার কারিগররা।

নানা রং ও ডিজাইনে শাল তৈরি হয়। তাদের নামও ভিন্ন ভিন্ন। মণিপুরি, অলবডি, দুসুতি আঁচল অথবা দুসুতি পাড়ের বুটি, জ্যাকেট শাল ইত্যাদি। জ্যাকেট হলো শালের মধ্যে নকশা করার একধরনের মেশিন। এটি দিয়ে শালের দুই পাশে নানা নকশা করা হয়। তাই এর নাম জ্যাকেট শাল। কমদামি ও বেশি দামি শাল রয়েছে।

আবাদপুর শাল তৈরি হলেও বিক্রি হয় করটিয়া হাটে। করটিয়া থেকে পাইকাররা দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করেন। ঢাকা, চট্টগ্রাম, দিনাজপুর, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, সিলেট, খুলনা, সিরাজগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। তবে কেউ বান্ডিল (এক বান্ডিলে ছয়টি শাল) কিনতে চাইলে বিক্রি করা হয়। বান্ডিল ভেঙে বিক্রি হয় না। প্রতিটি শাল তৈরিতে ২২০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। পাইকারিভাবে ৫০ থেকে ১০০ টাকা লাভে বিক্রি করা হয়।

এ বছর শালের বাজার খুব একটা ভালো না বলে জানান কারিগর শহর আলী, মোতালেব হোসেন ও আব্দুস সালাম। তাঁরা জানান, আগে আশ্বিন মাসেই শীত পড়ত, থাকত বেশি সময়। তখন শাল বিক্রি হতো বেশি। এবার অগ্রহায়ণেও তেমন শীত নেই। তাই বিক্রি কমে গেছে। শীতের সঙ্গে শাল বিক্রির সম্পর্ক। শীত যত তীব্র হবে এবং বেশি দিন থাকবে, শাল তত বেশি বিক্রি হবে। শীত তাড়াতাড়ি চলে গেলে আর শাল বিক্রি না হলে অনেকের পুঁজি আটকা পড়ে। তখন লোকসান দিয়ে সেগুলো বিক্রি করতে হয়।

ছবি : লেখক


মন্তব্য