kalerkantho


সরেজমিন

চোখ ঝাপসা হয়ে আসে

কৌশিক দে   

২ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



চোখ ঝাপসা হয়ে আসে

কাঁটায় কাঁটায় ১২টায় পৌঁছলাম। বাড়িটির নম্বর ২৬।

খুলনা শহরের সাউথ সেন্ট্রাল রোডের বাড়িটি দোতলা। বড় একটি সাইনবোর্ড। তাতে লেখা—১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর। গেট পেরিয়েই গাছে ছাওয়া একচিলতে আঙিনা পেলাম। বাড়িটির পেছনদিকে গড়ে তোলা হয়েছে গবেষণাকেন্দ্র। কেন্দ্রের সামনেই খুলনার প্লাটিনাম জুট মিলের সেই অভিশপ্ত বয়লারের ভগ্নাংশ। সংক্ষেপে লেখা রয়েছে—পাক হানাদার বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে এনে নির্যাতন করে এখানেই নির্মমভাবে হত্যা করেছে। তবে সে সংখ্যা কত তা বলা মুশকিল।

এরই মধ্যে আর্কাইভ ও জাদুঘরের ট্রাস্টি ও সম্পাদক ড. শেখ বাহারুল আলমের দেখা পেয়ে গেলাম।

তাঁর সঙ্গে কুশলবিনিময় করতে করতে প্রবেশ করলাম ভবনে। এক নম্বর গ্যালারির শুরুতেই বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণের ছবি। তারপর দেখলাম পঁচিশে মার্চের নিধনযজ্ঞ। ১৯৭১ সালের গণহত্যা স্মারক মানচিত্রও দেখবেন এই গ্যালারিতেই। বাস্তুহারা শরণার্থীদের মিছিলও দেখলাম। আছে পটুয়া কামরুল হাসানের আঁকা ‘এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে’। ডিজিটাল আর্কাইভ রাখা আছে কাছে। যে কেউ সহজেই হাত দিয়ে স্পর্শ করে জাদুঘরের কার্যক্রম জানতে পারবেন। এরপর দেখবেন খুলনার কবির মঞ্জিলের ঐতিহাসিক ৪৯২৬ নম্বরের টেলিফোনটি। এই টেলিফোন দিয়েই ৮ ও ৯ নম্বর সেক্টরের সহযোগী কমান্ডার হুমায়ুন কবির মুজিববাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। এবার বাঁ দিকে পাবেন দুই নম্বর গ্যালারি। আবার হানাদারদের নৃশংসতার চিত্র। শিউরেও উঠবেন। এই গ্যালারিতে মফিদুল ইসলাম টুটুলের দেখা পেলাম। তিনি নিখোঁজ শহীদ মোক্তার হোসেনের ছেলে। ১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর মোক্তার হোসেন শহীদ হন।

টুটুল অনেকটাই আবেগাপ্লুত। বললেন, ‘এখানে সময় পেলেই আসি। এখানে যেন বাবাকে খুঁজে পাই। মনে হয়, ওই নয়তো ওই বধ্যভূমিতে আছেন বাবা। ওই যে বাবার দেহ নিথর হয়ে পড়ে আছে। ’ দুজনই অনেকক্ষণ চুপ থাকলাম।

এরপর টুটুল বললেন, একসময় নিজেকে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান পরিচয় দিতে পারিনি। আমাদের হুমকি দেওয়া হতো। কিন্তু আমরা থেমে যাইনি। বাবার আত্মত্যাগে শুধু আমি নই, আমার পরিবার ও গোটা দেশ গর্বিত। তাই আমি নতুন প্রজন্মকে বলব, সময় পেলে অবশ্যই এই জাদুঘর ঘুরে দেখে যাও। তোমরা তোমাদের শেকড় খুঁজে পাবে। ’

টুটুলকে বিদায় জানিয়ে গেলাম তিন নম্বর গ্যালারিতে। সেখানে প্রথমেই দেখলাম শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীনের শাড়ি। একাত্তরের ১৯ মে খুলনার বাদামতলা গণহত্যার শিকার শহীদ সৌরভী গোলদারের শাড়িও দেখলাম। এরপর গেলাম শহীদ গ্যালারিতে। বাদামতলা গণহত্যার অনেক স্মৃতিচিহ্ন এখানে। গণহত্যার শিকার শহীদ মাধবী বৈরাগীর পরিধানের কাপড়, শহীদ সাংবাদিক সিরাজ উদ্দিনের পায়জামা ও পাণ্ডুলিপি, সেলিনা পারভীনের কলম, শহীদ মুনীর চৌধুরীর পাঞ্জাবি, শহীদ শহীদুল্লা কায়সারের ডায়েরি, শহীদ ডা. আলীম চৌধুরীর নোটবুক, ভিজিটিং কার্ড, চিকিৎসা সরঞ্জাম, শহীদ জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার বই আছে শহীদ গ্যালারিতে।

সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠলাম। কী নৃশংসতা আর বীভৎসতা! চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। কোনো ছবিতেই বেশিক্ষণ চোখ ধরে রাখতে পারছিলাম না। পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের দোসরদের বর্বরতার সাক্ষী শত শত ছবি দোতলার কক্ষগুলোতে। আছে সেই সময়কার দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি ও লেখালেখি। একেবারে শেষের ৭ নম্বর গ্যালারিতে আছে কিছু পেইন্টিং। ২০১৫ সালে শিল্পীর চোখে গণহত্যা-নির্যাতন শীর্ষক একটি আর্টক্যাম্প হয়েছিল। সেখানে শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার, হামিদুর রহমান, মুর্তজা বশীর, আব্দুশ শাকুর, কাজী রকিব, আব্দুর রাজ্জাক, সৈয়দ জাহাঙ্গীর, মাহমুদুল হক, নাসরীন বেগম, বীরেন সোম, কনক চাঁপা চাকমা প্রমুখ এ ছবিগুলো এঁকেছিলেন।

এরপর ধীরে ধীরে নিচে নেমে এলাম। বাহারুল আলম বললেন, আমরা চাই এ জাদুঘর ও আর্কাইভকে কেন্দ্র করে পুরো দক্ষিণাঞ্চলে একটি সাংস্কৃতিক বলয় গড়ে উঠুক। এ অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রথম জাদুঘর এটি। দেশের সবচেয়ে বেশি গণহত্যা ও নির্যাতন হয়েছে এ অঞ্চলে। সবচেয়ে বড় বধ্যভূমি চুকনগরের অবস্থান এখানে। আমরা চাই, নতুন প্রজন্ম এখানে এসে তার অতীত জানুক। ভবিষ্যেক এগিয়ে নিয়ে যাক।

       

প্রচ্ছদের ছবি: কৌশিক দে


মন্তব্য