kalerkantho


এখানে ৭১ কাঁদে

বাংলাদেশের প্রথম ও একমাত্র এ জাদুঘর। খুলনায় অবস্থিত। নাম—১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর। এখন জাদুঘরটির বয়স সাড়ে তিন বছর। গণহত্যা নিয়ে প্রায় ৫০টি বইও প্রকাশ করেছে। বিস্তারিত বলছেন জাদুঘরের প্রধান নির্বাহী কাজল আব্দুল্লাহ। সরেজমিনে দেখে এসেছেন কৌশিক দে

কাজল আব্দুল্লাহ   

২ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



এখানে ৭১ কাঁদে

প্রধানমন্ত্রী জমি দিয়েছেন

পাক্কা দুই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তবেই ঢুকতে পেরেছিলাম আমস্টারডামের অ্যান ফ্রাংক জাদুঘরে। ২০১৫ সালের কথা।

জাদুঘরটি কিন্তু ধরে রেখেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে। দেখলাম বাবা এসেছেন ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে, নব দম্পতিরাও এসেছেন। লাইনের সামনেই দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমরা তো বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত কাটিয়ে উঠেছ অনেককাল। তার পরও কষ্ট নিতে আসো কেন? উত্তর যা পেলাম তার অর্থ দাঁড়ায় এমন—ভবিষ্যতের ভিত্তি কিন্তু অতীত। আমরা বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি মুছে ফেলিনি বলেই ক্ষত কাটিয়ে উঠতে পেরেছি। বারবার আসি এখানে। ছেলেদের এনেছি, নাতি-নাতনিদের আনছি। তারা বুঝতে পারছে কীসব কষ্টের দিন ছিল। আর কোনো হিটলারের জন্ম চায় না ইউরোপ। ’ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে গণহত্যার শিকার এ রকম প্রায় সব দেশেই আছে গণহত্যা জাদুঘর। সে দেশের শিশুদের নিয়মিত সেটি দেখাতে নিয়ে যাওয়া হয়। বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ানো হয় গণহত্যার ইতিহাস। গবেষণাও হয় নতুন নতুন। শুধু তা-ই নয়, এ দেশগুলোতে গণহত্যা নিয়ে মিথ্যাচার বা গণহত্যা অস্বীকার ফৌজদারি অপরাধ।

 

আমাদের সুবর্ণজয়ন্তীর বাকি নেই

মোটে তো কয়েকটা বছর। আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। এ স্বাধীনতা আনতে মাত্র ৯ মাসে ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছেন। নির্যাতিত হয়েছেন পাঁচ লাখ নারী। বাস্তুহারা হয়েছিলেন এক কোটি বাঙালি। এত ত্যাগের পরে দেশটিকে লড়তে হচ্ছে আরেকটি যুদ্ধ। ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে গণহত্যা ও নির্যাতনের ইতিহাসকে তুলে আনার যুদ্ধও চলছে। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে আমরা বিজয়কে যা-ও গুরুত্ব দিয়েছি, গণহত্যা ও নির্যাতনকে তার কাছাকাছিও নয়। আমাদের উদাসীনতার সুযোগ নিয়ে ইতিহাস বিকৃতি বেড়েছে। দেশের হাল যারা ধরবে, তারা বিভ্রান্ত হয়েছে। এ সবের পরিপ্রেক্ষিতেই ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন গড়ে তুলতে চাইলেন গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর। তিনি আরো চেয়েছিলেন ঢাকাকেন্দ্রিকতা থেকে মুক্ত হতে। তাই ২০১৪ সালের ১৭ মে খুলনা শহরের একটি ভাড়া বাসায় এই জাদুঘরের যাত্রা শুরু হয়।

সাউথ সেন্ট্রাল রোডে আর্কাইভ ও জাদুঘরের নিজস্ব ভবন

প্রধানমন্ত্রী জমি উপহার দিয়েছেন

পরে জাদুঘর ট্রাস্টকে খুলনার সাউথ সেন্ট্রাল রোডে একখণ্ড জমি ও একটি বাড়ি উপহার দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভবনটি সংস্কার করে নিজস্ব ভবনে জাদুঘরটি আসে ২০১৬ সালের ২৬ মার্চ। অধ্যাপক মামুন ছাড়াও জাদুঘরের ট্রাস্টি বোর্ডে আছেন শিল্পী হাশেম খান, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির, পেশাজীবী নেতা ডা. শেখ বাহারুল আলম, কবি তারিক সুজাত প্রমুখ।

২০১৭ সালের এপ্রিলে পরিকল্পনা কমিশনের সহযোগিতায় জাদুঘরের ‘গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র’ স্থাপিত হয়। এতে অর্থ সহায়তা দিচ্ছে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

 

আমাদের কাজ

♦ গণহত্যার বিস্মৃত স্থানগুলো যেমন  বধ্যভূমি ও গণকবর চিহ্নিতকরণ।

♦ গণহত্যা-নির্যাতন নিয়ে অনলাইন ও অফলাইন আর্কাইভ গড়ে তোলা।

♦ শিশু-কিশোরদের জন্য নিয়মিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রদর্শনীর আয়োজন করা। প্রতিযোগিতাও।

♦  প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য নিয়ে গণহত্যা-নির্যাতন নির্ঘণ্ট ও শহীদ স্মৃতি গ্রন্থ প্রকাশ করা।

♦ গণহত্যা-নির্যাতন নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সেমিনার এবং শহীদ স্মৃতি বক্তৃতার আয়োজন করা।

♦ সারা দেশে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধের গবেষক তৈরি করা।

♦ নতুন প্রজন্মের জন্য ইয়থ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা।

♦ একাত্তরের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে অ্যাডভোকেসি করা।

 

আমরা যা করে থাকি

স্থানীয় পর্যায়ে গবেষক তৈরির লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যা নিয়ে বছরে দুটি পোস্ট গ্র্যাজুয়েট সার্টিফিকেট কোর্সের আয়োজন করি। ইতিহাসবিদ, মুক্তিযোদ্ধা, অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, আর্কাইভিস্ট, রাজনীতিবিদ, আইনবিদরা কোর্সে প্রশিক্ষণ দেন। প্রথম ব্যাচের প্রশিক্ষণ হয়েছে খুলনায়। ৩১ জন ছিলেন অংশগ্রহণকারী। এখন রাজশাহীতে দ্বিতীয় ব্যাচের প্রশিক্ষণ চলছে। পরবর্তী প্রশিক্ষণ শিবির হবে রংপুরে।

শহীদ স্মৃতি বক্তৃতা ও সেমিনার :  নিয়মিত আয়োজন করা হয় শহীদ স্মৃতি বক্তৃতা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সেমিনার। এখন পর্যন্ত তিনটি শহীদ স্মৃতি বক্তৃতা ও তিনটি জাতীয় সেমিনার আয়োজন করা হয়েছে। গেল ২৫ ও ২৬ নভেম্বর বাংলা একাডেমিতে ‘গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধ’ নিয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিশ্বের ছয়টি দেশের ১৩ জন গবেষক এখানে গবেষণাপত্র পাঠ করেন। দেশ-বিদেশের প্রায় ৫০০ তরুণ গবেষক এতে যোগ দেন।

স্মৃতিফলক স্থাপন : গণহত্যার বিস্মৃত স্থানগুলো চিহ্নিত করার পাশাপাশি বিভিন্ন বধ্যভূমিতে ফলক নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে জাদুঘর। এরই মধ্যে খুলনা জেলার ২০টি গণহত্যাস্থল বা বধ্যভূমিতে স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হয়েছে।

 

আমাদের লাইব্রেরি ও আর্কাইভস

লাইব্রেরিতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে হাজারেরও বেশি বই, আলোকচিত্র, অডিও-ভিডিও ক্লিপ আর দলিল আছে। মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে প্রকাশিত পত্রিকার মধ্যে দৃষ্টিপাত, পূর্বায়ন, সপ্তাহ, দেশের ডাক, ত্রিপুরা, জাগরণ, গণসংহতি ইত্যাদি আছে আমাদের কাছে। সারা বিশ্বের গণহত্যাসংক্রান্ত নানা সংবাদ নিয়ে জেনোসাইড মিডিয়া ডাইজেস্টের কাজ চলছে।

 

আমাদের কিছু প্রকাশনা

দামেরখণ্ড গণহত্যা, লালমাটিয়া, জৈনপুর ও খাজাঞ্চিবাড়ি গণহত্যা, মুজাফরাবাদ গণহত্যা, বেলতলী গণহত্যা, কালিগঞ্জ গণহত্যা, বিনোদবাড়ী মানকোন গণহত্যা, বাদামতলা গণহত্যা, গোলাহাট গণহত্যা, পাহাড়তলী গণহত্যা, কাঠিরা গণহত্যা, হাতিয়া গণহত্যা, কাঠিপাড়া গণহত্যা, জগত্পুর গণহত্যা, ঊনসত্তরপাড়া গণহত্যা, বালারখাইল গণহত্যা, বহলা গণহত্যা, কল্যাণপুর গণহত্যা, পাঁচগাঁও গণহত্যা, দেয়াড়া গণহত্যা, বেশাইন খান গণহত্যা, চুকনগর গণহত্যা, জগত্মল্লপাড়া গণহত্যা, ডাকরা গণহত্যা ইত্যাদি।

আমাদের কিছু অর্জন

♦ আমাদের প্রস্তাবে সম্মত হয়ে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণে ত্রিপুরা সরকার একটি জাতীয় উদ্যান তৈরি করেছে এবং সেখানে গণহত্যা-নির্যাতন জাদুঘরের তত্ত্বাবধানে একটি ভাস্কর্য উদ্যান গড়ে তোলা হয়েছে।

♦ ‘মুক্তিযুদ্ধ ও ত্রিপুরা ১৯৭১’ শিরোনামে ত্রিপুরা জাদুঘরের একটি কক্ষ সজ্জিত করা হয়েছে আমাদের উদ্যোগে।

♦ বাংলাদেশ ডাকবিভাগ গণহত্যা-নির্যাতন জাদুঘরের ওপর একটি স্মারক খাম প্রকাশ করেছে।

 

আমাদের ওয়েবসাইট : www.genocidemuseumbd.org

 

চোখ ঝাপসা হয়ে আসে


মন্তব্য