kalerkantho


এগিয়ে যাও বাংলাদেশ

আলোর পথে

ওদের ঘর নেই, বাড়ি নেই। থাকে ফুটপাতে। তবে স্বপ্ন আছে। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় প্রতি সন্ধ্যায় পড়তে বসে দুই বোন সুমাইয়া ও সুমি। তাদের পড়াশোনার খোঁজখবর নিয়ে এলেন চন্দন চৌধুরী

১১ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



আলোর পথে

ফুটপাতে ল্যাম্পপোস্টের আলোয় পড়ছে ওরা

ফুটপাতের যেখানটায় আলো বেশি পড়ছে সেখানেই পড়তে বসেছে ওরা। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় তাদের বইয়ের লেখাগুলো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না।

তবুও মাথা নুইয়ে পড়ছে দুই বোন। ইংরেজিতে ওয়ান-টু বানান শিখে গেছে সুমাইয়া। তার খাতায় টেন পর্যন্ত লেখা। নাইন বানান করতে বললে বানান করে শোনাল। সে ধানমণ্ডি সুরভি স্কুলের প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। ছোট সুমাইয়া শিশু শ্রেণিতে। সব কটি ব্যঞ্জন বর্ণ লিখে দেখাল সে। হাতের লেখা ঝকঝকে। এক-দুইও সে পারে। স্কুলে সুমাইয়ার ক্লাস হয় সকালে আর বিকেলে সুমির। লেখায় কী একটা ভুল করেছে সুমাইয়া। ধরিয়ে দিলেন তাদের মা কল্পনা বেগম। ওদের তিনিই পড়ান কি না জানতে চাইলে বলেন, ‘যতটুকু পারি দেখাইয়া দিই। ’ অভাবের কারণে নিজে পড়তে পারেননি। কিন্তু মেয়েরা যেন পড়তে পারে সে জন্য শত কষ্ট হলেও স্কুলে পাঠান।

কল্পনা বেগম বললেন, ‘স্কুল থাইকা ড্রেস আর বই দেয়। খাতা কিন্যা নিতে হয়। কিন্তু এক ড্রেসে তো বছর চলে না। বৃষ্টির দিন সমস্যা হয়। কাপড় ময়লা হয়। তাই কাপড় কিনে নিজেরাই আর একটা ড্রেস বানাইয়া লইতে হয়। টাকা-পয়সার সমস্যা। মানুষের কাঁথা বুইন্যা দেই। যে ডাকে তার বাড়ি গিয়া কাজ করি। এভাবেই চলে। আগে বেশি কাজ করতে পারতাম। আমার টিউমারের অপারেশন হইছে। এখন তেমন পরিশ্রম করতে পারি না। ’

আমার সামনে দুই হাত মেলে ধরে বললেন, ‘এই দেখেন, একটু আগে একজন বলল হলুদ বাইটা দিতে। হাত হলুদ হইয়া আছে। ’ মেয়েদের বাবার কথা জানতে চাইলে চুপ করে গেলেন। চোখেমুখে বিরক্তি আর রাগ। বললেন, ‘স্বামী ভালা হইলে ভালা, খারাপ হইলে খারাপ। ’ পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মহিলা বললেন, ‘স্বামী নেশা করে বলে ও আলাদা থাকে। ’ বাড়ি কোথায় শুরুতে বলতে চাননি। কিন্তু মেয়েদের মুখ থেকে বেরিয়ে গেল তাদের মা ভোলার মেয়ে। তবে ঠিক কোথায় বলতে পারল না। তবে তারা আগে থাকত ঢাকার বালুর মাঠ আর বউ বাজারে।

কথার ফাঁকে পাশে দাঁড়ালেন একজন মহিলা। হাতে টিফিন ক্যারিয়ার। জানালেন রায়ের বাজার থেকে প্রতিদিন এই পথে যাওয়া-আসা করেন। সুমাইয়া ও সুমির বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়ে বললেন, ‘প্রতিদিন ওদের দেখি। প্রতিদিনই ওরা পড়তে বসে। ’ 

ধানমণ্ডি ঝিলের রবীন্দ্র সরোবরের ঠিক বিপরীতে একটা ফুটপাতে থাকে সুমাইয়ারা। রাতে পলিথিন দিয়ে তাঁবুর মতো বানিয়ে ঘুমায়। বৃষ্টির দিনগুলোতে ওরা কিভাবে পড়ে? কল্পনা বেগম বললেন, ‘তখন তো আর পড়ালেখা সম্ভব হয় না। তবে অন্য দিনগুলোতে ওরা রাত ৯টা-১০টা পর্যন্ত পড়ে। ’ সুমাইয়া ও সুমির পড়াতে বেশ আগ্রহ। বড় হয়ে কী হতে চাও? সুমাইয়া বলল, ‘আমি ডাক্তার হব। ’ সুমিও হাসি দিয়ে বলল, ‘আমিও ডাক্তার হব। ’ যা-ই হোক না কেন ওরা, দুজনের বলাতেই  বেশ জোর।


মন্তব্য