kalerkantho


তোমায় সালাম

ঠাকুরের ছোটো নদী

স্থানীয়রা ডাকে ছোট নদী। নওগাঁর পতিসরে বসে এই নাগর নদ নিয়েই রবীন্দ্রনাথ লেখেন ‘আমাদের ছোটো নদী’। নাগর নদ ঘিরে রবীন্দ্রস্মৃতির কথা জানালেন সুকান্ত পার্থিব



ঠাকুরের ছোটো নদী

‘বোট ভাসিয়ে চলে যেতুম পদ্মা থেকে কোলের ইছামতিতে, ইছামতি থেকে বড়ালে, হুড়ো সাগরে, চলনবিলে, আত্রাইয়ে, নাগর নদীতে, যমুনা পেরিয়ে সাজাদপুরের খাল বেয়ে সাজাদপুরে।’ কবির চিঠিপত্রে শিলাইদহ থেকে শাহজাদপুর ও পতিসরে যাওয়ার এই বর্ণনা মেলে। ১৮৯১ থেকে ১৯০১—প্রায় একনাগাড়ে থেকেছেন এই বাংলায়। এরপর ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত জমিদারি দেখতে মাঝেমধ্যেই পতিসর আসতেন। ১৯৩৭ সালের ২৭ জুলাই শেষবার পতিসর ছাড়েন। জলপথে তাঁর সঙ্গী ছিল প্রিয় বোট ‘পদ্মা’। আরো একটি ছোট নৌকা ছিল। নৌকায় বসেই রচনা করেছেন অনেক বিখ্যাত লেখা। পতিসরে আসা-যাওয়া করতেন নাগর নদ দিয়ে। পতিসরের তাঁর কাচারিবাড়ির কোল ঘেঁষেই বয়ে গেছে নালা। এই নদ নিয়েই লিখেছেন ‘আমাদের ছোটো নদী’।

নাগর নদে এখন বৈশাখে হাঁটু জলও থাকে না। পড়ে থাকে মরা খালের মতো। তবে বর্ষায় নালা এখনো কানায় কানায় পূর্ণ। শরতে পারজুড়ে ফোটে কাশফুল। মানুষের দখলে ক্রমেই সরু হয়ে গেছে এই নদ। এটি নওগাঁ জেলা থেকে বগুড়ার দুপচাঁচিয়া হয়ে নাটোরের সিংড়ার চলনবিলে গিয়ে পড়েছে।

নাগরের পারেই দুপচাঁচিয়া মডেল উচ্চ বিদ্যালয়। গড়ে ওঠে উনিশ শতকের শেষের দিকে। এলাকার কিছু বিদ্যানুরাগী প্রথমে সংস্কৃত টোল আকারে চালু করেন। ১৯২০ সালে এটিই ইংরেজি স্কুলে পরিণত হয়। তখন নাম হয় এম ই স্কুল। ১৯২৩ সালে নামকরণ হয় দুপচাঁচিয়া হাই স্কুল। এই স্কুলের ছাত্র ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সংগ্রামী অনন্তমোহন কুণ্ডু কবির সান্নিধ্য পেয়েছিলেন। ১৯৩৭ সালে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এখানে আসার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু বার্ধক্য আর অসুস্থতার জন্য আসতে পারেননি। তবে একটি চিঠিতে পাঠিয়েছিলেন আশীর্বাণী—‘দেশে জ্ঞানের অভিষেচনকার্যে দুপচাঁচিয়া হাই স্কুল অন্যতম কেন্দ্ররূপে যে সাধনায় প্রবৃত্ত তাহাতে তাহার সফলতা আমি কামনা করি।’

এই স্কুলের অনেক কৃতী ছাত্রও ছিলেন। উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে রমেন্দ্রকুমার পোদ্দার ১৯৭৯—৮৩ সাল পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন।

পতিসরে লেখা

রবি ঠাকুর পতিসরে কাটিয়েছেন দীর্ঘ সময়। লিখেছেন ‘বিদায় অভিশাপ’, উপন্যাস ‘গোরা’ ও ‘ঘরে বাইরে’র অনেকাংশ। ছোটগল্প ‘প্রতিহিংসা’ ও ‘ঠাকুরদা’। প্রবন্ধ ‘ইংরেজ ও ভারতবাসী’। গানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা’, ‘তুমি আমার নিভৃত সাধনা’, ‘বধূ মিছে রাগ করো না’, ‘তুমি নবরূপে এসো প্রাণে’ ইত্যাদি। এই পতিসরে বসেই ‘চৈতালী’ কাব্যের ৫৪টি কবিতা লিখেছেন। লিখেছেন ‘সন্ধ্যা’, ‘দুই বিঘা জমি’র মতো অনেক বিখ্যাত কবিতা।

আমাদের ছোটো নদী

আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে

বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে।

পার হয়ে যায় গোরু, পার হয় গাড়ি,

দুই ধার উঁচু তার, ঢালু তার পাড়ি।

 

চিক্ চিক্ করে বালি, কোথা নাই কাদা,

একধারে কাশবন ফুলে ফুলে সাদা।

কিচিমিচি করে সেথা শালিকের ঝাঁক,

রাতে ওঠে থেকে থেকে শেয়ালের হাঁক।

 

আর-পারে আমবন তালবন চলে,

গাঁয়ের বামুন পাড়া তারি ছায়াতলে।

তীরে তীরে ছেলে মেয়ে নাইবার কালে

গামছায় জল ভরি গায়ে তারা ঢালে।

 

সকালে বিকালে কভু নাওয়া হলে পরে

আঁচলে ছাঁকিয়া তারা ছোটো মাছ ধরে।

বালি দিয়ে মাজে থালা, ঘটিগুলি মাজে,

বধূরা কাপড় কেচে যায় গৃহকাজে।

 

আষাঢ়ে বাদল নামে, নদী ভর ভর

মাতিয়া ছুটিয়া চলে ধারা খরতর।

মহাবেগে কলকল কোলাহল ওঠে,

ঘোলা জলে পাকগুলি ঘুরে ঘুরে ছোটে।

দুই কূলে বনে বনে পড়ে যায় সাড়া,

বরষার উৎসবে জেগে ওঠে পাড়া



মন্তব্য